advertisement
advertisement

‘শিক্ষিত বেকার যুবকদের পরিবারকে নিঃস্ব করাই তাদের পেশা’

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ এপ্রিল ২০১৯ ১৫:৫০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৯ ১৯:৪৮

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভুয়া সরকারি চাকরিদাতা প্রতারকচক্রের ১৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। এই প্রতারকচক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবককে সরকারি চাকরি দেওয়ার নাম করে তাদের পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে এসব কথা জানান র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির।

তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৫ এপ্রিল বিকাল ৩টা থেকে ১৬ এপ্রিল ভোর ৪টা পর্যন্ত র‌্যাব-৪ এর একটি দল রাজধানীর মিরপুর এবং খিলক্ষেত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এই প্রতারকচক্রের ১৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-লিঙ্কন ওরফে মাসুদ ওরফে প্রশান্ত কুমার সাহা (নওমুসলিম, ৪৩), মো. হাছান জিয়া (৪৪), মো. সাকির আলী ওরফে শাকিল (৩৬), জান্নাতুল ফেরদাউস ওরফে রাসেল (৩৩), মো. সেলিম সরদার (৪৩),শেখ জাকির হোসেন (৪০), মো. আব্দুল কাদের শরীফ (৩৩), মো. হুমায়ুন কবির (৫০),মো. খলিলুর রহমান (৪২), মো. ইসমাইল হোসেন (৩৬),মো. রাকিবুল ইসলাম (২৫),মো. আবুল হোসেন ওরফে সায়মুন (২৮),মো. কেরামত হোসেন, সজিব (৩৮),রুবেল বিশ্বাস (৩৩), মো. কামরুজ্জামান (৪০) ও মো. সাইফুল ইসলাম (২৬)।

র‍্যাব-৪ এর সিও জানান, গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের যোগদানের ভুয়া নিয়োগপত্র, চাকরি প্রার্থীদের সিভি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তার ব্যবহৃত ভুয়া সিলমোহর, সিল প্যাড, কম্পিউটারের সিপিইউ জব্দ করা হয়।

প্রতারণা কলাকৌশল

র‍্যাব সূত্রে জানা যায়, প্রতারকচক্রের সদস্যরা পাঁচটি পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে প্রতারণা সফল করতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

১। প্রোমোটার (চাকরি প্রার্থী সংগ্রাহক) : প্রতারকচক্রের এ শ্রেণীর সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে থাকে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত এলাকা হতে শিক্ষিত, বেকার, চাকরিপ্রত্যাশী যুবকদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেয়া। এরপর তাদেরকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন-সিভি, শিক্ষাগত যোগ্যতা সনদপত্রের ফটোকপি, জন্ম সনদ, নাগরিকত্বের সনদ ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি সংগ্রহ করে রাজধানীতে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

২। ব্যবস্থাপনা টিম : প্রতারক চক্রের এই টিমের সদস্যরা মূলত রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় অথবা হোটেলে অবস্থান করে; চাকরি প্রত্যাশীদের কাগজপত্রসহ ঊর্ধ্বতন ভুয়া কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেয়। এরপর চাকরি প্রত্যাশীদের যাবতীয় কাগজপত্র লোক দেখানো যাচাইবাচাই করে চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রকার শর্তারোপ করে। চাকরি প্রত্যাশীরা এসব শর্তাবলীতে সম্মত হলে চাকরি প্রদানের বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে মৌখিক অথবা লিখিত চুক্তি  করেন তারা।

৩। ভাইবা টিম : প্রতারকচক্রের এ পর্যায়ের সদস্যরা প্রতারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা সংশ্লিষ্ট চাকরির মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে তারা একটি সুকৌশলী ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যেমন-সেনাবাহিনীর চাকরির ক্ষেত্রে চাকরি প্রত্যাশীদের বিশ্বস্ততা অর্জনের নিমিত্তে সেনানিবাসের আশেপাশের এলাকার সুবিধাজনক স্থানে ডেকে প্রার্থীর নাম-ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ চাকরি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্ন করে ভুয়া মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে। একই রকম পদ্ধতি তারা ভূমি অফিস, রেলওয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রে সচিবালয়ের আশেপাশে সুবিধাজনক জায়গায় ভুয়া মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে চাকরি প্রত্যাশীদের বিশ্বস্ততা অর্জনের মাধ্যমে প্রতারণার জাল ফাঁদে। 

৪। মেডিকেল টিম : এই টিমের সদস্যরা চাকরি পূর্ববর্তী মেডিকেল সংক্রান্ত কাজ এ পর্যায়ের প্রতারকরা সম্পন্ন করে থাকে। যেমন- সেনাবাহিনীর চাকরির ক্ষেত্রে তারা সেনানিবাসের আশেপাশের এলাকায় ভুয়া মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্নের পর চূড়ান্ত মেডিকেল পরীক্ষার জন্য সুবিধামত একটি তারিখ নির্ধারণ করে এবং সেনানিবাসের আশেপাশে বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে এনে সেনানিবাসের পাশে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মেডিকেল পরীক্ষা-নিরীক্ষা (চেকআপ) এর ভুয়া প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

৫। হাই অফিসিয়াল টিম : প্রতারকচক্রের এই টিমের সদস্য মৌখিক ও মেডিকেল পরীক্ষার পর চাকুরি প্রত্যাশীদের সাথে সুবিধাজনক স্থানে সাক্ষাৎ করে নিজেকে ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসার, যেমন কর্নেল, লে. কর্নেল, মেজর, সহকারী পরিচালক অথবা সহকারী সচিব অথবা উল্লেখিত অফিসারের একান্ত সহকারী/একান্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দেয়। এ সময়ে প্রতারক চাকরি প্রত্যাশীকে মৌখিক ও মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণসহ নিয়োগপত্র প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং নিয়োগপত্র প্রদান। এরপরে  চাকরিতে যোগদানের তারিখ অথবা মৌলিক প্রশিক্ষণ শুরুর তারিখ জানিয়ে দেয়। পরবর্তীতে সুকৌশলে ও পরিকল্পিতভাবে প্রার্থীকে চাকরিতে যোগদানের নির্ধারিত তারিখের ৩/৪ দিন আগেই ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে চুক্তি মোতাবেক সব টাকা গ্রহণ করে। এ সময় মূল নিয়োগপত্রটি ডাকের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে বলে চাকরি প্রার্থীকে জানানো। পরবর্তীতে চাকরি প্রার্থীরা নিয়োগপত্রে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানে অথবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে  যোগদান করতে হাজির হলে তারা নিয়োগপত্রটি ভুয়া বলে জানতে পারে। তারপর  থেকেই প্রতারকচক্রের সদস্যরা মোবাইল সিম নম্বর বন্ধ করে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তীতে ভুয়া নাম ব্যবহারকারী প্রতারকচক্রের সদস্যদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না।