advertisement
advertisement

রাজউকে প্লট বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম

দুলাল হোসেন ও সানাউল হক সানী
১৫ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০১৯ ০০:৩৪

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পের একই প্লট দুই বা তিনজনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের চার শতাধিক প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম হয়।

মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে রাজউকের একটি জালিয়াতচক্র। একইসঙ্গে ১৫ হাজার প্লটের চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রের অফিস কপিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর না দেওয়া এবং ১০ হাজার প্লটের কিস্তি পরিশোধের ব্যাংক রসিদ নষ্ট করার অভিযোগও রয়েছে জালিয়াতচক্রটির বিরুদ্ধে।

বিষয়টি জানার পর এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজউক। জানা গেছে, রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ২২ হাজারের বেশি প্লট বয়েছে। এর মধ্যে চার শতাধিক প্লট দ্বৈত বা তিনজনের নামে বরাদ্দপত্র ইস্যু করেছে একটি জালিয়াতচক্র।

একই সঙ্গে চক্রটি ১০ হাজার প্লটের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও এককালীন পরিশোধের ব্যাংক রসিদ প্লটগ্রহীতার অফিস নথিতে সংরক্ষণ করেনি। এসব ব্যাংক রসিদ অন্য একটি স্থানে ফেলে রাখায় মুদ্রণ মুছে গেছে এবং ছিঁড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রকল্পের ১৫ হাজার প্লটের চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রে অফিস-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কোনো স্বাক্ষর নেই; তবে গ্রাহকের কাছে চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রে কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। স্বাক্ষরহীন চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র নিয়ে ব্যাপক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে এসব প্লটের মালিকানার বিষয়টি নির্ধারণ নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছে রাজউক। পাশাপাশি প্লটগ্রহীতারা প্লট বুঝে পাওয়ার আশায় রাজউকে ঘোরাঘুরি করছেন। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্লটগ্রহীতাদের বাগ্বিত-া হচ্ছে। এ অবস্থায় বিষয়টি সুরাহার জন্য রাজউকের বোর্ডসভায় একটি কর্মপত্র উপস্থাপন করা হয়।

ওই কর্মপত্রের আলোকে অনিয়মগুলো তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মপত্রে বলা হয়, রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ক্যাটাগরিসহ সব ক্যাটাগরির প্লটের গ্রহীতা তাদের প্লটের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও এককালীন কিস্তির অর্থ পরিশোধ করে ব্যাংক রসিদগুলো তৎকালীন কর্মকর্তা উপপরিচালকের (এস্টেট ও ভূমি-৩) দপ্তরে জমা দিয়েছেন। কিন্তু ওই সময় জমা করা ১০ হাজার প্লটের কিস্তির ব্যাংক রসিদগুলোর নথি সংরক্ষণ না করে অযতেœ ফেলে রাখা হয়।

এতে অনেক রসিদের মুদ্রণ মুছে বা ছিঁড়ে গেছে। প্লটগ্রহীতাদের কিস্তি পরিশোধের ব্যাংক রসিদ নথিতে সংরক্ষণ না করায় রাজউকে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের একই প্লট দ্বৈত বা ডুপ্লিকেট বরাদ্দ দেওয়ায় উভয় বরাদ্দগ্রহীতা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি সুরাহা করা প্রয়োজন উল্লেখ করে পূর্বাচল প্রকল্পের দপ্তর থেকে একটি কর্মপত্র আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য রাজউকের ২/১৯তম বোর্ডসভায় উপস্থাপন করা হয়। কর্মপত্রে তিন দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সব ক্যাটাগরির প্লট বরাদ্দপ্রাপ্ত দ্বিতীয়, তৃতীয় ও এককালীন কিস্তি পরিশোধের ব্যাংক রসিদ সংরক্ষণ না করায়, চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রের অফিস কপিতে স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় নির্দেশনা প্রদান।

দ্বিতীয়ত, প্লট গ্রহীতারা অফিসে এসে অসদাচরণ ও রাজউক সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ, নানা রকম অশালীন মন্তব্য এবং বর্তমানে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করছে, যা রাজউকের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে।

তৃতীয়ত, একই প্লট দ্বৈত বা ডুপ্লিকেট বরাদ্দ হওয়ায় উভয় বরাদ্দ গ্রহীতা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ জটিলতা নিরসনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে ওপর সিদ্ধান্ত দিতে রাজউকের বোর্ডসভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য কর্মপত্র উপস্থাপন। এর পর বোর্ডসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে একই প্লট দ্বৈত বা ডুপ্লিকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে ৪০০ বেশি প্লটের ক্ষেত্রে। প্রতিটি দ্বৈত বা ডুপ্লিকেট বরাদ্দপত্র ১ থেকে ৬ মাসের ব্যবধানে ইস্যু করা হয়েছে। এই প্লটগুলো মূলত অর্থের বিনিময়ে করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, রাজউকের প্লটের গ্রহীতারা প্লটের কিস্তি পরিশোধকালে তিনটি রসিদ পান।

এসব রসিদের একটি থাকে ব্যাংকে, একটি রাজউকের অফিস (গ্রহীতার) নথিতে এবং একটি গ্রহীতার কাছে। কিন্তু পূর্বাচল প্রকল্পের ১০ হাজার প্লট গ্রহীতা তাদের কিস্তির পরিশোধের ব্যাংক রসিদ রাজউকে জমা দিলেও অফিস নথিতে সেগুলো নেই। এসব রসিদ নথি না রেখে অন্যত্র ফেলা রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রের আলোকে প্লটের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের ১৫ হাজার প্লটের যে চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র ইস্যু করা হয়েছে, সেগুলোর অফিস কপিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নেই। এটি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গ্রহীতারা। চূড়ান্ত বিষয়টি খুবই জটিল আকার ধারণ করেছে। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্তের পরই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজউক চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান ও সচিব সুশান্ত চাকমার মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তারা তা রিসিভ করেননি।