ইসির সংলাপে

পর্যবেক্ষক সংস্থার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের তাগিদ

*প্রমাণ মিললে নিবন্ধন বাতিলের পরামর্শ *সংস্থা প্রধানদের সতর্ক হতে বললেন সিইসি *এই প্রথম নারী নেত্রীদের সঙ্গে সংলাপে বসছে ইসি

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ অক্টোবর ২০১৭, ২০:১৭ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ২০:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত পর্যবেক সংস্থাগুলোর মধ্যে কারও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে তাগিদ দিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেকরা। রোববার রাজধানীর আগারগাঁস্থ নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত সংলাপে অংশ নিয়ে পর্যবেকরা বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনগ্রাহ্য করতে পর্যবেককদের নিরপে ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। কোনো দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারা কাজ করলে ভোট প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এজন্য নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা দরকার। পর্যবেরা কোনো সংস্থার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা মিললে সেই সংস্থার নিবন্ধন বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন।

 সংলাপে অংশ নেয়া বেশ কয়েকজন পর্যবেক জানান, সংলাপের সূচনা বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদাই এবিষয়টি সবার মতামতের জন্য তুলে ধরেন। রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেন নির্বাচন পর্যবেক হতে না পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে পর্যবেক সংস্থার প্রতিনিধিদের আহ্বানও জানান সিইসি।

সংলাপে অংশ নেয়া বিভিন্ন পর্যবেক সংস্থার ৩০ জন প্রতিনিধির উদ্দেশ্যে কেএম নূরুল হুদা বলেন, রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তি যেন নির্বাচন পর্যবেক হিসেবে নিয়োগ না পায়, সে বিষয়ে পর্যবেকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পপাতহীন ও নিরপেভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে সামগ্রিকভাবে ভোট কার্যক্রম যেন বাধাগ্রস্ত না হয়- সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যাদেরকে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে মাঠে পাঠাবেন, তাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ে নির্বাচন পর্যবেদের ভূমিকা নিয়ে কথা হয়েছে এবং পর্যবেকরা যাতে সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান সিইসি। তিনি বলেন, আপনারা নির্বাচন চলাকালে মাঠে ময়দানে বিচরণ করবেন, সঠিক সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ পাবেন। আপনাদের পরামর্শ আমরা গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করব এবং বিবেচনা করব।

সিইসির বক্তব্যের পর তার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেন উপস্থিত পর্যবেকরা। তবে পর্যবেকদের প্রয়োজনীয় প্রশিণের ব্যবস্থা ইসিকে করতেই সুপারিশ করেছেন তারা। এছাড়া তৃতীয় কোনো পকে (নিরপে সংস্থা) দিয়ে ভোটার তালিকা নিরীা করা ও ভোটার দিবস উদযাপনের পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে সংলাপে অপর চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে পর্যবেক সংস্থার প্রতিনিধিরা সভাকে উপস্থিত হলে সিইসি সূচনা বক্তব্য দেন। এরপর ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সংলাপের আনুষ্ঠানিক আলোচনা।  

এসময় পর্যবেকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উপর জোর দিয়ে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক পরিষদের (জানিপপ) প্রতিনিধি ড. নাজমুল আহসান কমিল উল্লাহ। তিনি বলেন, কোনো সংস্থা কমিশন থেকে নিবন্ধন নিয়ে নির্বাচন পর্যবেণ করে কিনা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা-তা খতিয়ে দেখতে হবে। দায়িত্বপালন না করলে এ ধরনের ভূঁইফোড়দের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন পর্যবেকদের প্রয়োজনীয় প্রশিণের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) প্রতিনিধি আব্দুল আলীম বলেন, ভোটার তালিকা তৃতীয় কোনো প দিয়ে অডিট করা প্রয়োজন। নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর আগ পর্যন্ত পর্যবেকদের পরিচয়পত্র প্রদান নিয়ে গড়িমসি করা হয়। এ বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদপে নেওয়া দরকার। এছাড়া কেন্দ্রে প্রবেশ করে পর্যবেকদের সময় নির্ধারণ ও এ বিষয়ে প্রশিণ দেয়ার সুপারিশ করেন তিনি।  

