আমাদের সময়ের গোলটেবিল বৈঠকে বাজেট নিয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক

ভ্যাটের একাধিক হারের পক্ষে ব্যবসায়ীরা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ মে ২০১৭, ১১:২১ | অনলাইন সংস্করণ

সরকার ভালোভাবে প্রস্তুতি না নিয়েই ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর আইন কার্যকর করতে যাচ্ছে। এ আইনে ভ্যাটের হারও বাড়ানো হচ্ছে। এতে পণ্যমূল্য বাড়বে, জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেউ বলছেন, ভ্যাটের হার একাধিক হওয়া উচিত। অন্যরা বলছেন, যে হারই হোক যেন একটিই হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সময় আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এক প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের আওতা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হলেও আদায় করার সক্ষমতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নেই এমন মন্তব্যও উঠে এসেছে আলোচকদের কাছ থেকে। কেউ কেউ বলেছেন, কাজ করতে গিয়েই সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।

গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আমাদের সময়ের নিজস্ব কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘বাজেট ২০১৭-১৮ : প্রেক্ষিত আগামী জাতীয় নির্বাচন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বক্তারা বলেন, দেশে রাজনৈতিক স্থি’তিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে না। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন হবে না, বাড়বে না কর্মসংস্থানের হার। এতে বাধাগ্রস্ত হবে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কর্মকা-।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের গবেষক বিরূপাক্ষ পাল। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আমাদের সময়ের উপদেষ্টা সম্পাদক আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশ নেন অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান, বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ, বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাসেম আহমেদ, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান, ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশেন প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালি, এফবিসিসিআইর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জসিম উদ্দিন, এফবিসিসিআইর সাবেক ভাইস প্রেডিসেন্ট হেলাল উদ্দিন আহমেদ ও বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান বাবু।

বৈঠক শুরু হয় বেলা সোয়া ১১টায়। বিরতিহীনভাবে চলে পৌনে ৩টা পর্যন্ত। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় উঠে আসে দেশের অর্থনীতি, সমস্যা, সম্ভাবনা, তারুণ্যের শক্তি, নারী উদ্যোক্তাদের ও উদ্যোক্তাদের সমস্যা এবং সম্ভাবনার কথা। এই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বাজেটে করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দিতে ভুল করেননি আলোচকরা। তবে সব কিছুকে ছাড়িয়ে আলোচনা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ভ্যাট নিয়ে। এ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও বেশ বিতর্ক হয়। একজনের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন অন্যজন। এমন অবস্থায় বৈঠকটি অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে ওঠে। প্রাণবন্ত আলোচনার ফাঁকে অনেকেই বাজেটের পর বা অন্য সময়ে এ ধরনের বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাবও করেন।

মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। সম্ভাব্য বাজেটে অর্থমন্ত্রী কতখানি কঠোর হতে পারবেন তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী পিছু হটতে শুরু করেছেন। এ সময় ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল ভ্যাটের হার কমানো। ভোক্তারাও আশঙ্কা করছেন, ভ্যাটের ভিত্তি প্রসারিত হলে চাপটা চূড়ান্তভাবে তাদের ওপরই পড়বে। তাই সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিঘাতের কথা মনে রেখে বাজেট নিয়ে ভাবতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েক বছর ধরে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে তা একটি উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগযোগ্য প্রচুর অর্থ কিছু ধনী ব্যক্তির হাতে থাকলেও তারা সেগুলো বিনিয়োগ করছে না। তিনি প্রশ্ন করেন, এটি কি শুধুই দুর্বল অবকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব, বড় ধনীদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক সংশয় রয়েছে, নাকি বিদেশে টাকা পাচার তাদের বিদেশমুখী প্রবণতার অভিপ্রকাশ।

ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, যে কোনো নতুন আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে আলোচনা-সমালোচনা হয়। ভ্যাট আইনের ক্ষেত্রেও তা হচ্ছে। তবে সরকার সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের গ্রহণযোগ্য করেই ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হবে। বাংলাদেশের কর জিডিপির রেশিও অনেক কম। যদিও সম্প্রতি রাজস্ব আহরণ বেড়েছে। এর মধ্যে ভ্যাটের অবদান বেশি। মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে ভ্যাট থেকে। ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাবনার ব্যাপারে তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে ওষুধ, সিগারেট কোম্পানিগুলো ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিচ্ছে। ফলে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনলে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি হবে।

