রাতে সাড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না: প্রধানমন্ত্রী

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:০৬ | আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৭, ২১:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ফটো
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কি পেলাম, কি পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আসিনি। কে আমাকে রিকগনাইজড (স্বীকৃতি) করল, কি করল না সেই হিসাব আমার নাই। আমার একটাই হিসাব, এই বাংলাদেশের মানুষ। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুক কাজ করতে পারলাম সেটাই আমার কাছে বড়। সংসদ নেতা বলেন, আমি মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে জীবনকে বাজি রেখে বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ ঘণ্টা ১৪ বা ১২ ঘণ্টার হিসাব নাই। অনেক সময় এমনও দিন যায় রাতে ৩ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না।

প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম সম্প্রতি পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স নামক একটি আন্তর্জাজিত সংস্থার গবেষণা রিপোর্ট সংসদে তুলে ধরে বলেন, ওই রিপোর্টে সৎ সরকার প্রধান হিসেবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাবিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন। আর সারা পৃথিবীর মধ্যে কর্মঠ সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী চতুর্থ স্থান অর্জন করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চান।

এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, যাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তাদের দেশে জনসংখ্যা কতো? আর আমার দেশের জনসংখ্যা কতো? এইটা যদি তারা একটু তুলনা করতেন, তাহলে হয়তো অন্য হিসাবটা আসতো। আমাদের ছোট্ট ভূখণ্ডে বৃহৎ জনগোষ্ঠী। ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে ১৬ কোটির উপর মানুষ বসবাস করে। যারা ১,২,৩,৪  নম্বরে আছেন তাদের কিন্তু জীবনে বাবা-মা ভাই আপনজনকে হারাতে হয়নি, বা অত্যাচারিত-নির্যাতিতও হতে হয়নি। জেলের ভাতও খেতে হয়নি। মিথ্যা মামলায়ও জর্জরিত হতে হয়নি। আমাদের দেশের পরিবেশটা একটু আলাদা। আমরা যতো ভালই কাজ করি না কেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা, মিথ্যা প্রবাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করা, এমনকি বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বারবার আমার জীবনের উপর যে আঘাত এসেছে এরকম যদি একবারও হতো তাহলে অনেকেই ঘরে বসে যেতেন। কিন্তু আমি মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে জীবনকে বাজি রেখে বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। সেখানে নিজের জীবনে অর্থ সম্পদ টাকা পয়সা কি আছে, না আছে ও নিয়ে আমি কখনো চিন্তাও করি না। ওটা নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নাই। আল্লাহ জীবন দিয়েছেন জীবন তো চলেই যাবে।

তিনি বলেন, আমাকে কিন্তু বাবা, মা, ভাই, বোনকে হারিয়ে বিদেশে রিফিউজি হয়ে থাকতে হয়েছে। যাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাদের এ অভিজ্ঞতা নাই। আমাদের যে প্রতিকূল অবস্থা, এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে তাদের চলতে হয়নি। আমাদের দেশে কখনো ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যহত ছিল না। প্রতিবারই বাধা এসেছে। আবার আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। আন্দোলন করতে হয়েছে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। সেই গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়েই কিন্তু আজকে দেশের উন্নতি।

নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই কাজ আসে সেটা করে যাই। কেন করি? মনের টানে কাজ করি। আমার বাবা দেশটা স্বাধীন করে গেছেন। তার একটা স্বপ্ন ছিলো ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবেন। সেই জন্য তিনি স্বাধীন দেশের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি সম্পন্ন করে যেতে পারেন নি। ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। আমার একটাই চ্যালেঞ্জ, যে কাজটা আমার বাবা করে যেতে পারেননি সেই অধরা কাজটা আমি সম্পন্ন করে যেতে চাই। দেশকে  ক্ষুধামুক্ত দারিদ্রমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তবুও বলবো যারা হিসাব নিকাশ করেছেন তারা তাদের মত করেছেন। এজন্য ধন্যবাদ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দেশে মিলিটারি ডিকটেটরশিপ (সামরিক শাসন) চলে, যে দেশে গণতন্ত্রের অভাব থাকে, যে দেশে জবাবদিহিতা-স্বচ্ছতার অভাব থাকে সেই দেশে দুর্নীতিটা শিকড় গেড়ে বসে। সেই শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হয়ে যায়। ১৯৭৫ এর পর থেকে ২১টা বছর এই অবস্থাই বিরজমান ছিল। এরপর আবার ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত এই অবস্থা। তো ওই রকম একটা অবস্থা আমার ‘লিগেসিটা’ কি? আমি উত্তরাধিকার সূত্রে কি পেলাম? পেয়েছি মিলিটারি ডিকটেটরশিপ, মিলিটারি রুলস, অনিয়ম, অবিচার, অত্যাচার। সেগুলোর কারণে এই দুর্নামের এখনো ভাগিদার হতে হচ্ছে। তবে হ্যাঁ, আমি নিজে সততার সঙ্গে দেশ চালাতে চেষ্টা করছি।

এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনে রাখতে হবে মাথায় পচন ধরলে সারা শরীরেই ধরে। যেহেতু মাথায় পচন ধরে নাই, শরীরের কোথাও যদি একটু ঘা থাকে তা আমরা সারিয়ে ফেলতে পারবো।

তিনি বলেন, ওই রকম যদি দুর্নীতি হতো তাহলে দেশের জিডিপি ৭.২৮ হারে উন্নীত হতো না, মাথাপিছু আয়ও ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হতো  না। এতো রাস্তাঘাট, এতো বড় বড় জিনিস আমরা তৈরি করেছি অল্প সময়ের মধ্যে। সেটা করতে পারতাম না। দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেই পদ্মাসেতু তৈরি করছি। সেই চ্যালেঞ্জ দিতে পেরেছি, এখানে সততাই শক্তি, সততাই জোর সেটা প্রমাণ করেছি।

তিনি আরও বলেন, ধন-সম্পদ চিরদিন থাকে না। মানুষকে মরতে হয়। সব রেখে চলে যেতে হয়। তবু মানুষ অবুঝ। সম্পদের লোভে মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে। এটা মানুষের একটা প্রবৃত্তি, এই প্রবৃত্তিটা যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে সেই পারে দেশকে দিতে, জনগণকে কিছু দিতে। আমরা এখানে দিতে এসেছি। রক্ত দিয়েছি, বাবা-মা, ভাই সব দিয়েছি। নিজের জীবনটাও বাজি রেখেছি শুধু একটাই কারণে, বাংলাদেশটা যেন স্বাধীন দেশ হিসেবে উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়। বিশ্ব দরবারে যেন মর্যাদার সঙ্গে চলে। রিপোর্টটা যাই দিক, আমার মর্যাদার থেকে বাংলাদেশের মর্যাদাটা তো উন্নত হয়েছে, এটা আমার কাছে বড় পাওয়া।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে