advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’ রুখবে কে 

হোসনেয়ারা ইসলাম মৌ
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ২১:৪৮ | আপডেট: ২৪ মার্চ ২০১৯ ২০:২২
advertisement

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর দেশে চরমপন্থীদের কালো থাবা আর তেমন পড়েনি। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চৌকস অভিযান ও কার্যক্রমে দেশে ধর্মীয় চরমপন্থীদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ অনেকাংশেই সফল বলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা অনেকেই মনে করেন। দেশের সাধারণ মানুষও হয়তো তেমনটাই মনে করে। তবে ধর্মীয় চরমপন্থা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে হলে প্রথমে প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। এরপরই কেবল প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনার অভাবের কারণে তা একেবারে নির্মূল হচ্ছে না।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সমাজে উগ্রবাদ ছড়ায় বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করে থাকেন। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য গড়ে ওঠে ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’র ওপর ভিত্তি করেই। শুধু তাই নয়, এই মডেলের চরমপন্থার কারণে রাষ্ট্রে নানা ধরনের প্রভাব পড়ে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। অর্থনীতির চরপন্থীদের কারণে রাষ্ট্রীয় নানা সিদ্ধান্ত অনেক সময় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

তাই ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’ রুখতে হলে প্রথমে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের। রাষ্ট্রে কাঠামোগত পরিবর্তন না আনলে এই চরমপন্থা বন্ধ করা কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না। ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই চরমপন্থা বন্ধ করা যেন কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না মধ্যম আয়ের এই দেশে। ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’ কমানো না গেলে দেশের সব অগ্রযাত্রা এক সময় হয়তো মুখ ধুবড়ে পড়বে। তাই সুস্থ ধারার অর্থনীতি চলমান রাখতে প্রথমে প্রয়োজন অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। এটা করা সম্ভব হলেই কেবল সোনার বাংলায় রূপ নেবে এই বাংলাদেশ। কিন্তু সেই কাজে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’র নানা প্রভাব হরহামেশাই লক্ষ্য করা যায়। 

খেলাপি ঋণ বাড়ছেই

২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর গত বছরের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ। এর বাইরে দীর্ঘদিন আদায় করতে না পারা যেসব ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে, তার পরিমাণও কম নয়। অঙ্কে যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায়। খেলাপি ঋণের সঙ্গে অবলোপন করা এ মন্দ ঋণ যুক্ত করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। (সূত্র : প্রথম আলো, ৭ ডিসেম্বর ২০১৮)

‘অর্থনৈতিক চরপন্থা’র কারণেই এই খেলাপি ঋণ দিন দিন বাড়ছে। শুধু তাই নয়, অনেক ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সময় ঝুঁকি পর্যালোচনা ছাড়াই তাদের আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দেয়। পাশাপাশি ঋণ গ্রহীতাদের অনেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অথবা প্রভাবশালী কারও সহায়তায় ঋণ নেওয়ায় তা পরিশোধের আগ্রহ কম দেখাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।  

ব্যাংকখাতে কেলেঙ্কারি

ব্যাংকখাতে চরমপন্থার একটি বড় উদাহরণ হলমার্ক কেলেঙ্কারি। ২০১০-১২ সালে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে জালিয়াতি করে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এতে হলমার্ক গ্রুপই হাতিয়ে নেয় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে এমন চরমন্থা দমাতে না পারলে গোটা দেশকেই মূল্য দিতে হবে।    

ব্যাংকখাতে আরেক কেলেঙ্কারির নাম বেসিক ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সৈয়দ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করে। ব্যাংকের ঋণ (ক্রেডিট) কমিটি সৈয়দ ট্রেডার্সকে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করেনি, তারপরও পরিচালনা পর্ষদ তড়িঘড়ি করে ওই গ্রাহকের পক্ষে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

ফারমার্স ব্যাংকসহ আরও অনেক ব্যাংকে এমন ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’র বড় উদাহরণ হাজির করা যায়। প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো অর্থনৈতিক খাতে এসব খারাপ ও ভারসাম্যহীন নজির সামনে আসছে। সঠিক জবাবদিহিতা ও অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় এই খাতের চরমপন্থা বন্ধ হচ্ছে না।     

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি

ব্যাংক খাতের বাইরে দেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র শেয়ারবাজার। আকাশের রংয়ের মতো সেই শেয়ারবাজারের চরিত্র পাল্টায়। শেয়ার বাজারের উপর সেই ‘কালো চোখ‘ অনেক দিন আগে পড়েছে, আমরা সেটা রদ করতে পারছি না। তাইতো আজ একটা শেয়ার ৫৬ টাকায় কিনলে কাল তার দাম হয় ১০-১২ টাকা। এভাবে অনেক মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা‘র এই গ্রাস থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।

এই শেয়ারবাজারে ১৫ বছরের ব্যবধানে বড় দুটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। শেয়ারবাজার প্রসঙ্গ এলেই ঘুরেফিরে আসে এই দুটি কেলেঙ্কারির কথা। একটি ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারি, অপরটি ২০১০ সালের কেলেঙ্কারি হিসেবে বহুল আলোচিত।

সন্দেহজনক লেনদেন

বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আর্থিক খাতে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে ঘুষ-দুর্নীতি, অর্থ পাচার, অনিয়ম, ঋণে জালিয়াতি ও কেলেঙ্কারি বেড়েই চলেছে। ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুধু ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই ২ হাজার ৩৫৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য দিয়েছে বিএফআইইউকে। এর আগের অর্থবছরে ১ হাজার ৬৮৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট জমা পড়ে। এসব থেকে খুব সহজেই অর্থনীতির এই খাতের চরম অব্যবস্থাপনার নজির উঠে আসে।   

অতি ধনীর তালিকায় প্রথম বাংলাদেশ

বিশ্বে অতি ধনীর তালিকায় বাংলাদেশ এখন এক নম্বরে। এই অতি ধনী তারাই, যাদের সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ডলার বা তারও বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় যাদের সম্পদ ২৫০ কোটি টাকার বেশি, তারাই অতি ধনী। এই তথ্য দিয়েছে লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স। এই তালিকায় বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে বেশি।

একবার ভাবুন তো, যে দেশে সাধারণ মানুষের খাবার সংকট, সেখানে হঠাৎ এত ধনী বেড়ে গেল কীভাবে। এটাই ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’। এই চরমপন্থীদের আটকাতে হবে।  

২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য এটা নিঃসন্দেহে খুশির খবর। এটা অর্থনীতির জন্য বা দেশের জীবন-মানের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে অর্থনীতির আকার বিবেচনায় ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিলে’ দুই ধাপ এগিয়ে বিশ্বে ৪১তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ-সিইবিআর বলছে, অর্থনীতির এই গতি ধরে রাখতে পারলে ২০৩৩ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো তথ্য।

দেশের ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’ কমাতে না পারলে বা উদ্যোগ নিতে না পারলে এই অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। আগামীতে আবার রিজার্ভ চুরির মতো নতুন কান্ড ঘটে দেশের অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে। ‘ধর্মীয় চরমপন্থা’ নির্মূল করার সঙ্গে সঙ্গে ‘অর্থনৈতিক চরমপন্থা’ ও ‘সড়কের চরমপন্থা’ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এটা করতে না পারলে অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা ফিরবে না। আর এই খাতে আস্থা না এলে দেশ সমৃদ্ধ হবে না।

হোসনেয়ারা ইসলাম মৌ : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়