advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিশ্বের আদর্শ প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন

জাহাঙ্গীর সুর
২৩ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০১৯ ০৮:৫০
advertisement

অথচ এমনই তো হওয়ার কথা ছিল। জাসিন্ডা আরডার্ন যা করছেন, তা-ই কি একজন প্রধানমন্ত্রী কিংবা জননেতার দায়িত্ব নয়? কিন্তু বিশ্ব এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি যেন কোনো ভিনগ্রহ থেকে আসা এক নেতা। যিনি বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে এক সুরে বাঁধছেন উদারতার আহ্বানে; বিদ্বেষের দাগ মুছে দিচ্ছেন ভালোবাসার গানে, বন্দুকের বদলে বলছেন বন্ধনের কথা।

তরুণ এই নেতা সত্যিকারের শান্তির দূত যেন। ১৫ মার্চ শুক্রবার যখন মুসল্লিরা সাপ্তাহিক দুপুরের নামাজ পড়ছিলেন, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটো মসজিদে আধা-স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে জঙ্গি হামলা চালান এক অস্ট্রেলীয় নাগরিক। হামলার আগে এক ‘ঘোষণাপত্রে’ ২৮ বছরের ওই যুবক নিজেকে ‘শ্বেতাঙ্গ’ বলে অভিহিত করেন। হামলার কারণ হিসেবে অভিবাসী ও মুসলিমদের দ্বারা ইউরোপীয়দের প্রাণহানির কথা বলেন তিনি।

বোঝাই যায়, বর্ণবাদ, স্বজাতিপ্রেম ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ কাজ করেছিল ব্রেনটন ট্যারেন্টের জঘন্য ওই হত্যাযজ্ঞে। আল নুর ও লিনউড মসজিদে তার হামলায় পাঁচ বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ৫০ জন নিহত হয়েছেন। হামলার পরপরই বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা কথা ছড়িয়ে পড়ছিল। বলা হচ্ছিল, এবার তো বলা হবে, হামলাকারী মানসিকভাবে অসুস্থ; এটা কোনো জঙ্গি হামলা নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আরডার্ন তাৎক্ষণিক যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন, তাতে তিনি বলেন, ‘এটা অবশ্যই একটা জঙ্গি হামলা।’

এর পর আদালতে তো আমরা দেখেছি, হামলাকারীর পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (পরে প্রত্যাখ্যাত) আইনজীবী জানান যে, ব্রেনটন মানসিকভাবে অসুস্থ নন। হামলায় আহতদের যখন হাসপাতালে দেখতে গেলেন কিংবা হতাহতদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করলেন আরডার্ন, আমরা তাকে দেখলাম, অনেকটা হিজাব ধাঁচের পোশাকে তিনি হাজির হলেন। এর পর সংসদে যখন যোগ দিলেন, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করলেন, আলোচনার শুরুতে আরডার্ন বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’ (আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)।

আরডার্ন তার মন্ত্রিসভাকে ও তার জোটভুক্ত প্রধান নেতাকে বোঝাতে সমর্থ হলেন, দেশের অস্ত্র আইন বদল করতে হবে, কঠোর করতে হবে। এমনকি বিরোধীদলীয় নেতা পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগ দিলেন। পুলিশ বাহিনী এবং অস্ত্র বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানও সমর্থন করল। এবং আমরা দেখেছি, এরই মধ্যে আধা-স্বয়ংক্রিয় সব অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই তা সংসদে আইন আকারে পাস হবে।

শান্তির দেশ নিউজিল্যান্ডে এ ধরনের হামলা খুবই বিরল। সেই ১৯৯০ সালে একটা বন্দুক হামলা হয়েছিল, মারা গিয়েছিল ১৩ জন। তার পর ক্রাইস্টচার্চ। অথচ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিলে, কতটা দূরদর্শী হলে এত দ্রুততম সময়ে অস্ত্র আইন বদলে ফেলতে পারে একটা সরকার। আরডার্ন সেটাই করে দেখাচ্ছেন। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলা নিয়মিত ঘটনা।

১৯৮২ সালের পর থেকে ৯০টির বেশি গণগুলির ঘটনা ঘটেছে। অথচ সেখানে অস্ত্র আইনে কড়াকাড়ি আরোপ করা হয়নি, হচ্ছে না। মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, এ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে যুক্তরাষ্ট্রের। মানবতার এক মহারূপ যেন আরডার্নের ভেতর খুঁজে পাচ্ছি আমরা। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, হামলাকারীর নাম তিনি মুখে আনবেন না। বরং তিনি তাদের স্মরণ করবেন, তাদের নাম মুখে তুলবেন যারা হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওই হামলাকারী একজন ‘জঙ্গি। অপরাধী। উগ্রবাদী।’

শান্তির যে পৃথিবী মানুষ চায়, সেই পৃথিবীর প্রতিচ্ছবিই আমরা দেখছি আরডার্নের কর্মকা-ে। তারই উদ্যোগে নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে গতকালের জুমার নামাজের আজান প্রচার করা হয়েছে। দুই মিনিট নীরব থেকেছে নিউজিল্যান্ড। জাতভেদ ভুলে মানুষ গেয়েছে ঐক্যের জয়গান। আরডার্ন গতকাল সংক্ষিপ্ত পরিসরে নিজের আবেগ প্রকাশের সময় ইসলামের নবীর বাক্যে আশ্রয় নিয়েছেন। হজরত মুহাম্মদকে (সা) উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাসী (বিশ্বাসীরা) পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে এক শরীরের মতো। যখন শরীরের কোনো এক অঙ্গে ব্যথা হয়, তখন পুরো শরীরেই সে ব্যথা অনুভূত হয়।’

সাংস্কৃতিক সৌহার্দবোধের এ এক বড় উদাহরণ। আমার সংস্কৃতিই শ্রেষ্ঠ, অন্যেরটা তুচ্ছ, এই বোধই তো যত ক্ষতি সাধন করেছে পৃথিবীর। আরডার্ন তার উল্টোস্রোতে হাঁটলেন। উল্টো নয়, বলা ভালো, মানবতার সঠিক পথেই রইলেন। যখন কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক করে, তখন আমরা বলি, নোবেল পাবেন কিম ও ট্রাম্প (দুই দেশের নেতা)। যখন ভারতের বৈমানিককে আটক করে আবার ফেরত দেয় ‘শত্রুদেশ’টি, তখন আমরা বলি, ‘নয়া পাকিস্তানের নায়ক’ ইমরান খানকে নোবেল দেওয়া উচিত। উচিত কি, এরই মধ্যে এসব নেতার নামে শান্তিতে নোবেলের জন্য মনোনয়নও দাখিল করেছেন অনেকে। কিন্তু সত্যিকারের শান্তির দূত জাসিন্ডা আরডার্নের জন্য কেউ কি নোবেল মনোনয়ন দাখিল করবেন? তাতে কিছু যায় আসে না। সম্ভবত, অন্তত আরডার্নের এমন মহিমা নোবেলের পাল্লায় মাপা যাবে না। সব মানুষ এক সুরে ভালোবাসুক সব প্রাণকে। ভালোবাসার জয় হোক।

advertisement