advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কারাগারে আরেক জাহালম

ইউসুফ সোহেল
১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ১২:৪৩
advertisement

অপরাধী না হয়েও পাটকল শ্রমিক জাহালমকে জালিয়াতির ৩৩ মামলার আসামি হয়ে ৩ বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল। অনেক ঘাটের জল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত উচ্চআদালতের হস্তক্ষেপে তিনি কারামুক্ত হন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা এখন মানুষের মুখে মুখে। এর রেশ না কাটতেই আরেক জাহালম-কাণ্ড বেরিয়ে এসেছে আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে।

জানা গেছে, পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমান নির্দোষ হয়েও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত ৩ বছর ধরে কারাভোগ করছেন। রাজধানীর পল্লবী থানার একটি মাদক মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মাদক কারবারি শাহাবুদ্দিন বিহারি এ মামলার প্রকৃত আসামি। কিন্তু তার পরিচয়ে, তার পরিবর্তে সাজাভোগ করছেন আরমান।

শুধু পিতার নামে মিল থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে শাহাবুদ্দিন নামে আদালতে সোপর্দ করেছে বলে জোর অভিযোগ করেছে তার পরিবার। অন্যদিকে প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিন কারাগারের বাইরে দিব্যি মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ঘটনায় প্রশ্ন জেগেছে, এটি কি পুলিশের ভুল, নাকি সচেতন অপরাধ? উৎকোচের বিনিময়েই কি প্রকৃত মাদক কারবারিকে রক্ষার অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে? যদি তা-ই হয়, তবে এ ঘটনায় কে কে দায়ী? তাদের আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব কি?

একদিকে যখন এসব প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে তখন নির্দোষ কারাবন্দি আরমানের দরিদ্র মা, স্ত্রী আর সন্তানের যাপিত জীবন হয়ে পড়েছে মানবেতর। পুলিশের ভুলে অথবা গোপন কারসাজিতে মৃত ইয়াছিন ওরফে মহিউদ্দিনের ছেলে শাহাবুদ্দিনের পরিবর্তে দীর্ঘ ৩ বছর ধরে কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন মো. আরমান (৩৬)। শুধু পিতার নামে (মৃত ইয়াছিন) মিল থাকায় শাহাবুদ্দিনের বদলে পল্লবীর ১৩ হাটস, ব্লক-এ, সেকশন-১০ তেজগাঁও নন লোকাল রিলিফ ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃগীরোগী আরমানকে বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করতে হচ্ছে।

২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি সকালে আরমানকে গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানাপুলিশ। এর ৩ দিন পর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। সেই থেকে তিনি কারান্তরীণ। আর সাজাপ্রাপ্ত মাদক কারবারি শাহাবুদ্দিন বিহারি এখনো রাজধানীর মিরপুর ১০, ১১, ১২ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় মাদক ব্যবসা করছেন। ২০০৫ সালে তালিকাভুক্ত এই মাদক ব্যবসায়ী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়।

অসুস্থ আরমানকে মুক্ত করতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আরমানের মা বানু খাতুন ও স্ত্রী বানু বেগম। দরিদ্র এ দুই নারী সংসারের ঘানি টানতে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করছেন। এমতাবস্থায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসছে হুমকি-ধমকি। মাদক কারবারি শাহাবুদ্দিন বিহারি, যার কারণে এহেন দুর্দশা, সেই তিনিই আরমানের বন্দিত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য তার পরিবারকে মোবাইল ফোনে লাগাতার চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। গত ৬ এপ্রিল বিকাল ৫টা ৪৯ মিনিটেও শাহাবুদ্দিন ৮৮০১৬৪৩৪৮০৯২৬ নম্বর থেকে আরমানের মাকে কঠোরভাবে শাসিয়েছেন। এ কলের রেকর্ডও রয়েছে আমাদের সময়ে।

ভুক্তভোগী আরমান ও তার স্বজনদের দাবি, পুলিশ শাহাবুদ্দিন ভেবে আরমানকে গ্রেপ্তার করলেও তিনি নির্দোষ। গত বছরের ২৩ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক এক প্রত্যয়নপত্রেও উল্লেখ করেন, তার জানা মতে মো. আরমান রাষ্ট্র বা সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত নয়। ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আরমানের আইনজীবী মো. মাহবুবুল হকও ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে এক আবেদনে উল্লেখ করেন,  পল্লবী থানার ৬১(৮)০৫) নম্বর মাদক মামলায় প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিন বিহারির পরিবর্তে ভুলক্রমে গ্রেপ্তার নিরপরাধ মো. আরমানকে শনাক্তকরণে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে এসব দাবি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, সঠিক আসামিকেই গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছেন।

মঙ্গলবার বিকালে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি শাহাবুদ্দিন বিহারির। তিনি অকপটে উর্দুতে যা বলেন তার মানে হলো-মাদকের সাজা আমার নামে, পুলিশ কেন আরমানকে ধরেছে তা বলতে পারি না। পুলিশের ভুলেই খামোকা জেল খাটছে ছেলেটা। আমিও চাই আরমান মুক্ত হোক।

