advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উপায় ছিল না অতর্কিত হামলা মোকাবিলার

জিয়াউর রহমান জুয়েল,রাঙামাটি
২২ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০১৯ ০০:১৮
advertisement

রাঙামাটির বাঘাইছড়ির হত্যাকাণ্ডে সন্ত্রাসীরা ভারী ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিল বলে প্রথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। এছাড়া ‘অতর্কিত এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করেছে বন্দুকধারীরা। রাস্তার উপরের পাহাড় এবং দুই পাশ থেকে ছোড়া গুলি বৃষ্টির মতো পড়ে ওই দুটি গাড়িতে। আক্রান্ত গাড়ি দুটির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও বিজিবির টহল গাড়ি থাকলেও অতর্কিত হামলার কারণে হামলাকারীদের মোকোবিলা করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।’ নির্বাচন কমিশন গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ মন্তব্য করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাঙামাটি জেলা সদর থেকে খাগড়াছড়ি সদর হয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পৌঁছেন তারা। তদন্ত দলটি সাত খুনের ঘটনাস্থল ও তার আশপাশের এলাকা পরিদর্শন ছাড়াও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আলামত ও তথ্য-উপাত্ত খোঁজে।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়াও ঘটনার দিন নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার, আনসার ভিডিপি সদস্য, নিহতদের পরিবারের সদস্যসহ আহতদের সঙ্গে কথা বলে। এর পর কমিটির সদস্যরা যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে চিকিৎসাধীন আহতের সঙ্গে কথা বলেন ও পরিবারে খোঁজখবর নেন।

পরে দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে মতবিনিময়সভায় তদন্ত কমিটির প্রধান দীপক চক্রবর্তী বলেন, ‘যদি প্রয়োজন হয় বাঘাইছড়িতে আবার আসব, নইলে রাঙামাটিতে আসব।’ তিনি সবার সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘আপনারা সঠিক তথ্য জানালে আমরা তা সরকারের কাছে তুলে ধরব।’

তবে তিনি হামলার কারণ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এদিকে তদন্ত দলের সফরের মধ্যেই সকালে বাঘাইছড়িতে হামলার প্রতিবাদ ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় হরতাল-অবরোধসহ কঠিন কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে র‌্যাব ও সেনাক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপিত সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার হত্যার ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন ওসি পারভেজ আলী। পৃথক এ দুই হত্যাকা-ে কেউ আটক হয়নি এখন পর্যন্ত।

তবে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগির কবির বলেছেন, আসামিদের খুঁজতে এলাকায় এলাকায় অভিযান চলছে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতরা তদন্ত দলকে জানান, নির্বাচনী ফল ও সরঞ্জামসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের বহনকারী দুটি জিপ গাড়ি লক্ষ্য করে অতর্কিত এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করেছে বন্দুকধারীরা। রাস্তার উপরের পাহাড় এবং দুই পাশ থেকে ছোড়া গুলি বৃষ্টির মতো পড়ে ওই দুটি গাড়িতে। গাড়ি দুটির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীর টহল থাকলেও অতর্কিত হামলার কারণে হামলাকারীদের মোকোবিলা করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। সামনে থাকা বিজিবির দুটি গাড়ি ততক্ষণে ঘটনাস্থল অতিক্রম করে অনেক দূর চলে যায়। আর নির্বাচনী ফল ও সরঞ্জামসহ পেছনে থাকা পুলিশের গাড়িটিও হামলায় আক্রান্ত হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন পুলিশের সদস্যরাও। তা ছাড়া ওই দুটি জিপে থাকা আনসার-ভিডিপি সদস্যদের হাতে অস্ত্র থাকলেও অতর্কিত হামলায় তাদের প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ হন। ফলে পাল্টা জবাবের কোনো সুযোগ ছিল না।

কমিটির সদস্য সচিব অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলাম জানান, ‘ঘটনাস্থল ও তার আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আলামত ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।’ ‘হামলাকারীরা ভারী ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিল’- যোগ করেন এই কর্মকর্তা।

বাঘাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ মঞ্জুর বলেন, মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। দ্রুত অগ্রগতি আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাঘাইছড়ির ঘটনার ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবির বলেন, হামলা হয় অতর্কিত। সে কারণে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িতে থাকা প্রায় সবাই আক্রান্ত হয়ে গুলিবিদ্ধ হন। ফলে পুলিশসহ নিরাপত্তাবাহিনীর টহল থাকলেও সম্ভবত তাৎক্ষণিক মোকাবিলার পরিস্থিতি ছিল না। তবে ঘটনার পর এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও স্বাভাবিক রয়েছে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। ১৮ মার্চ বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গাড়িতে অস্ত্রধারীদের ব্রাশফায়ারে দুই পোলিং অফিসার, চার আনসার-ভিডিপি সদস্যসহ সাতজন নিহত হন, গুলিবিদ্ধ হন আরও অন্তত ১৭ জন। কয়েক জন ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন আছেন।

এ ঘটনার পরদিন সকালে অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন বিলাইছড়ি আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। দুটি ঘটনাই নির্বাচনকেন্দ্রিক বলে ধারণা সূত্রগুলোর। ঘটনার পরদিন ১৯ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশনায় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের চট্টগ্রামের পরিচালক দীপক চক্রবর্তীর নেতৃত্বে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলামকে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত ডিআইজি ফয়েজ আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (যুগ্ম সচিব) আশীষ কুমার বড়–য়া, চট্টগ্রাম ৩০ আনসার ব্যাটালিয়নের পরিচালক ও অধিনায়ক মো. নুরুল আমিন, বিজিবি রাঙামাটি সেক্টরের বাঘাইহাট জোনের মেজর আশরাফ ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছাদেক আহমদ।

এই কমিটি গত ১৮ মার্চ সংঘটিত হত্যাকা- ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন; সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও নিহত-আহতদের জানমালের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ; ভবিষ্যতে এরূপ সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রণয়ন করবেন। কমিটিকে গঠনের পরবর্তী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। বাঘাইছড়ির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক অনুদান দেবে ইসি বাঘাইছড়ির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যেক পরিবারকে আর্থিক অনুদান দেবে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে সাড়ে ৫ লাখ, গুরুতর আহতদের ১ লাখ টাকা করে ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য আহত ও নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।