advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

খালেদা জিয়া প্যারোলে রাজি নন

নজরুল ইসলাম
১৬ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৯ ১৩:০৮

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি খালেদা জিয়া তার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক নন বলে বিএনপি নেতাদের সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে বিজয়ীরা শপথ নিক- এতেও তিনি একমত নন।

তবে দলের একটি সূত্র দাবি করেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে পর্দার অন্তরালে সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চলছে। যেহেতু খালেদা জিয়ার মনোভাবে বোঝা গেছে তিনি প্যারোলে রাজি নন, সে কারণে বিজয়ীদের শপথ নেওয়ার মাধ্যমে এ সমঝোতা হতে পারে। এ সমঝোতার উদ্যোগটি সফল হলে চলতি মাসের ৩০ তারিখের আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি দৃশ্যমান হতে পারে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, কোনো খবর যখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন ধরে নিতে হবে কোথাও না কোথাও এর ভিত্তি আছে। এ উদ্যোগ যে দলীয়ভাবেই হতে হবে এমনটা নয়; দলের বাইরেও হতে পারে। তবে জনগণের কাক্সিক্ষত সিদ্ধান্ত হঠাৎ করেই হয়ে যায়। খালেদা জিয়ার মুক্তির ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটতে পারে।

ওই নেতা বলেন, জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল- এ দুটি মামলা বাদে অন্য সব মামলায় বেগম খালেদা জিয়া জামিনে আছেন। সরকারের দিক থেকে বাধা সৃষ্টি না করলে জামিনযোগ্য ওই দুই মামলায় খালেদা জিয়া জামিনে যে কোনো সময় মুক্ত হবেন।

এ অবস্থায় গত রবিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির দুই নেতা সাক্ষাৎ করেন।

ওই দুই নেতা হলেন গয়েশ্বরচন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খান। কারাবন্দি হওয়ার পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে গয়েশ্বর রায়ের এটাই প্রথম সাক্ষাৎ।

প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বাইরে যে গুঞ্জন রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো কিছু আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রথম হচ্ছে- প্যারোল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। প্যারোল আমাদের দলের বিষয় নয়। এটা খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের বিষয়। সুতরাং এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করিনি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আমরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তিতে আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, কোনো স্বৈর সরকার তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে কখনো এমনিতেই মুক্তি দিয়ে দেয় না। ইতিহাস তা বলে না। তাই আমাদের নেত্রীকে মুক্ত করে আনতে আমাদের আন্দোলন করতে হবে। গণতন্ত্রকে অতীতে বিএনপিই মুক্ত করেছে, এবারও এ দলের ওপর দায়িত্ব। দেশনেত্রীকে মুক্ত করেই আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখব। তবে বিএনপি নেতাদের সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হলেও তার স্মৃতিশক্তি এবং মনোবল বেশ শক্তিশালী।

গত ৭ এপ্রিল বিএনপির উদ্যোগে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে গণঅনশন কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করে প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। কথা বলার সময় খালেদা জিয়া কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্য তুলে ধরেন সাক্ষাৎ করতে যাওয়া নেতাদের সামনে।

খালেদা জিয়ার প্যারোল বিষয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেমন প্যারোলে রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খানের সঙ্গে আলোচনা করতে যাননি, খালেদা জিয়া কোনো প্যারোল না নেন তা দ্বিতীয় নজির হবেন। প্যারোলে মুক্তি হবে বেগম জিয়ার মৃত্যু, গণতন্ত্রের মৃত্যু। আজকে গণতন্ত্র আর খালেদা জিয়া এবং ন্যায়বিচার আর খালেদা জিয়া এক হয়ে গেছে। আমি বলতে চাই, খালেদা জিয়া অতিশিগগিরই মুক্তি পাবেন, তাকে জনতার আদালত মুক্তি দেবে।

বিএনপির নেতারা বলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনার একপর্যায়ে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলার প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তা হলে আমি জামিন পাব না কেন?

বিএনপি নেতারা মনে করেন, এর আগে কখনই খালেদা জিয়া প্যারোল নেননি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে আপসহীন উপাধি পাওয়া খালেদা জিয়া এখনো রাজনীতিতে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে আপসহীন। আসলে সরকার চায় আপসহীন এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে। কিন্তু সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী সে সুযোগ সরকারকে দেবেন খালেদা জিয়ার কথাবার্তায় এমনটা মনে হয়নি। এ ছাড়াও খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলও প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। তাদের সব সময় আইনগতভাবে মামলা পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

তবে দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, অসুস্থ খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য বিবেচনায় এনে তার বের হওয়া উচিত। তিনি ১৪ মাস ধরে নেতাকর্মীদের মাঝে নেই। এ অবস্থায় কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও তার বের হওয়া উচিত। তবে দলের কয়েক নেতা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, যে কোনো উপায় বের হওয়া মানে সমঝোতা। এভাবে খালেদা জিয়া মুক্ত হলে তার আপসহীন উপাধিতে একটি ছেদ ঘটবে।

তাদের প্রশ্ন, সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে আর কত হেয় করা হবে। এখন আমরা চাই, সরকার তাকে জামিনে মুক্তি দিক। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, যেহেতু প্যারোল হচ্ছে না। সে কারণে সমঝোতার একটি ইস্যু রয়েছে। সেটা হচ্ছে-একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের শপথ নেওয়া। এরই মধ্যে বিএনপি জোটের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম থেকে দুজন শপথও নিয়েছেন।

সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেছেন, আরও কিছু অপেক্ষা (সংসদে যোগদান) করছে কিনা, আরও কিছু যাবে কিনা-তাও জানি না। পাখি যায় যাক, সেই পাখিদের একটাই বলব, গণতন্ত্রের নেত্রী গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে জনগণের কাছে হস্তান্তর করে কারও যদি সংসদ যাওয়ার শখ থাকে যান, কিছু বলব না। কিন্তু তিনি (খালেদা জিয়া) জেলে থাকবেন আর পার্লামেন্টে গিয়ে কথা বলবেন, সেই কথা শোনার জন্য কিন্তু আমরা কখনই প্রস্তুত থাকব না।

বিএনপি নেতাদের সূত্রে জানা যায়, এখন বিজয়ীদের শপথ নেওয়ার মাধ্যমে যদি জামিনে খালেদা জিয়ার মুক্তি হয়, তা হলে বিএনপির বেশির ভাগ নেতা আপত্তি করবেন না। বরং খালেদা জিয়াকে তারা রাজি করানোর চেষ্টা করবেন। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত সদস্যদের শপথগ্রহণের ৯০ দিনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপি থেকে বিজয়ী ৬ জনকে শপথ নিতে হবে। যদিও গত রবিবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে নেতাদের আলোচনায় এ বিষয়েও তিনি নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।

তবে গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমরা তো এই সংসদকেই নির্বাচিত বলছি না, আমরা ওই কথিত নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছি। খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে দেখে এসে তিনি ‘অত্যন্ত অসুস্থ’ বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ম্যাডাম বেশ অসুস্থ, অত্যন্ত অসুস্থ। উনি খেতে পারছেন না এখনো। তিনি পা বেন্ড করতে পারেন না। তার বাঁ হাত সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। অর্থাৎ বাম হাতটায় কাজ করতে পারছেন না। এ অবস্থার মধ্যে তিনি আছেন। এক কথায় ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) যথেষ্ট অসুস্থ আছেন। আগের চেয়ে খুব বেশি ইম্প্রুভ করেছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়নি। আজকেও আমরা বলছি, তার (খালেদা জিয়া) পছন্দমতো বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসকদের দিয়ে তার চিকিৎসা করানো হোক। এটা জরুরি। ম্যাডাম দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বলেছেন, দেশবাসী যেন সচেতন হয় এবং এর জন্য কাজ করে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা তার চিকিৎসার ব্যাপারে এসেছিলাম, তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।