advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মযহারুল ইসলাম বাবলা
নিয়ন্ত্রণহীন বাজারব্যবস্থা

২৩ মার্চ ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২৩ মার্চ ২০১৯ ০৯:২৪
advertisement

বারো মাসের প্রতিবছরে এক মাসের রোজার আগমন ঘটে। রোজার মাসের আগমন কেন্দ্র করে খাদ্যপণ্যের বাজার আচানক তেজি হয়ে ওঠে। প্রতিবছরের মতো এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। অন্যদিকে আমাদের ক্ষমতাসীন প্রতিটি সরকার নিজ নিজ শাসনামলে রোজায় বাজারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের কঠোর হুমকি প্রদানের অতিরিক্ত কিছু করতে পেরেছে, তেমন নজির নেই।

সরকারের দৌড় ওই হুমকি-ধমকি পর্যন্তই। উৎপাদনকারী কৃষক বাদে মধ্যস্বত্বভোগী পাইকার, আমদানিকারক, আড়তদার থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত যে চক্রটি দেশে শক্ত ও পাকাপোক্তভাবে গড়ে উঠেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা এ যাবৎ কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এদিকে শীর্ষপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর সংশ্লিষ্টতা আগের মতো আজও বহাল রয়েছে। তবে মাত্রায় বেড়েছে। এ কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের হুমকি প্রদর্শন ছাড়া করণীয় কর্তব্য পালন আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না।

ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক-মতবিনিময়ে বাজারের স্থিতিশীলতার নানা সংবাদ প্রতিরোজার আগেই গণমাধ্যমে দেশবাসী শোনে ও দেখে থাকে। এতে যে ইতিবাচক কিছু ঘটেছে কিংবা ঘটে, এর আলামত দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয় না। আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী স্বয়ং রোজায় খাদ্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার তাগিদে নিজ মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে থাকেন। এতে বাজারের ওপর সামান্য প্রভাব পড়ে বলে বাস্তবে দেখা যায় না। বাণিজ্যমন্ত্রী চাহিদার তুলনায় অধিক খাদ্যপণ্য মজুদের আশ্বাস দেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ঘাটতির কারণে মূল্যবৃদ্ধির অবকাশ নেই।

যেহেতু চাহিদার তুলনায় মজুদের পরিমাণ অনেক বেশি রয়েছে, সেহেতু বাজার নিয়ে শঙ্কার কারণ নেই। রোজায় সারামাসের বাজার একত্রে ক্রয়ের কারণে সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টির কথাও মন্ত্রী বলে থাকেন। আমাদের জিজ্ঞাস্য, তারা কারা? সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণের পক্ষে সেটি তো অসম্ভব। দেশে দিন আনে দিন খায় মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক। তা হলে মোট জনসংখ্যার কত ভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব রোজার মাসের পুরোবাজার একত্রে খরিদ করার। স্বীকার করছি, তেমন মানুষের অভাব নেই। তবে তারা সংখ্যাধিক্য নয়, সংখ্যালঘু। তারা আমাদের শাসকশ্রেণিরই প্রতিনিধি।

তাদের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠের তুলনা করা যাবে না। রোজার মাস ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে সংযম সাধনার মাস বলা হয়। অর্থাৎ আহার, বিলাস, আচরণ, জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রে সংযমের পরীক্ষার মাস। অথচ আমাদের অভিজ্ঞতা ঠিক এর বিপরীত। বছরের অন্য কয়েক মাসের ব্যয়ের সমতুল্য রোজার এক মাসের ব্যয়। ধর্মীয় অনুশাসনের এমন বৈপরীত্যকে কী অভিধায় অভিহিত করা যায়? আহার-বিলাস, অলসতার নজরকাড়া রোজার মাসের চিত্রটি অভিন্নভাবেই আমাদের জীবনে প্রতিবছর ঘুরে-ফিরে আসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে প্রতিটি রোজার মাস নাকাল করে ছাড়ে। সংখ্যালঘুদের এই নিয়ে চিন্তা-দুশ্চিন্তার পরোয়া করতে হয় না।

স্বাধীন দেশের সংখ্যালঘু স্বাধীনতাভোগী শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিরা অর্থ, বিত্ত, সম্পদ, বৈভবের একচ্ছত্র অধিকারী। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম থেকে সরকারের লাগামটি পর্যন্ত। তাদের বিরুদ্ধে ও জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি-সামর্থ্য কারো নেই। এ কারণে আমাদের বাজারব্যবস্থার ওপর কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণ কখনো ছিল না, আজও নেই। বণিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে বাজার। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই বাজারের খাদ্যপণ্যের দর নির্ধারিত হয়ে থাকে। বাজারের মূল্যবৃদ্ধি তাদের ইশারাতেই ওঠা-নামা করে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে নেই।