তিনি বলেন, শুধু উন্নয়ন বাজেটের আকার বড়ই হচ্ছে না, ৯০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রবৃদ্ধি বেশি হলে বৈষম্য বাড়ে। কিন্তু আমাদের সে তুলনায় বাড়েনি। আমাদের বৈষম্য বাড়ার হার কম। আমরা অর্থনীতিকে গ্রামে নিয়ে গেছি। বাজেটে মিথ্যা বলা হয়, এটি ভিত্তিহীন।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, টেকসই উন্নয়ন করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, কমিয়ে আনতে হবে অর্থনৈতিক বৈষম্য। এই বৈষম্য কমিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের। সেই সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। দেশের একটা গোষ্ঠী যদি বেশি আয় করে, আরেকটা গোষ্ঠী কম আয় করেÑ তখনই বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। এই বৈষম্য কমাতে রাজস্ব আদায়ের ধরন বদলাতে হবে। জনগণের কাছ থেকে সরকারকে রাজস্ব নিতে জানতে হবে।

বাজেট বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১১ সাল পর্যন্ত বাজেটের আয়-ব্যয়ের মধ্যে ৩-৫ শতাংশ পার্থক্য পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন সেটি ৭৫-৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অর্থাৎ বাজেটের যে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয় সেটি বাস্তবায়িত হয় না। বছর শেষে এটি সংশোধন করা হচ্ছে। তারপরও প্রকৃত হিসাবে এটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এর মাধ্যমে জনগণের সামনে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। এটি এক ধরনের অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে কোনো শাস্তি হয় না।

ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় অনুযায়ী ভ্যাট ১৫ শতাংশ হতে পারে না। তাই এটা কমানো উচিত। যে কোনো কর আরোপে চারটি নীতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। একটি হচ্ছে, করের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ। দ্বিতীয়ত, কোন কর আয় বা ভোগ বৈষম্য বাড়ায় বা কমায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। তৃতীয়ত, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর কতটুকু প্রভাব ফেলে। চতুর্থত, প্রশাসনিক দক্ষতা কর দাতা ও রাজস্ব আহরণে কতটুকু সহজ। তিনি বলেন, ভ্যাট রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু মানুষের মধ্যে ভোগের বৈষম্য বাড়াবে। সব থেকে বেশি চাপ তৈরি হবে নিম্নবিত্তদের ওপর। কারণ তাদের ওপর আরোপিত করের হার আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, বাজেট এমনভাবে করা উচিত যাতে ২০২৫ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হয়। তা হলে দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন গতি আসবে, তেমিন অর্থনৈতিক কর্মকা-ও বাড়বে।

তিনি বলেন, দেশে সাড়ে ৮ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধিত। কিন্তু ১ লাখের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩২ হাজার ভ্যাটদাতার রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে। বাকিদের কোনো রাজস্ব সরকারের হিসাবে জমা হয়নি। এটি গুরুতর অপরাধ। সরকারের অর্থ কোনো ব্যক্তির হিসাবে রাখা যায় না। এদের শাস্তি হওয়া উচিত। তাই আমার মনে হয় ভ্যাট নিয়ে আলোচনা করে লাভই নেই।

তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশ মুদ্রা বিনিময় ও ভ্যাটের একাধিক হার রেখে সফল হয়নি। বাংলাদেশেও এটি সফল হবে না। ভ্যাটের হার একটিই হওয়া উচিত। দুটি নয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ভ্যাট আরোপ করে সম্পূরক শুল্ক তুলে দিলে দেশের অর্থনীতির মহাসর্বনাশ হবে। ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বাজেট প্রণয়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সুপারিশে করলে ভালো হয়। সংসদে সম্পূরক বাজেটের ওপর বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। আমাদের বাজেট অল্প আলোচনায় পাস হয়ে যায়। ভ্যাট আইনের মূল উদ্দেশ্য সংস্কার হওয়া উচিত। ভ্যাট আইনের দর্শন থেকে সরে আসছে সবাই। ভ্যাটের মাল্টিপল রেট হওয়া উচিত। তা ঠিক করবে ট্যারিফ কমিশন। নতুন আইন বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, অনেকেই বলেছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। কিন্তু আমি মনে করি বিষয়টি উল্টো। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এলেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। লুটপাটের অর্থনীতিতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। কেবল অসম্ভব কল্পনার মধ্যেই থাকতে হবে। দেশে নতুন নতুন ভিশন দেওয়া হচ্ছে। ১৯৭১ মূল লক্ষ্য অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধামাচাপা দিতেই এসব ভিশন সামনে আনা হচ্ছে। ১৯৭১ এর ভিশনের কোনো খবর নেই।

তিনি বলেন, আমাদের বাজেট সংবিধান পরিপন্থী। এতে বৈষম্য বাড়বে। কিছু লোকের কাছে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে।

বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, নির্বাচন যখন আসে তখন অনেক জোরেশোরে দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় বৈষম্য কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। কারণ নির্বাচনের জন্য সাধারণ মানুষের ভোট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের প্রচার বা নির্বাচনে কাছাকাছি সময়ে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচক নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়।

প্রস্তাবিত ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ফলে ভোক্তারা চাপে পড়বেন এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, প্রতিস্তরে যদি ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করা হয় তা হলে মূল্যস্ফীতি আধা শতাংশ বাড়তে পারে। ভ্যাটের প্রভাব ধনী ও দরিদ্র মানুষের ওপর পড়বে না। দরিদ্র মানুষ খাদ্যপণ্যে বেশি ব্যয় করে। তার মধ্যে ধান-চাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে যেগুলো ভ্যাটমুক্ত। তারা এমন জায়গা থেকে কেনাকাটা করে যেগুলো ভ্যাটের আওতামুক্ত। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বেকায়দায় পড়বে। কেননা তাদের ভ্যাট দিতে হবে। আর উচ্চবিত্তের জন্য ভ্যাটের তেমন কোনো প্রভাব নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এই জন্য বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দেশের সরকারি খাতের ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রাজনৈতিক খেলা চলছে, সেটি এখনই বন্ধ করা উচিত। তা না হলে শিক্ষার মান কখনো নিশ্চিত করা যাবে না। তা ছাড়া বর্তমানে টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। তাই গুণগত মান নিশ্চিত করতে ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য থোক বরাদ্দ দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ব্যবসায়ীরা আয় করে নতুন করে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান তৈরি হয়। কিন্তু উদ্যোক্তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। তবে যারা আয় করে সঠিকভাবে কর দেয় না তাদের বিষয় দেখা প্রয়োজন। সুদের হার কম হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ঘোষণা নেই। বিনিয়োগের পূর্বশর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয় মাথায় রাখতে হবে। তা না হলে আমরা পিছিয়ে যাব।

এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, শুরু থেকেই ভ্যাট আইনের সঙ্গে থেকে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের মতের অমিল হয়েছে। সেগুলো বলেছি। কিন্তু সমাধান হয়নি। ১৬৮টি প্রতিষ্ঠান মোট ভ্যাটের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রদান করে। বাকি ৪০ শতাংশ সবাই মিলে দিচ্ছে। ভ্যাট আইন করা হয়েছে মূলত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের জন্য। যারা এখন ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিচ্ছে, তাদের হার কমানো হলে তারা অনেক সুবিধা পাবে। কিন্তু দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ছাড়াও অভ্যন্তরীণ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাটের আওতায় আনা হচ্ছে। এতে তাদের ক্ষতি হবে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ভ্যাটের হার একটি নয়। কমপক্ষে দুুটি হওয়া উচিত। সিমেন্ট বা রডে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ হলে নির্মাণ খরচ অনেক বেশি বেড়ে যাবে। প্রতিবছর রপ্তানি খাতে উৎসে কর নিয়ে অর্থমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে হয়। এটি বছর বছর না করে একসঙ্গে ৫ বছরের জন্য করে দেওয়া উচিত। এতে আমাদের ওপর চাপ কমবে।

বৈঠকটি সঞ্চলনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, দেশ এগোচ্ছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের মানুষকেও এগোতে হবে মানসিকতার দিক থেকে। তা না হলে এখন বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যাবে না। সামনে প্রতিযোগিতার সময়। এতে পিছিয়ে পড়লে চলবে না। অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আমাদের সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার বলেন, মিডিয়া মূলত গণমানুষের কথা বলে। গণমানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আজকের গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়েছে। একই টেবিলে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বাজেট বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যে আলোচনায় ভ্যাটের হারকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য বিষয়ও উঠে এসেছে আলোচনায়। আমরা আশা করব বিষয়গুলো সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বিবেচনায় নিয়ে গণমানুষের স্বার্থে কাজ করবে।

আমাদের সময়ের উপদেষ্টা সম্পাদক আবুল মোমেন বলেন, প্রতিবছর বাজেট পেশ হয় এবং বাজেট সামনে রেখে দেশ ও অর্থনীতি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়। দেশও নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এর মধ্যেও আশা ও হতাশার অনেক বিষয় রয়েছে। বাজেটে মানুষ কীভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে এটি বড় বিষয়। একদিকে মানুষ, অপরদিকে সরকার। এসব নিয়ে আসছে বাজেট। আমাদের লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া। আমরা দেখছি মানবসম্পদের গুণগত উন্নয়নে পিছিয়ে যাচ্ছি। বাজেটের বড় বিষয় নীতি প্রণয়ন। এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে আমরা আশা করি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে