advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পরিবহন নেতাদের কার্যক্রম ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ

তাওহীদুল ইসলাম
২২ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০১৯ ০৯:৩৬
advertisement

সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে বেপরোয়া যান চলাচল। গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মিম ও রাজু। বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা।

এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে চলা প্রতিযোগিতার জেরে একটি বাস ফুটপাতে উঠে দুজনকে চাপা দেয়; ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাদের। এর প্রতিবাদে মিম ও রাজুর সহপাঠীরা রাস্তায় নেমে আসেন। রাজধানীর অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে সেই প্রতিবাদে শামিল হন। একপর্যায়ে তাদের সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সবার মূল দাবি ছিল একটাই, নিরাপদ সড়ক চাই। সে সময় আন্দোলনকারীদের নানা আশ্বাস দেয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পরিবহন নেতারা সে সময় বলেছিলেন, চালকদের বেপরোয়া মনোভাবে পরিবর্তন আনতে, সর্বোপরি সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাসে তারা বেশকিছু কার্যক্রম হাতে নেবেন। কিন্তু এ আশ্বাসটুকুই সার। ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে তাদের কার্যক্রম; নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা, তাই পাল্টায়নি অবস্থাও। চালকদের মনোভাবে আসেনি কোনো পরিবর্তন। গত মঙ্গলবার তাই প্রাণ দিতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে। জেব্রা ক্রসিংয়ে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) বাসে উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি।

এ সময় গাজীপুরগামী সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস একই পরিবহনের অপর একটি বাসকে ওভারটেক করতে বেপরোয়া গতিতে এগিয়ে এসে আবরারকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা খেয়ে তিনি দুটি বাসের মাঝখানে পড়ে যান। পরক্ষণে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এর জেরে শিক্ষার্থীরা ফের যখন শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে সড়কে নেমেছে, তখন কথা উঠেছে চালকদের এহেন বেপরোয়া মনোভাবের কোনো পরিবর্তন না হওয়া নিয়ে, পরিবহন নেতাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা নিয়ে।

এদিকে ঢাকায় সাম্প্রতিক আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সবকটিতেই বাসের বেপরোয়া চালনাকে দায়ী করেছে এআরআই। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬৯৯ জন নিহত এবং এক হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই বাসের কারণে ঘটেছে।

অন্যদিকে আবরারের ঘাতক বাসচালক সিরাজের ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত বছরের ২৯ জুলাই কলেজশিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় জাবালে নূর পরিবহনের সেই বাস এবং বাসটির চালকের লাইসেন্সের বিষয়েও এমন সিদ্ধান্তই হয়েছিল। এবার নতুন সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এ দুটি কোম্পানির বাস আপাতত রাস্তায় চলতে পারবে না। আগামী ৩ দিনের মধ্যে গাড়ির কাগজপত্র যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। এরপর পুলিশ ও বিআরটিএ মিলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবে বলে জানা গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, বেপরোয়া বাসচালনার নেপথ্যে রয়েছে মালিকের সঙ্গে চালকের চুক্তির মাধ্যমে গাড়িচালনা, চালক ও সহকারীদের মাদকের প্রতি আসক্তি এবং তাদের মাত্রাতিরিক্ত কর্মঘণ্টা।

চুক্তিভিত্তিক কাজ করায় বেশি যাত্রী পেতে একই রুটের এমনকি একই পরিবহন কোম্পানির বাসের চালকদের মধ্যেও চলে ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা। কারণ এক্ষেত্রে যত বেশি যাত্রী টানা যাবে, তত বেশি আয় হবে চালক ও তার সহকারীর। এর জেরে প্রাণ হারান সাধারণ পথচারী ও যাত্রীরা। চালক যদি বেতনভিত্তিক হতেন তবে এহেন প্রতিযোগিতা অনেক কম হতো। মাসিকভিত্তিতে বেতন দেওয়ার কথা বাসমালিকরা মুখে বললেও কার্যত চুক্তিতেই গাড়ি চলে বলে দাবি অধিকাংশ চালকের। দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ চালকের মাদকাশক্তি। প্রায় প্রতিদিনই অতিরিক্ত সময় শ্রম দিতে দিতে একসময় ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন অনেক চালক। খোদ বাসমালিকরাই ইতিপূর্বে একাধিক বৈঠকে এমন তথ্য দিয়েছেন।