যে কৃষক কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন, তিনি বাজার অনুযায়ী মূল্য পান না। ফসলের মাঠ থেকে মধ্যস্বত্বভোগী ক্ষমতাধর চক্র গড়ে উঠেছে, যারা কৃষকদের দাদন প্রদানে অতিস্বল্পমূল্যে কৃষিপণ্য খরিদ করে থাকে। দাদন অর্থ পুঁজি। পুঁজির দৌরাত্ম্য কৃষকদের অর্থনৈতিক শোষণের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের আড়ত থেকে সর্বশেষে হাতবদলে খুচরা বিক্রেতার কাছে কৃষিপণ্য পৌঁছানোর পর কৃষকের প্রাপ্তমূল্যের বহুগুণ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ওই পণ্যের। সরবরাহব্যবস্থাজুড়ে সীমাহীন নৈরাজ্য চলছে। হাতবদলে মূল্যবৃদ্ধির অভিনব অপব্যবস্থাটি কিসের জোরে টিকে আছে? সেটিও প্রশ্ন নিশ্চয়। তবে রহস্যপূর্ণ তো বটেই। যখন প্রতিকারের উদ্যোগব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষণ নেই, তখন প্রকৃত রহস্যটি বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বাজারব্যবস্থার এমন নৈরাজ্য নিরসনে এ যাবৎকালের একটি সরকারের শাসনামলেও উদাহরণের নজির সৃষ্টি সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে সাদ্দাম হোসেন সরকারের শাসনামলে পাঁচ বছর ইরাকের বিভিন্ন প্রদেশ ও শহরে ছিলাম।

সেখানে দেখেছি, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর সরকারের কঠোর তদারকি-নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা। বিলাসসামগ্রীর মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। অথচ খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ পণ্যসামগ্রীর মূল্য জলের দরে বিক্রি হতো। ব্যক্তিগত বিক্রেতার পাশাপাশি সরকারের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় বিশাল বিপণন প্রতিষ্ঠান ছিল। সরকারি ওই প্রতিষ্ঠানের অজস্র বিক্রয়কেন্দ্র ইরাকজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। বেসরকারি বিক্রেতারা সরকারের নজরদারিতে যেমন থাকতেন, তেমনি সরকারি বিক্রয়কেন্দ্র থাকায় তাদের পক্ষে পণ্যের এক টাকা মূল্যবৃদ্ধির উপায় ছিল না।

আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের বাজারজাতের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সরকার চরম ভর্তুকি প্রদান করে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করত। কৃষক নিজে যেমন তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারতেন, তেমনি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেও পণ্য বিক্রির সুবিধা পেতেন। উৎপাদন, আমদানি, বিপণন বা বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ-হস্তক্ষেপ ছিল। তাই বাজার ছিল স্থিতিশীল ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, দ্রব্যমূল্যের ওঠা-নামা ছিল না। অথচ আমাদের দেশে সেটি কল্পনার অতীত। একসময় দেশে রেশন পদ্ধতি, টিসিবি সক্রিয় থাকায় বাজারব্যবস্থা একচ্ছত্রভাবে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণাধীনে যেতে পারেনি। তাদের মর্জিমাফিক দরবৃদ্ধির সুযোগ ছিল না।

পর্যায়ক্রমে রেশন পদ্ধতি, কসকর, ন্যায্যমূল্যের দোকান এবং টিসিবিকে নিষ্ক্রিয় ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ফলে আমাদের বাজারব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়েছে। এর কুফল আমরা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করে আসছি। রোজার আগে ও রোজার মাসে অধিকতর তো বটেই। আমাদের গণমাধ্যমগুলো বাজারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রতিরোজার শুরু থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে। এতে জনগণের কোনো সুফল ঘটে না। নয়তো প্রতিরোজার মাসে অভিন্ন দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হবে কেন? আমরা তো প্রতিকার চাই। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অধীন থাকবে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি।

রোজা উপলক্ষ করে লাগামহীন খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা পালনের নজিরও নেই। আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো অভিন্নই বটে। রোজা এলে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যেন অবধারিত। জনগণও এ ক্ষেত্রে অভ্যাসের দাসে পরিণত। রোজায় খাদ্যবিলাসের সীমাহীন হিড়িকের কারণে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবেÑ এটি অনিবার্যভাবেই আমাদের মনোজগতে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। এ কারণে কেউ টুঁ শব্দ করে না। রোজার মাসে মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফাকে অনিবার্য বলেই বিবেচনা করা হয়।

রোজার মাসে পাড়া-মহল্লা থেকে যত্রতত্র সর্বত্রে ইফতারি তৈরি ও বিক্রি হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষই দেশে সর্বাধিক এবং তাদের প্রয়োজন মেটায় ফুটপাতের পাশে গড়ে ওঠা উন্মুক্ত খাবারের দোকানগুলো। ওই খাবারগুলো মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত তো নয়ই, বরং স্বাস্থ্যহানির পক্ষে অতিমাত্রায় কার্যকর। রাস্তার ধুলাবালিমিশ্রিত অস্বাস্থ্যকর খাবারের পসরা সাজিয়ে রাখেন দোকানিরা। নিরুপায় সাধারণ মানুষ ওইসবের বাছ-বিচারের তোয়াক্কা না করে সাশ্রয়ী খাবার ক্রয়ে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোর পাশ এলাকাগুলোর বনেদি হোটেল-রেস্তোরাঁয় অধিক মূল্যের ইফতারি বিক্রি হয়। গাড়ি থামিয়ে ক্রেতারা সেখান থেকে কেনেন দামি খাবার-দাবার। প্রতিরোজার মাসে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। ওই অভিযানের আওতায় কেবলই পাশ এলাকার বনেদি হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো। আমাদের সংখ্যালঘু বিত্তবানশ্রেণির খাদ্যমান তদারক করাই ভেজালবিরোধী অভিযানের মূল লক্ষ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের সর্বাধিক খাদ্যের দোকানগুলোয় তাদের অভিযান পরিচালিত হওয়ার কোনো নজির নেই।

এই অভিযান নিয়েও উৎকোচবাণিজ্যের নানা সংবাদ পাওয়া যায়। সাধারণ-নিম্নমানের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো অভিযান পরিচালনাকারীদের দাবি মেটাতে অর্থাৎ উৎকোচ প্রদানে তিন অঙ্কের অধিক অর্থ প্রদানের সামর্থ্য রাখে না। বাস্তব এ সত্যটি তাদের উপলব্ধিতে রয়েছে বলেই সেদিকে তারা ঘেঁষে না। রোজার মাস কেন্দ্র করে মুনাফার বাণিজ্যের অভয়ারণ্য বাংলাদেশ। রাষ্ট্র-সরকার নিশ্চুপ ও নীরবতা পালন করে, পক্ষান্তরে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাকেই প্রশ্রয় প্রদান করে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত।

এ যাবৎ আমরা জনবান্ধব-জনসম্পৃক্ত একটি ক্ষমতাসীন সরকারের নাগাল পেলাম না। কবির ভাষায় বলতে হয়, ‘বাইরে কেবল কালো আর ধলো, ভেতরে সবার সমান রাঙা।’ আমাদের নির্বাচিত-অনির্বাচিত প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় যাওয়া মাত্রই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জনদাবি-জনআকাক্সক্ষার সামান্যতম তোয়াক্কা করে না। প্রতিটি সরকারের ভাবনা, আখেরাত পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে। নিজেদের আখের গোছাতে এত অধিকমাত্রায় তারা ব্যস্ত থাকে যে, জনগণের ভাবনার অবকাশ আর তাদের থাকে না।

অথচ বাক্যবানে ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক দল মাত্রই জনগণের স্বার্থে সর্বদা উদ্বিগ্ন ও সোচ্চার। একপক্ষ নিজেদের জনগণের কল্যাণে নিবেদিত প্রচারণায় নিমগ্ন। অন্যপক্ষ জনদাবি-জনআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে জীবনপণ মরিয়া। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, এই শাসকশ্রেণি গত ৪৭ বছরে কখনো জনগণের পক্ষে ছিল না, আজও নেই। এই শাসকশ্রেণিকে পরাভূত না করা পর্যন্ত আমাদের সংকট মোচন হবে না। আমরা বলব, লিখব, চিৎকার করব। কিন্তু বাস্তবতা তথৈবচ। সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণ যদি একাট্টা হয়ে দাঁড়ায়, তা হলেই আমরা সম্ভাবনার আলোর মুখ দেখতে পারব। এর আগে বোধকরি নয়।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

advertisement