রাবিতে ‘জঙ্গি’ সন্দেহে তিন শিক্ষার্থী আটক

  নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

২০ এপ্রিল ২০১৭, ১৮:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

জঙ্গি সংগঠন ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) এর সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে তার সহযোগীসহ আটক করা  হয়েছে। এছাড়া গতিবিধি সন্দেজনক মনে হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও এক শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে ছাত্রলীগের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বৃহস্পতিবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে মতিহার থানা পুলিশ টুকিটাকি চত্বর থেকে তিনজনকেই আটক করে থানায় নিয়ে যায়।  

আটককৃতরা হলেন- মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন (নরসিংদী), প্রাণরাসায়ণ ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের মাকসুদুল হক (কিশোরগঞ্জ) এবং ভুগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের আল তৌফিক সানী (পাবনা)। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে জুবায়ের হোসেন আইএস’র অফিসিয়াল পেইজ ও ওয়েবসাইটে দেয়া বিভিন্ন যুদ্ধের ভিডিও ও পোস্ট তার ভালো লাগে বলে ছাত্রলীগের কাছে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেশ কয়েকদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ নামে একটি ফেসবুক আইডি নজরদারিতে রাখছিল। যেই আইডিটি থেকে জঙ্গিবাদী বিভিন্ন কথাবার্তা ও ভিডিও শেয়ার করা হতো। পরে আইডির এডমিনকে ধরার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মী অভিযান চালায়। জুবায়ের নামে মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী আইডিটি চালান বলে ছাত্রলীগের নিকট তথ্য আসে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা রবীন্দ্র কলাভবন থেকে জোবায়েরকে আটক করে টুকিটাকি চত্বরে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।

রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু জানান, কয়েকদিন আগে ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ নামে ফেসবুক আইডি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ, আএস’র সমর্থনে করে পোস্ট এবং বাংলাদেশের জঙ্গি কার্যক্রমে উস্কানিমূলক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। বিষয়টি ছাত্রলীগে নেতাকর্মীদের নজরে পড়ে। গত কয়েকদিন যাবত একইভাবে সে বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করে আসছিল। খোঁজ নিয়ে আইডির মালিক মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জোবায়ের হোসেনকে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসের টুকিটাকি চত্বরে তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছাত্রলীগ।

এসময় তার মোবাইলে সিরিয়ার যুদ্ধ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যঙ্গ ভিডিও চিত্র পাওয়া যায়। ফেসবুকে আইএস’র পোশাক পরে অস্ত্র হাতে তোলা ছবি দিয়ে বিভিন্ন ছদ্মনামে প্রোফাইল করা- এমন অসংখ্য আইডির সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করার তথ্য-প্রমাণ মেলে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ফেসবুকে ইনবক্সে বারবার টেক্সট দেয়ার সূত্র ধরে প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের মাকসুদুলকেও (ফেসবুক আইডির নাম শেষ স্টেশন কবরস্থান) ক্যাম্পাস পার্শ্ববর্তী বিনোদপুরের বাইতুল মিজান নামের একটি ছাত্রাবাস থেকে ধরে আনে ছাত্রলীগ কর্মীরা। একই সময়ে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল  ভুগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের আল তৌফিক সানি। তার গতিবিধি সন্দেহ হওয়ায় তাকেও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। পরে সন্দেহভাজন হিসেবে তিন জনকেই পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

পুলিশে সোপর্দের আগে জোবায়ের হোসেন জানান, ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর তাবলীগ জামায়াতের চিল্লায় যায় সে। তখন থেকে ইসলামী বিভিন্ন অনুশাসন মেনে চলেন। পরে বিভিন্ন আলেম-উলামাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আসছিলেন। সম্প্রতি ফেসবুকের মাধ্যমে ‘একটি পক্ষের’ (নাম প্রকাশ করেননি) বেশ কয়েকজনের সঙ্গে তার কথা হয়। তাদের ‘ইসলাম ও জিহাদী’ কথাবার্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সে ফেসবুকে তাদের লেখাগুলো নিয়মিত শেয়ার করত। যেসব আইডির সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখত, সবই ছদ্মনামে। তাদের আসল পরিচয় এখনও সে জানেন না । তবে জঙ্গি কার্যক্রমে এখনও জড়িয়ে পড়েনি বলে দাবি করেন জুবায়ের।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় জুবায়েরের ফেসবুক ইনবক্সে অপরিচিত আইডি থেকে টেক্সট আসে- ‘অভিনন্দন! ঈমানদারগণ শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে!’ এছাড়া তাকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের সময় থেকে ফেসবুকে ছদ্মনামের আইডিগুলোর ইনবক্সে বিভিন্ন সময়ে বলা কথাপোকথন হঠাৎ আপনাআপনি ডিলিট হয়ে যেতে থাকে। পরে জানা যায়- তার আইডিতে অন্য কেউ ঢুকে কথোপকথন ডিলিট করছে।

জুবায়েরের বিভাগের কয়েকজন সহপাঠী জানান, জোবায়ের ক্যাম্পাসে তেমন ঘোরাঘুরি করে না। বিভাগের কারও সঙ্গে তার তেমন পরিচয়ও নেই। ক্লাস করে মেসে ফিরে যায়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নরসংদী জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জানান, আমরা কেউ তাকে চিনতাম না। ঘটনা শোনার পর এসে দেখলাম, তাকে এর আগে কখনও দেখি নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মজিবুল হক আজাদ খান বলেন, ‘শুনেছি তিনজন ছাত্রকে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে গেছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না।’

নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ন কবীর বলেন, ‘তাদেরকে থানায় রাখা হয়েছে। তারা জঙ্গি কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কোনো চক্রের সঙ্গে জড়িত কিনা খতিয়ে দেখা হবে। সেই অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে