advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রসঙ্গ রেলওয়ের ভেতর-বাহির

রহিম আব্দুর রহিম
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:৫০
advertisement

বাংলাদেশ রেলওয়ে সংস্থাটি দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর একটি যমুনা নদীর পূর্ব পাশের পূর্বাঞ্চল এবং যমুনা নদীর পশ্চিম অংশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল হিসেবে পরিচালিত। এ দুই অঞ্চলের রেলওয়ের চারটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার কমলাপুর, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, পাবনার পাকশী ও লালমনিরহাট। চারটি বিভাগ পরিচালিত হয় চারজন বিভাগীয় ম্যানেজার দ্বারা। একমাত্র বর্তমান সরকার ব্যতীত বৃহৎ সংস্থাটির সংস্কারে কোনো সরকারই আন্তরিক হয়নি। বর্তমান সরকার রেলওয়ে পরিবহনটিকে সংস্কার ও উন্নয়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বহু পুরনো বিশ্বখ্যাত যোগাযোগ সংস্থাটির ছোটখাটো অসংখ্য দুর্নীতি, অনিয়ম, অসঙ্গতি, সুষ্ঠু পরিকল্পনা, দেখভালে ও জবাবদিহিতায় স্বচ্ছতা না থাকায় সংস্থাটি এক পা এগোচ্ছে তো দুপা পেছাচ্ছিল। যোগাযোগক্ষেত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং লাভজনক রেলওয়ের ডিপার্টমেন্ট দুভাগে বিভক্ত। এর একটি ট্রাফিক ও অন্যটি বাণিজ্যিক। এ দুটি বিভাগই পরিচালিত হয় আলাদা আলাদা একজন চিফ অফিসার এবং বিভাগীয় কর্মকর্তা দ্বারা। ট্রাফিক বিভাগের পরিবহন শাখায় ট্রেন পরিচালনা সম্পর্কিত কার্যাবলি সম্পাদন করতে কাজ করেনÑ স্টেশন মাস্টার, ট্রেন পরিচালক (গার্ড), ট্রেন কন্ট্রোলার, ট্রেন নাম্বার টেকার, ইয়ার্ড মাস্টার, পয়েন্টসম্যান, গেটম্যানসহ অন্য কর্মচারীরা। ট্রাফিক বিভাগের প্রধান সমস্যা লোকবল সংকট, একই সঙ্গে রয়েছে সীমাহীন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জন্য সরকারকে বদনামের অংশীদার হতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গেই জনবল সংকট নিরসন জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৫৮ স্টেশন রয়েছে। অথচ প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্টেশন মাস্টার না থাকায় ট্রেন চলাচলে ব্যাপক বিঘœ ঘটছে।

রেল সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন ট্রেন পরিচালক (গার্ড), একটি আন্তঃনগর ট্রেনে দুজন গার্ড দায়িত্ব পালন করার পরিবর্তে একজন দায়িত্ব পালন করছেন। তাতে যাত্রীসেবা যথাযথ হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ এ পদের লোকবল সংকট চরমে। সরকার সংকট কাটানোর জন্য সাময়িকভাবে চুক্তিভিত্তিক যে নিয়োগ দিচ্ছে, তাতে সমস্যা বেড়েই চলছে। কারণ যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তারা বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে অক্ষম। ফলে যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে।

রেলওয়ে বিভাগের বাণিজ্যিক শাখায় রয়েছে টিটিই, বুকিং সহকারী, মেকানিক্যাল, লোকশেড, কারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণকর, বিদ্যুৎ বিভাগ, সংস্থাপন, মেডিক্যাল, ভূসম্পত্তি এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু প্রতিটি শাখাই অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। রেলের জামাই নামে খ্যাত টিটিই (ট্র্যাভেলিং টিকিট এক্সজামিনার) তাদের কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় অবাধে অনিয়ম, দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। এরা একটি ট্রেনে উঠে দু-একটা স্টেশন পার হলে নেমে যান। রেলওয়ে আইনের ৫০৯ ও ৫১০ ধারানুযায়ী রানিং অ্যালাউন্স ও স্পেশাল রানিং অ্যালাউন্স একমাত্র লোকমাস্টার (ড্রাইভার) ও ট্রেন পরিচালক (গার্ড) ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তাদের বেতনের সঙ্গে পাওয়ার কথা না। অথচ এই টিটিইরা রেলওয়ের আইনের ভুল ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত করে এই অ্যালাউন্স উত্তোলন করছেন। এতে করে সংস্থাটির প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। রেলওয়ের বুকিং সহকারীর দায়িত্ব অপরিসীম। কিন্তু এরা জনসাধারণের সঙ্গে অবাধে মেলামেশার সুবাদে টিকিট কালোবাজারিতে ষোলকলা পূর্ণ করছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০১২ সালে ই-টিকিট সিস্টেম চালু করে। ই-টিকিট সেবা জনগণের মধ্যে নিশ্চিত করার জন্য পাঁচ বছরের জন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা সিএনএস নামে পরিচিত। একটি ট্রেনের আসনসংখ্যার বিপরীতে শুরুর দিন ৫০ শতাংশ টিকিট কাউন্টারে এবং অনলাইনে ২৫ শতাংশ টিকিট দেওয়ার কথা থাকলেও গড়ে সাধারণ কাউন্টারে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টিকিট ছাড়া হয়, বাকিগুলো ব্লক করে সিএনএসের কর্মচারীরা রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবাধে টিকিট কালোবাজারি চালিয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে টোটাল টিকিট সিস্টেম প্রত্যেক রেলওয়ে বিভাগের একজন কর্মকর্তার অধীনে দেওয়া যেতে পারে। এতে অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টিকিটের প্রয়োজন হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে ডিজিটাল কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করা যেতে পারে। রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের দুটি শাখা। এ দুটি শাখা দেখভাল করেন এই বিভাগের একজন এডিজি, চিফ এবং বিভাগীয় কর্মকর্তা। রেল ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা লোকশেডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। এই বিভাগের কারখানা শাখা বাংলাদেশে মাত্র দুটি। একটি সৈয়দপুরে, অন্যটি পাহাড়তলী। অথচ এ শাখায় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে বিভিন্ন ট্রের্ড ইউনিয়নের পরিচয়ে তারা দিনের পর দিন কাজ না করেই সরকারি অর্থ লুটপাট করছেন। প্রতি ঈদে কারখানার কর্মকর্তারা বগি রিপিয়ারিং বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট করছেন। এ শাখাটি ঢেলে সাজাতে না পারলে রেলযোগের মৌলিক উন্নয়নে চরম ব্যাঘাত ঘটবে।

রেলওয়ের পর্যাপ্ত ভূসম্পত্তি থাকলেও তা রেল বিভাগের হাতছাড়া হয়েছে অনেক আগেই, যা দখলদাররা দখল করে রাখছে। বর্তমান সরকারের চিন্তা ও চেতনা যেহেতু রেলওয়ের উন্নয়নের দিকে, সে ক্ষেত্রে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক রেলওয়ে বিভাগের সব সম্পত্তি দখলদার মুক্ত করে এসব জায়গার জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে মার্কেট, আবাসিক ভবন, ব্যাংক ও বীমা এবং বেসরকারি অফিস-আদালতের জন্য ভাড়া দেওয়া যায়, তবে প্রতি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে আয় আসবে, তা দিয়ে গোটা সংস্থার ব্যয় নির্বাহ সম্ভব বলে অনেকেই মনে করছেন।

বাংলাদেশ সরকারের বিশাল পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়েকে সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে একটি গবেষণাধর্মী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়িত করা এখন সময়ের দাবি।

য় রহিম আব্দুর রহিম : শিক্ষক