advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement

আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে করুক সাধারণ মানুষ মারল কেন

জিয়াউর রহমান জুয়েল রাঙামাটি
২৩ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০১৯ ০৮:৫৭
advertisement

‘পাহাড়িরা যদি আন্দোলন করে, সরকারের সঙ্গে করুক। সাধারণ মানুষের তো এইখানে কোনো কিছু করার নেই। তাদের মারল কেন?’ আক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রাখলেন তসলিম। কাচালং বাজারের দিনমজুর তসলিম আহমদ (৫৫)। বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ডের শিকার আনসার-ভিডিপির সদস্য জাহানারা বেগমের স্বামী। অভাবের সংসার। তাই সন্তানদের পড়াশোনা আগায়নি।

তবে স্ত্রী আনসারে যোগ দেওয়ায় ছোট ছেলে মোশারফ (১৫) স্কুলে যাচ্ছে। পড়ছে নবম শ্রেণিতে। বড় ছেলে রুবেল (২৩) আর দুই মেয়ে তাসলিমা (১৯) ও রোজিনা আক্তারের (১৭) বিয়ে দেওয়ার খুব শখ ছিল জাহানারার। পূরণ হলো না। তসলিম বলেন, আগের দিন রাত ১০টার দিকে ফোনে সর্বশেষ কথা বলেছিলাম জাহানারার সঙ্গে। বলেছিল, ‘আমাদের ভয় লাগতেছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি নাই। শুধু পুলিশ আর আমরা ভিডিপির সদস্যরা আছি।’

সকাল ৯টায় আবারও কথা হলে জাহানারা বলে, ‘এখানে ভোটার নাই, ভোট হচ্ছে না; আমরা বসে আছি।’ এটাই ছিল শেষ কথা। ভয়ের কথাটাই এখনো তার কথা কানে বাজছে। ‘তারপর দুপুর থেকে ফোন করে বন্ধ। বাঘাইহাটে গোলাগুলি হয়েছে, আহতদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে- শুনেই সেখানে গিয়ে শুনি আমার স্ত্রী মারা গেছে। মাথা ও কোমর ভেদ করে গুলি বেরিয়ে গেছে। রক্ত আর রক্ত।’

চোখ ভিজে যায় জলে, গলা ধরে আসছে তসলিম আহমদের। রাঙামাটি শহরে গতকাল শুক্রবার দুপুরে মিহিরের পাশাপাশি কথা হয় বাঘাইছড়ি হত্যাকা-ে নিহত চার আনসার-ভিডিপি সদস্যের স্বজনদের সঙ্গে। সেদিনের ঘটনা আর হারানো স্বজনদের ফেলে যাওয়া স্মৃতি হাতড়ে ফিরছেন তারা। তার কিছুটা জানিয়েছেন এই প্রতিবেদককে। স্বজন হারানো স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর বিয়োগান্ত এ অধ্যায় বয়ে নিয়ে চলবেন সারাজীবন। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাওয়ার সঙ্গে সেনাক্যাম্প স্থাপন ও পরিবারগুলোর দায়িত্ব নিতেও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।

‘আর কোনো দিন ছবি তুলতে পারব না বাবার’ হত্যাকাণ্ডের আরেক শিকার আনসার-ভিডিপির প্লাটুন কমান্ডার মিহির কান্তি দত্ত। তার বড় ছেলে পিয়াল স্নাতক পরীক্ষা দিয়েছেন। অপেক্ষায় আছেন ফলের। বাবার অন্তপ্রাণ ছিলেন। মিহির নিজেই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাজেকের নির্বাচনী ডিউটিতে। ছিলেন একসঙ্গে কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে। ফটোগ্রাফিতে ছেলের হাত ভালো দেখে ভোট শেষ হওয়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে ছবি তুলে দেওয়ার বায়না ধরেছিলেন মিহির। বলেছিলেন, ‘দেখিস অস্ত্রের নিচের অংশে ‘তুলা ৫৬’ লেখাটা যেন বাদ না পড়ে’।

কিন্তু সেই ছবিটাই যে শেষ ছবি হয়ে ওঠবে, জানা ছিল না পিয়ালের। বলেন, ‘আর কোনো দিন ছবি তুলতে পারব না বাবার। সারাজীবন এই আফসোস নিয়েই কাটাতে হবে। আমার বাপি আর কোনো দিন ছবি তুলে দেওয়ার আবদার করবেন না’Ñ চোখ ঝাপসা হয়ে আসে পিয়ালের। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তার মা সেবু দত্ত (৪০) ততক্ষণে কান্না শুরু করে দিয়েছেন। ডিউটি শেষ করে উপজেলা সদরে ফেরার পথে বাঘাইহাটে জিপগাড়ি থেকে নেমে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরেন বলে বেঁচে যান পিয়াল। মিহির কান্তি দত্ত বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলী ইউনিয়নের করেঙ্গাতলী বাজারের বাসিন্দা।

বৃদ্ধ মা, স্ত্রী সেবু দত্ত আর দুই ছেলে পিয়াল ও অভিষেক দত্তকে নিয়েই ছিল তার সংসার। মাকে খুঁজে ফিরছে ছোট্ট মাওয়া পশ্চিম লাইল্যাঘোনা এলাকার বাসিন্দা বিলকিস আক্তার ছিলেন আনসার-ভিডিপির ইউনিয়ন দলনেত্রী। বছর চারেক আগে স্বামী মারা গেছে। দুই কন্যাসন্তান নিয়েই চলছিল তার জীবন সংসার। বড় মেয়ে জান্নাতুল নুর (১৭) এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। অপেক্ষায় আছে ফলের। ছোট বোন জান্নাতুল মাওয়ার বয়স চার বছর। এখন তাদের ঠাঁই হয়েছে নানুর বাসায়।

ছোট বোনকে নিয়ে আগামী দিনের কথা ভেবে দুচোখে অন্ধকার দেখছে জান্নাত। ‘আমার মা সরকারি ডিউটি পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দিল। এখন আমাদের সংসার কীভাবে চলবে জানি না। সরকার কোনো ব্যবস্থা করে দিলে ছোট বোনটিকে নিয়ে চলতে পারব’, বলছিল জান্নাতুল নুর। আর ছোট্ট মাওয়া এঘর-ওঘরে শুধু মাকে খুঁজে চলছে। নানান সান্ত¡না দিয়েও মাঝে মাঝে তার জেদ থামানো যায় না। সারাদিন শুধু মা, মা করে কান্না করছে জান্নাতুল মাওয়া।

সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া হলো না আল আমিনের কাচালং বাজারের দিনমজুর সেলিম উদ্দিন (৪০) বলেন, আমার স্ত্রী ও ছেলে আল আমিন ভিডিপিতে চাকরি করে সংসারের হাল ধরেছিল। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে ছেলে। ও সেনাবাহিনীতে ভর্তি হবে এ আশায় অনেক কষ্ট করে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। ছোট ছেলে রুহুল আমিন নবম শ্রেণিতে আর মেয়ে সেলিনা আক্তার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। স্ত্রীর সঙ্গে আল আমিনকেও হারালাম। তার জায়গায় আমার ছোট ছেলেকে যেন সেনাবাহিনীতে চাকরির সুযোগ দেয় সরকার।

সেনাবাহিনীতে চাকরি করার খুব শখ ছিল আল আমিনের। তাই মাকে বলেছিল, ‘সাজেকে ডিউটিতে (নির্বাচনী) গেলে আমার একটা অভিজ্ঞতা হবে।’ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমার সেই প্রাণবন্ত ছেলে। আহা রে, হাসপাতালে গিয়ে দেখি পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে গুলি বেরিয়ে গেছে। সে ছিল জিপের ছাদে।’

মিহিরের অস্ত্র উদ্ধার : ঘটনার চার দিন পর নিহত আনসার মিহির কান্তি দত্তের খোয়া যাওয়া ৩০৩ রাইফেলটি পাওয়া গেছে। বাঘাইছড়ি উপজেলা আনসার কর্মকর্তা আবুল বাশার জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে সড়কের পাশ থেকে রাইফেলটি উদ্ধার হয়।

নিহতদের স্বজনদের অর্থ সহায়তা : এদিকে হত্যাকাণ্ডে নিহত আনসার-ভিডিপির চার সদস্যের স্বজনদের এক লাখ টাকা করে অর্থ অনুদান দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির আরও চার লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। গতকাল দুপুরে রাঙামাটি জেলা কমান্ড অফিসে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপ-মহাপরিচালক শামসুল আলম এ অর্থ দেন। একই সঙ্গে তিনি নিহতদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরি ও পড়াশোনার খরচের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় জেলা কমান্ডার আবদুল আউয়ালসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

advertisement