আব্দুল আলীম বলেন, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো পর্যবেকের কার্যক্রম তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি কোনো কারণে এখন পর্যন্ত পর্যবেক সংস্থার নিবন্ধনও বাতিল করার নজির নেই। কাজেই পর্যবেকরা ঠিকমতো তাদের দায়িত্ব পালন করছেন কিনা, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা প্রণয়ন দিবস উদযাপন করা দরকার। প্রতিবছর পহেলা জানুয়ারি ভোটার দিবস উদযাপন এবং সেদিন ভোটার তালিকা হালনাগাদ শুরু হলে সবার ভেতরেই একটা সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটিরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা ) ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান বলেন, নির্বাচন পর্যবেকদের বয়স কমিয়ে ২৫ থেকে ২০ বছর করা উচিত। স্থানীয় পর্যবেকদের স্থানীয়ভাবে নির্বাচন পর্যবেণের ব্যবস্থা করার পওে মত দেন তিনি। ইভিএম এখনই শুরু করা উচিত নয় বলেও মনে করেন মুনিরা খান।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি আনোয়ার ফরায়েজী পর্যকদের প্রয়োজনীয় প্রশিণের ব্যবস্থাসহ নিরপে ব্যক্তিদের পর্যবেণের অনুমতি দেওয়ার পরামর্শ দেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে অংশীজন ও নানা শ্রেণী পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে ইসি। এরইমধ্যে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, পর্যবেকদের পাশাপাশি এই প্রথমবারের মতো নারী নেত্রীদের সঙ্গে সংলাপ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামীকাল সোমবার আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশের ২২ জন নারী নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানায় ইসির সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা। এছাড়া আগামীকাল মঙ্গলবার নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ইসির মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।

ইসির জনসংযোগ পরিচালক এম আসাদুজ্জামান বলেন, মতবিনিময়ের জন্য এরই মধ্যে নারী নেত্রী/নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন ২২ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সোমবার বেলা ১১টায় প্রধান সির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে এর আগে যত সংলাপ হয়েছে তাতে নারী নেত্রীদের নিয়ে আলাদা সংলাপ করা হয়নি। এবারই প্রথম নারী নেত্রীদের সঙ্গে পৃথক সংলাপে বসছে ইসি।

আমন্ত্রিত ২২ নারী নেত্রী হলেনÑআইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক)  চেয়ারপারসন ড. হামিদা হোসেন; বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রোকেয়া কবির; বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম; ফারিয়া লারা ফাইন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা হোসেন; ত্রিমাত্রা ফাইন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট শ্যামলী নাসরিন  চৌধুরী; প্রিপ ট্রাষ্টের নির্বাহী পরিচালক অ্যারোমা দত্ত; এসিড সারবাইবারস ফাইন্ডেশনের (এএসএফ) নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ; বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অ্যাডভোকেট সালমা আলী; ইনোভেশন ফর ওয়েল বিং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান; টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম; অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু; উইমেন ফর উইমেনের চেয়ারপারসন সালমা খান; ডিজ্যাবল্ড রিহ্যাবিলিটেশন এন্ড রিসার্স এসোসিয়েশনের (ডিআরআরএ) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন; নারীপরে সভানেত্রী রেহানা সামদানী; কর্মজীবি নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক; নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাদারন সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা; বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব উইমেন ফর সেলফ এমপাওয়ারমেন্টের (বাউশী) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মাহবুবা বেগম; ফর ইউ ফর এভারের (ফাইফে) প্রেসিডেন্ট রেহানা সিদ্দিকী; নারী উদ্যোগ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মাসহুদা খাতুন শেফালী; নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আক্তার ডলি; হিতৈশী-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শার্মিমা জামান এবং নেটওয়ার্ক ফর রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং সেন্টারের জেন্ডার এন্ড এ্যাডভোকেসি এ্যাক্সপার্ট মনসুরা আক্তার।

গত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংলাপ শুরু হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে গণমাধ্যম পড্রতিনিধি, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, পর্যবেক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় করল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে