কাজী লাবণ্যের জোনাক বনে জোছনা

  রাতুল সরকার

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২০:১০ | অনলাইন সংস্করণ

কাজী লাবন্যর সাথে আমার আলাপ ২০১৪ সালের গোড়ায়। ঢাকায় জাতীয় কবিতা উতসবে আমন্ত্রিত ভারতীয় কবি হিসেবে গিয়েছি। সেই সময়কার কথা। বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেব আমাকে তার লেখা কিছু বই দিয়েছিলেন। প্রথমে তেমন পাত্তা দেই নি। কারণ বাংলাদেশে উচ্চপদের রাজপুরুষদের স্ত্রীরা এমন অনেক কবিতার বা গল্পের বই প্রকাশ করার শখ রাখেন বলে ধারনা ছিল। কিন্তু বইগুলি হাতে পেয়ে ধারনা আমুল পালটে গেল।  প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ সোনালি রোদ্দুর (২০০৫), রূপালি জ্যোৎস্না (২০০৯), পারকা (২০১০) পেয়েছি। গতবছর প্রকাশিত নাকছাবি (২০১৫)ও পড়লাম। এই বইমেলায় হাতে এল জোনাক বলে জোছনা। কিন্তু পড়ে মনে হল এ তো গতানুগতিক কলমচি নন। লেখার জন্যে লেখেন না।   ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে’ - এই তত্ত্বকথার ধোঁয়া যতোই উচ্চারিত হোক, একজন লেখক তার সময়, সমাজ ও যাপিত জীবনকে অস্বীকার বা অতিক্রম করে যেতে পারেন না। হয়ত বা সেটা তিনি চানও না। বরং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে সমগ্র বিশ্বের সাথে একাত্ম করে তোলা, নিজ সময়কে মহাকালের সাথে বেঁধে দেয়া এবং ব্যক্তি-অনুভবকে সর্বজনীন অভিজ্ঞানে উন্নীত করাই তার স্থায়ী সাফল্য অর্জনের মূল সূত্র।

কাজি লাবণ্যর জন্ম ও বেড়ে ওঠা রংপুরে। আমার মায়ের ফেলে আসা দেশ। তারপরে লাবণ্যর বাস ঢাকায়। স্বামী উচ্চপদাধিকারী রাজকর্মী। কাজেই তিনি প্রশাসনের অন্দরমহল দেখেছেন, দেখেছেন বিস্তারিত গ্রামবাংলা। তার এই যে বিশাল ও বিস্তারিত অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান, তা তাঁকে প্রবল সহায়তা দিয়েছে ছোট গল্প রচনায় এবং একইসঙ্গে তা তা গল্পকে প্রভাবিত করেছে নানাবিধ ইতিবাচকতায়।  

জোনাক বনে জোছনা ১২ টি গল্পের সংকলন। প্রকাশ করেছেন প্রিয়মুখ প্রকাশন। প্রথম গল্প ‘মানবী’। নন্দিনি নামক মেয়েকে নিয়ে কাহিনী। হিন্দু পরিবারের গল্প। অসাধারন বুনন। গল্প হিসেবে এগিয়েছে তরতরিয়ে। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। সেটা হল হিন্দু আচার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত না থাকায় ছোটখাটো কিছু ত্রুটি থেকে গেছে। যেমন প্রথমেই নামে। নন্দিনি শব্দটা হিন্দুরা লেখেন নন্দিনী। যেমন মন্ত্রোচ্চারন – ওম জবাকুসুম সংকাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং হবে। এই ত্রুটি একবার আমাদের মত কোন হিন্দু পরিবারজাত বন্ধুদের দেখিয়ে নিলে সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন হত।

দ্বিতীয় গল্প ধূপশিখা। মসৃণ এই গল্পটির বর্ণনা অসাধারন। এখানে তিনি আঙ্গিক নিয়ে পরীা-নিরীা করেছেন এবং তাঁর গল্পের চেহারা পাল্টে যেতে থেকেছে। ভাষায় এক ধরনের রহস্যময়তা দানা বাঁধতে থেকেছে- যদিও যে জোছনা-স্বচ্ছতা তাঁর গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য, তা মূল ধারায় বহাল থেকেছে। এখানে অটিজম নিয়ে যে বর্ণনা একজায়গায় দেওয়া হয়েছে তা বাহুল্য বলে মনে হয়েছে। না দিলেও কিছু আসত যেত না।

আলো ও আঁধারি, ইতিহাস ও কল্পনা, চিত্রকল্প ও কল্পচিত্র, রঙ ও রূপ, প্রকাশ ও আড়াল, শব্দ ও ব্যঞ্জনা মিলে একটি গল্পকে কিভাবে অনিঃশেষ পাঠের ও আনন্দের সৃষ্টি করে তুলতে পারে, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ কাজী লাবণ্যর ‘ধেড়ে ইঁদুর’ নামের গল্পটি।

কিক , কাকতালীয়, ইদি ইয়াবা গল্প তিনটিতে বর্ণনের অবয়ব ছোট হয়ে এসেছে এবং শব্দের ব্যবহারজনিত সংযম ও কৃপণতা এবং স্পেস ও সাংকেতিকতা, পরিহাস ও স্যাটায়ার সহযোগে গল্পের ভাষা উত্তরাধুনিক গল্পের মতো অনেক বেশি তীর্যক হয়ে উঠেছে। এখানে তিনি সাম্প্রতিক ধারার বাক-কৃপণ প্রকরণ সম্পর্কিত ফতোয়াকে আক্রমণ করেছেন কিন্তু তাকে অস্বীকার করেননি।

কাজী লাবণ্য দর্শন অভিজ্ঞতার এক নান্দনিক ভুবন। কত বির্বতন বিনির্মাণ তার বোধে ভাবনায়। তিনি অভিজ্ঞতাকে বেধেছেন আধুনিকভাবে ভাষায়। তার রচনা প্রজাপতির মতো। যতই ব্যবচ্ছেদ হোক রঙ থেকে যায়। যা পাঠকের মনে প্রশান্তি ডেকে আনে। সমুদ্র-কোলাহল ঢেউ, মানুষের অবচেতন মনের হাহাকার। সেই হাহাকারে ঝাউগাছ সবুজের প্রতীক। অপরিচিত ভুবনকে পরিচিত এবং নান্দনিক করে গড়ে তোলার মুন্সিয়ানা।

তার রচনার বৈশিষ্ট হল শব্দের নতুন ব্যঞ্জনা, প্রকৃতির কোল ঘেষা বর্ণনা, পরিচিত চিত্রকল্পের সঙ্গে পরিচিত উপমার মেলবন্ধন, সৃষ্টিতে স্বভাবজাত দর্শন, অভিজ্ঞতার নান্দনিক উপস্থাপন, ঐতিহ্য ও শিকড় সন্ধানী প্রয়াস ।

কাজী লাবণ্যর বড় গুণ পাঠককে আশ্রয় দান করা। ভাবে ভাষায়, শব্দে পাঠককে জাগিয়ে রাখা। তিনি সেই বিচারে সফল ও স্বার্থক। তার ‘জোনাক বনে জোছনা’ মানুষের যাপিত জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে বৃহত্তর ক্যানভাসে তুলে ধরতে সম হয়েছে যা সমসাময়িক বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্যে এতটা পাই নি অন্ততঃ এপার বাংলার পাঠকের চোখে।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে মেলায় প্রকাশক প্রিয়মুখের স্টলে। (স্টল নম্বর ২৫৮)।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে