advertisement
advertisement

তরুণ সমাজের মুক্তির আলো

১৫ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০১৯ ১১:৩৯

পৃথিবীজুড়ে মিলিয়ন মিলিয়ন বই। এত বই পাঠের তো সময় নেই। তা হলে প্রশ্ন জাগে কোন বইগুলো পাঠ আমাদের জীবনের জন্য জরুরি? এসব উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই অগণিত পাঠক বইয়ের রাজ্যে প্রবেশ করে হয়ে যায় দিশেহারা। কেউ কেউ আবার নিজের জীবনকে সাজানোর চিন্তায়, নিজের স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় কব্জা করার চেতনায় কিনতে থাকে মোটিভেশনাল স্পিকারদের বই যা মূলত উপদেশ বাণীর মতো জীবনের সঠিক পথ অনুসরণের নির্দেশনামা।

এই বইগুলো অনুপ্রেরণা জোগায়, পাঠককে উজ্জীবিত করে।

অনুপ্রেরণা কী? তা হলো চিন্তা-চেতনার অভিনব পরিবর্তন। আর প্রেষণা-মোটিভেশন? তা হলো কাজের গতি পরিবর্তন, জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া যা ক্ষণিকেই মৃত্যু লাভ করে। খাদ্যগ্রহণের পর তার স্বাদ যেমন দীর্ঘস্থায়ী নয়, প্রেষণাও তেমনি।

আর সাহিত্য? সাহিত্য হলো জীবনের সব তলকে, অনুভব-উপলব্ধিকে, মানবার্তিকে স্পষ্টভাবে মননে প্রোথিত করার এক নন্দনতাত্ত্বিক মানব-অভিযাত্রা। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এবার বইমেলায় সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়, এই নন্দনতাত্ত্বিক অভিযাত্রায় শামিল হওয়ার চেয়ে কোনো কাজ করে সহজ পন্থায় জীবনে সফল হওয়ার জন্য বর্তমান তরুণ প্রজন্ম মরিয়া। কী ভয়ঙ্কর হতাশায় নিমজ্জিত বলে তারা জীবনে সাফল্যের সূত্র খুঁজছে বুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ অথবা আইবিএতে শ্রেষ্ঠ ফলাফল অর্জনকারীদের কেতাবে।

কাব্য এবং কথাসাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, জাতি হিসেবে নিঃস্ব মননের এবং স্বপ্নহীনতার এক প্রতীক হয়ে ওঠা। একটা প্রজন্ম আনন্দ আর স্বপ্ন হাতড়ে বেড়াচ্ছে ইউটিউব, ফেসবুকের বর্ণময় পাতায়, তার নিউজফিডে। ভাইরাল হওয়া ছবি, ট্রল, প্রোপাগান্ডার বিষয়বস্তু এখন তাদের বেঁচে থাকার রসদ। এর কারণে তাদের জীবনে তৈরি হচ্ছে চরম হতাশা। ভয়ানক হতাশা কাটাতে এসব বইয়ের ভেতর তারা জীবন-রসদের চেয়ে বইয়ের লেখকদের মতো জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ভিডিও গেমসে ফুটবল খেলে নিজেকে যিনি খেলোয়াড় মনে করেন বাস্তবতা হলো, গোল করা তো পরের কথা; সত্যিকারের ফুটবল মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দৌড়ানোর সক্ষমতাই সে হারিয়ে ফেলে। উপদেশ বাণী পাঠ হলো ভিডিও গেমসে ফুটবল খেলার মতো। হিতোপদেশ সংবলিত গ্রন্থে কোনো চরিত্র সৃষ্টি হয় না বলে তা কোনো দৃষ্টান্ত হয়ে মানব মননে প্রতিভাত হয় না বিধায় আমাদের কল্পনায়, মননে এবং চিন্তায় কার্যকর প্রভাব ফেলতে সক্ষম নয়।

যদি হতো, তা হলে সাহিত্যের পরিবর্তে শ্রেষ্ঠ হিতোপদেশদাতাদের জন্য নোবেল পুরস্কারের প্রথা চালু হতো। এখনকার প্রজন্ম মূল্য দিয়ে জীবনকে মাপতে চাইছে। কিন্তু জীবন মূল্যমানে নয় বরং তা পরিমাপিত হয় অর্থবহতায়। বড় মাপের কর্ম ছাড়া জগতে বড় হওয়ার উপায় নেই। সেই কর্ম যা মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিতে, তাকে টেকসই করতে সাহায্য করে। গ্রন্থ হলো সেই কল্পনা এবং বোধ-অনুভবের সূতিকাগার। ব্যক্তি মানুষের প্রতিটি স্বপ্ন এবং প্রতিটি আকাক্সক্ষার রয়েছে একটা পতনবিন্দু।

সেই পতনবিন্দুকে গল্পের ভেতর চরিত্রের মধ্য দিয়ে পাঠক শনাক্ত করতে পারে এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য তার স্বপ্ন-কামনার ভেতর তৈরি করে দেয় এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি। কল্পনার সমৃদ্ধির কারণেই তৈরি হয় সেই মানসিক প্রস্তুতি। একটা মহান উপন্যাস-গল্পে কী থাকে? থাকে বিস্তৃত এক জীবন, চরিত্রের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সেসব বদলে যাওয়া চরিত্রের জীবন সংগ্রাম। মানুষের বিপদে তাদের পাশে থাকার মন্ত্র হলো মানুষের এই জীবনার্তিকে উপলব্ধি করতে শেখা।

যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে গল্প-উপন্যাস থেকেই উপলব্ধি বিধায় আহরিত হয়। গল্প-উপন্যাসে থাকে আগামী দিনের জন্য ইঙ্গিতবহ বার্তা। পাঠকের অবচেতন মন তার ইঙ্গিতটুকু নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। গল্পে থাকে পরাজিত জীবনকে ঘুরে দাঁড় করানোর চরিত্রগুলোর দৃঢ়তা যা পাঠকের স্নায়ুতন্ত্রে আশ্রয় নিয়ে তাকেও এক ধরনের জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি ময়দানে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড় করানোর জন্য অনুপ্রেরণা দেয়।

গল্পের দর্শন এবং কল্পনা অবচেতনভাবেই জীবন এবং জগৎকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে তীক্ষè চোখ তৈরি করে দেয়। কল্পনার কারণেই আইনস্টাইন আলোর ভেতর কণা দেখতে পেয়েছিলেন। গল্প জীবন এবং জগৎকে অন্তর্লোকের চোখ দিয়ে দেখার আয়না। গল্প-কবিতার বাক্যে বাক্যে ছড়ানো জীবনার্তি অথবা অনুভব একজন মানুষকে অন্য মানুষের জীবনার্তির প্রতি, তার অনুভব-অনুভূতির প্রতি, তার স্বপ্ন এবং মর্যাদার প্রতি অনুভবসমৃদ্ধ করে দেয়। গল্প-উপন্যাসই মানুষের চোখের দৃষ্টিকে, আত্মার শক্তিকে এতদূর ছড়ায় যে, একজন সুপাঠকের শক্তিশালী আত্মা পদ-পদবি, অর্থবিত্তের আত্মংহারকে পায়ে ঠেলে মানবতাকে, মানুষের আত্মমর্যাদার স্থানটুকুকে সে শনাক্ত করতে চায়। সবার ওপর মানুষ সত্য এবং সেই মানুষের মাঝে তিনিই সত্য যার আছে প্রজ্ঞাময় হৃদয়, মানবিক মূল্যবোধের জাগ্রত সত্তা, তাকেই চিনতে শেখায় গল্প-উপন্যাসের পটভূমিতে চিত্রিত জীবন। কেননা খলচরিত্রকে কল্পনায় সে ঘৃণা করার অনুশীলন উপন্যাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে অঙ্কিত জীবন থেকেই করতে শেখে বলে এমনটা হয়।

সত্যিকার সৃষ্টিশীল একজন মানুষেরও চারপাশের এসব জনপ্রিয়তায় অস্থির হওয়া উচিত নয়। তারা সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসরমান থাকেন বলে বর্তমানকালের মানুষ তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করতে পারবেন, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। নোবেল পুরস্কারের আগে রবীন্দ্রনাথের বই খুব বেশি মানুষ পড়তেন না। তখন রেলস্টেশন এবং বটতলার চটি বই বিক্রি হতো অনেক বেশি। জীবনানন্দ দাশের কথা আর না-ই বা বলি। কিন্তু এখন? ভ্যান গগের চিত্রকর্মগুলো বিক্রি হয় না বলে তিনি তা দিয়ে ঘরের চালে ঢাকনা দিয়েছেন, ফুটো বন্ধ করেছেন। অর্ধাহারে, অনাহারে ভ্যান গগ মারা গিয়েছেন। কিন্তু চিত্রকর্মের জগতে ভ্যান গগ এখন অবিস্মরণীয় নাম। অর্থাৎ শিল্পের পথ আত্মত্যাগের।

কেননা শিল্পীর প্রগতিশীল চেতনার জন্য, অগ্রগামী ভাবনার জন্য বর্তমানকাল এবং সময় তাকে মূল্যায়নে সময় নেয়। প্রকাশকদের শিল্পসত্তার চেয়ে ব্যবসায়িক সত্তা বেশি জাগরূক বলে তারা প্রচারণায় সরবদের গুরুত্ব দেবেন, এই-ই তো স্বাভাবিক। একজন শিল্পীর দৃষ্টি থাকে প্রজন্মান্তরে, মহাকালে। দূরকে দেখার এই দৃষ্টি এবং দর্শন না থাকলে, শিল্প করতে চাওয়া ক্লিশে-ক্লান্তির এবং গ্লানিকর বলেই এক সময় মনে হবে। জনস্তুতি রাজনীতিবিদদের নিত্যদিনকার পুষ্টিকর খাদ্য হলেও শিল্পীর জন্য তা অপুষ্টির কারণ হতে পারে! সবকালেই নষ্টদের দৌরাত্ম্যে মানুষের জীবন, তাদের ভবিষ্যৎ বিপদাপন্ন থাকে। একজন বোধসম্পন্ন শিল্পীসত্তার মানুষ এই দৌরাত্ম্যে শামিল হওয়া থেকে শুধু বিরতই থাকবেন না, মুক্তির পথ অন্বেষণ করবেন, তাই-ই প্রত্যাশিত।

সেজন্যই ত্যাগটুকু তার কপালের মহাতিলক। গল্প মানুষকে, মানুষের জীবনকে সমগ্রতার দিকে টানে। হিতোপদেশ আর বাণী ব্যক্তিবিশেষের জীবনকে তলিয়ে দেখতে চাওয়ার এক প্রবণতা। ব্যক্তিজীবনে মানবিক উন্নয়নের আড়ালে বস্তুত আয়-উন্নতির হিসাব-নিকাশকে আড়চোখে দেখে তুষ্টি অথবা অতুষ্টির বয়ান। কিন্তু সাহিত্য সমগ্র মানবতার দিকে চোখ মেলে, হৃদয় খুলে দেখার প্রবণতা।

ব্যক্তিক বড়ত্বের চেয়ে সাহিত্য সমগ্র মানবতার বড়ত্বকে বড় করে দেখার চোখ ফুটিয়ে দেয়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সাহিত্য সেই কাজটা করে প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে ধীর লয়ের গান গেয়ে গেয়ে, তার আত্মাকে এক অনাবিল শান্ততা উপহার দিয়ে। কিন্তু তার মানে কি এই, আমরা সারাক্ষণ গল্প-উপন্যাস-কবিতা নিয়েই থাকব। না, তাও নয়। বরং ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শনসহ জ্ঞানের বিচিত্র শাখায় বিচরণের জন্য সাহিত্যের কাছ থেকেই প্রবল আগ্রহের জন্মটাকে নিয়ে আমাদের অভিযাত্রাকে গতিময় করব।

কে না জানে, একজন মননশীল ব্যক্তির কাছে পৃথিবী তার দ্বার খুলে দেয় আনন্দের কলকাকলিতে। কিন্তু মননহীনতা, শুধু তথ্যের চকমক দ্বারা পরিপূর্ণ হৃদয় তা গ্রহণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে শিগগিরই। সাহিত্য ধৈর্য এবং স্থৈর্য শেখায় কিন্তু তথ্য শেখায় সহজ পন্থায় জীবনে বড় হওয়ার পথ।

কাজী রাফি : কথাসাহিত্যিক