গত বছর দুই কলেজশিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন চরমে, তখন চুক্তিতে গাড়ি চালানো বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সে সময় আরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, টার্মিনাল থেকে ফিটনেসবিহীন বাস বের করতে দেওয়া হবে না। লাইসেন্সবিহীন চালকদেরও ধরা হবে টার্মিনাল থেকে বাস বের করা আগেই। কিন্তু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে পরিবহন নেতাদের কার্যক্রম।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান আমাদের সময়কে বলেন, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, কমিটি গঠন। সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৬তম সভায় এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবারও বৈঠক করেছে। এতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে যা পরবর্তী বৈঠকে (২৭ মার্চ) চূড়ান্ত হতে পারে। বেপরোয়া বাস চালনা প্রসঙ্গে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেছেন, এটি বন্ধে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

পরিবহন নেতারা জানান, রাজধানীতে বাস-মিনিবাসের মালিকের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। যাত্রীবাহী বাসের রয়েছে ৩৬৬টি রুট। অনুমোদন রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৩টি বাস-মিনিবাসের; চলছে ৬৩৮২টি বাস, ২৬৬৫টি মিনিবাস। এর মধ্যে সুপ্রভাত পরিবহনের বাস চলে ১৬৭টি। এ কোম্পানির অনুমোদন রয়েছে ১৮৬০টি বাস চালানোর। অতিরিক্ত আয়ের আশায় রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে চলে বাসের প্রতিযোগিতা। এটি ঠেকাতে বাস নেট পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

দুর্ঘটনার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে চালকের অদক্ষতার কথা জানিয়েছে বুয়েট। সুপ্রভাত পরিবহনের চালকেরও ভারী যান চালনার লাইসেন্স নেই। হালকা যানের লাইসেন্স নিয়ে স্টিয়ারিং ধরেছিলেন সিরাজ। বুয়েট বলছে, ঢাকা শহরে বেশিরভাগ চালকই অনভিজ্ঞ। ভারী লাইসেন্সধারী চালকরা ঢাকায় গাড়ি চালাতে আসে না। ফলে দক্ষ চালকের অভাবে মালিকরা অদক্ষদের হাতে গাড়ি তুলে দিচ্ছেন। সঙ্গত কারণেই বাড়ছে দুর্ঘটনার সংখ্যা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, চুক্তিতে বাস চলায় ঢাকার সড়ক প্রাণঘাতী হয়ে ওঠেছে। চুক্তিতে চলার কারণে চালকরা সব সময় খরচ তোলার চাপে থাকেন। আয় বাড়াতে রাস্তায় যাত্রী পেতে মরিয়া থাকেন। এক জরিপে বলা হয়েছে, সারাদেশে যত দুর্ঘটনা ঘটে তার ৩৬ শতাংশ ঘটে শহরাঞ্চলে। শহরাঞ্চলের এসব দুর্ঘটনার মধ্যে আবার ৭৪ শতাংশই সংঘটিত হয় রাজধানীতে।
জানা গেছে, বাসে বাসে প্রতিযোগিতা রেষারেষি বন্ধের উদ্যোগ এক দশক ধরে পরিকল্পনায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ চাঁদাবাজি। চুক্তিতে চলা বাসগুলোর চালককে চাঁদা দিতে হয়। এর বাইরেও মালিককে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা জমা দিতে হয়। তেল, গ্যাস ও হেলপারের খরচও চালকের। প্রতিদিন সকালে একটি বাস পথে নামতে গেট পাস (জিপি) দিতে হয় ১০০ টাকা। যে কোম্পানির অধীনে বাস চলে, তার নাম ব্যবহারে দৈনিক চাঁদা দিতে হয় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। টার্মিনালভিত্তিক সমিতিতেও চাঁদা দিতে হয় অনেক বাসকে। এ ছাড়াও পথ খরচ নামে ট্রাফিককে ঘুষ দিতে হয়। একটি বাসকে দিনে কমপক্ষে এক হাজার ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। তাই খরচ তুলতে চাপে থাকা চালক বেপরোয়াভাবে বাস চালান।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, মালিকদের মধ্যে মুনাফা সমবণ্টনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালক যতটা দায়ী, ততটা দায়ী পরিবহন ব্যবস্থাপনাও।

advertisement