advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জীবনযুদ্ধে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা সরেজমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০১৯ ০৮:৫৩
advertisement

অভাবের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা ফরিদ মিয়ার। গ্রামেও তেমন কাজ নেই। দিন দিন দেনার দায় বাড়ছেই। তাই তিন বছর আগে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। বরিশালের এক বন্ধুর সাহায্যে মাছ বিক্রি করে কোনো রকমে ঘুরে দাঁড়ান। ভাষানটেকের আবুলের বস্তিতে তার সাজানো-গোছানো সংসার।

দুই ছেলে ও এক মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মিরপুরের সেলটেক্স গার্মেন্টেসে চাকরি নেন স্ত্রী হাজেরা খাতুন। সব মিলিয়ে আগের চেয়ে ভালোই কাটছিল জীবন। তবে সুখটা বেশিদিন সইল না, ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ড পুড়ে ছাই হয়ে যায় সবকিছু। শোক কাটিয়ে কর্মস্থলে কয়েক দিন না যেতে পারায় চাকরি হারাতে হয় হাজেরাকেও।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাষানটেকের সিআরপি ও বিআরপির মাঝখানে সরকারি জায়গায় পানির ওপর গড়ে তোলা আবুলের বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। জীবন নিয়ে ঘর থেকে বের হলেও স্বল্প আয়ের মানুষগুলো রক্ষা করতে পারেনি তাদের কষ্টের ধনে কেনা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও অর্থকড়ি। সে রাতে এককাপড়ে কোনো রকমে বের হয়ে আসতে পারলেও সর্বস্ব হারিয়েছে আবুলের বস্তির ৪৬৬টি ও জাহাঙ্গীরের বস্তির ৩৭টি পরিবার। এক সময় আগুনের লেলিহান শিখা থামলেও খেটে খাওয়া ঘুমন্ত মানুষগুলো জেগে আর তাদের স্বপ্নের খোঁজ পায়নি।

গত রবিবার দুপুর ২টার দিকে আবুলের পোড়া বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, ভস্ম ঘরের পাশের রাস্তার ধারে বসে বাঁশের বেড়ায় তার জুড়ছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত ফরিদ মিয়া। তার পাশে বসেই স্বামীকে সাহায্য করছিলেন হাজেরা। আর মায়ের পাশে খেলা করছে তাদের ৭ বছরের মেয়ে ফারজানা। ফরিদ মিয়া জানান, সে রাতে সবাই যখন আগুন আগুন বলে চিৎকার করছিল, তখন এককাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে পানিতে (ডোবা) ঝাঁপ দেন তিনি। আর হাজেরা ২ বছরের ফাহিমকে কোলে নিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন। কোনো রকমে তারা পাড়ে উঠতে পারলেও আগুনের ঘরের সঙ্গে মাছ বিক্রির ৩০ হাজার টাকা, স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কারসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েক দিন কর্মস্থলে যেতে না পারায় হাজেরাকে বরখাস্ত করেছে সেলটেক্স কর্তৃপক্ষ। পাওনা বেতন-ভাতাও দেওয়া হয়নি। ফলে থাকা-খাওয়ার চিন্তায় সন্তানদের নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন এ দম্পতি। ফরিদ জানান, সরকারের পক্ষ থেকে যে সাহায্য দেওয়া হয়েছে, তা অপ্রতুল। তাই গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেশী একজনের কাছ থেকে সুদে ২ হাজার টাকা ধার নিয়েছেন। ঝড়বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে সে টাকায় কোনো রকমে একটা ঘর তুলে বসবাসের চেষ্টা করছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত চম্পা রানির অবস্থা আরও করুণ। ছাগল লালনপালন করে তিনি সংসার চালাতেন।

বস্তিতে আগুন লাগার পর ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে পারলেও ঘরের মালামালের সঙ্গে পুড়ে গেছে তার ২০টি ছাগল। গত রবিবার দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা বস্তির পাশের রাস্তায় বসে সন্তানকে কোলে নিয়ে নিজের পোড়া ঘরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন চম্পা, যেন হারানো স্মৃতি হাতরে বেড়াচ্ছেন। মাথা গোঁজার জন্য ঘর তুলবেন, সে টাকাও হাতে নেই। কেউ তাকে সুদেও টাকা দিতে রাজি হননি।

এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে তিন এখন কোথায় যাবেন, কী করবেন, সেসব ভেবেই চোখে কেবল অন্ধকার দেখেন বলে জানালেন চম্পা। এদিকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেওয়া নয়টি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন জাহাঙ্গীর বস্তির ক্ষতিগ্রস্তরা। তবে তাঁবুতে জায়গা না পেয়ে রোদ-বৃষ্টিতেও খোলা আকাশের নিচে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে ছেঁড়া তাঁবু, প্লাস্টিকের পলিথিনজুড়ে কোনো রকমে জবুথুবুভাবে আবুলের বস্তির ক্ষতিগ্রস্তরা নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। জীবন-চাকা সচল রাখতে কেউ আবার ঘুরে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছেন। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েই বুনছেন নানা স্বপ্ন। দেড় বছরের রিয়া মণি রবিবার দুপুরে তাঁবুর নিচে ঘুমিয়ে ছিল। আশপাশে পরিচিত অনেকেই নানা কাজে ব্যাস্ত, কেবল তার মা-বাবাই সেখানে নেই।

কী করে থাকবেন? পেটের তাগিদে মেয়েকে একা ফেলেই কাকডাকা ভোরে মা শিউলি চলে গেছেন কাজে। তিনি ছুটা গৃহকর্মী। বাবা বিল্লালও বেড়িয়েছেন রিকশা নিয়ে। আবার স্বজন না থাকায় বেশ কয়েকজন অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পড়ে আছেন তাঁবুর নিচে। অন্যের দেওয়া খাবার আর দান-দক্ষিণায় চলে তাদের জীবন। আবুলের বস্তির উদ্যোক্তা মো. আবুল মিয়া আমাদের সময়কে জানান, ক্ষতিগ্রস্তরা নিজেরাই প্লাস্টিক কিনে খালি জায়গায় বাঁশের খুঁটির সঙ্গে তা বেঁধে কোনো রকমে পরিবার নিয়ে দিন পার করছেন। কেউ কেউ আবার ধারকর্জ করে পোড়া বস্তিতেই ঘর তোলার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু সব হারিয়ে বেশিরভাগ মানুষই আজ নিঃস্ব। জীবন বাঁচাতে ওই রাতে ডোবায় ঝাঁপ দেওয়ায় নোংরা পানি শ্বাসনালি ও গলা দিয়ে ঢুকে অনেক শিশুই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের কেউ শিশু হাসপাতালে, কেউ মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আসলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থারও নিদারুণ অভাব রয়েছে এখানে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে আরও সাহায্য কামনা করেন আবুল মিয়া।

advertisement