আরমানের মা এবং আরও কিছু সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০০৫ সালের ৩০ আগস্ট গভীর রাতে পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ৮ নম্বর লেনের ৭ নম্বর ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে ৪০ পিস ফেনসিডিলসহ শাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশের ৭ নম্বর টিম। তিনি তখন সপরিবারে সেখানে বসবাস করতেন। ডিবির পরিদর্শক আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে চলা ওই অভিযানে শাহাবুদ্দিন ছাড়াও গ্রেপ্তার হয় তার দুই সহযোগী সোহেল মোল্লা ও মামুন ওরফে সাগর। তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনের ১৯(১)/৩(ক) ধারায় মামলা হয় পল্লবী থানায় (মামলা-নম্বর ৬১(৮)০৫)।

ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার ৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ডিবি পুলিশের এসআই মো. সিরাজুল ইসলাম। মামলায় দুবছর জেল খেটে ২০০৭ সালের ৫ মার্চ জামিন পান শাহাবুদ্দিন। ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণ করে স্বাক্ষরযুক্ত জামিননামার মাধ্যমে জামিন নেন; জামিনদার হন তার ভাই মানিক। কিন্তু এর পর তিনি আর আইনের মুখোমুখি না হয়ে ফেরারি হয়ে যান। ওই মামলায় ২০১২ সালের ১ অক্টোবর শাহাবুদ্দিন ও তার দুই সহযোগীর প্রত্যেকের ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানার রায় দেন জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী ঢাকার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারুক আহম্মদ। পলাতক শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে আরও জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পল্লবীর ১৩ হাটস, ব্লক-এ, সেকশন ১০ নম্বর এলাকায় অভিযান চালায় পল্লবী থানার পুলিশ। এ অভিযানে ছিলেন তৎকালে ওই থানার এসআই রাসেলও যিনি বর্তমানে মিরপুর মডেল থানায় কর্মরত। আরমান বাসায় নাশতা সেরে চা পানের জন্য পাশের একটি চায়ের দোকানে যায়। অভিযানকারীরা সেখান থেকে তাকে আটক করে। খবর পেয়ে আরমানের মা ও দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী পুলিশের কাছে যান।

আরমানের মা জানান, তারা তখন আরমানকে আটকের কারণ জানতে চান। পুলিশ কোনো উত্তর দেয়নি। সন্তানকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিনি করজোর মিনতি করলেও ছাড়া হয়নি আরমানকে। বরং মা ও স্ত্রীর সামনেই আরমানকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে বেদম পেটানো হয়। এর পর রক্তাক্ত আরমানকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায় পুলিশ। এর পর থানায় যান আরমানের মা। কিন্তু সেখানে গিয়েও জানতে পারেননি কেন তার সন্তানকে ধরে আনা হয়েছে। শুধু তাই নয়, থানায় সন্তানের কোনো খোঁজই পাননি, আরমান কোথায়; পুলিশও এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি।

এর তিন দিন পর থানার এক পুলিশ সদস্য গোপনে বানু খাতুনকে জানান, আরমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তার অবস্থা গুরুতর। আরমানকে পল্লবী থানার ৬১(৮)০৫) নম্বর এবং ঢাকার জননিরাপত্তা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা একটি মাদক মামলার (মামলা নম্বর-২৫২১/২০০৫) সাজা পরোয়ানার মূলে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পল্লবী থানার এএসআই শহিদুর ২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি আরমানকে আদালতে সোপর্দ করেছেন। এর পর আরমানের মা ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে সেখানকার মেঝেতে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পান আরমানকে। অসুস্থ অবস্থাতেই আরমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (বকশীবাজার) স্থানান্তর করা হয়। এর পর তাকে স্থানান্তর করা হয় কাশিমপুর-২ নম্বর কারাগারে। বর্তমানে তিনি কাশিমপুর কারাগারের ৪ নম্বর বিল্ডিংয়ের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে বন্দি, কয়েদি নম্বর-৩৮৪৮।

অশ্রুসিক্ত মা বানু খাতুন দ্রুত তার নির্দোষ সন্তানের মুক্তি এবং এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। আরমানের স্ত্রী বানু বেগম আমাদের সময়কে জানান, সাজাপ্রাপ্ত আসামি শাহাবুদ্দিন গত ২৭ মার্চ তার ছোট স্ত্রী চান্দাকে নিয়ে কাশিমপুর-২ নম্বর কারাগারে আরমানের সঙ্গে দেখা করেন। সেদিন শাহাবুদ্দিন তার স্বামীকে হুমকি দেন, ‘মামলা নিয়ে যেন বাড়াবাড়ি না করা হয়। বাড়াবাড়ি করলে ডিবি, থানাপুলিশ, উকিল সব কিন্তু ফাঁসবে। তারা ফাঁসলে তোমাকেও ছাড়বে না।’ বানু বেগম বলেন, শাহাবুদ্দিন তখন আমার স্বামীকে আরও বলেন, ‘আমার মামলায় তুমি জেল খাটছ, তাই আমিই তোমাকে বের করব। তোমার মাকে বলো, তোমার উকিলের কাছ থেকে যেন লিখিত নিয়ে আসে যেÑ আমি এই মামলা আর পরিচালনা করব না। মামলা ছেড়ে দিলাম। এর পর তোমাকে ছাড়াতে যা যা করার লাগে সব করব। আর বাড়াবাড়ি করলে পুলিশ সবার মাজায় রশি দিয়ে সব ধরে আনবে। তখন কিন্তু আমারে কিছু কইতে পারবা না। আর তারা ছাড়লেও আমি ছাড়ব না। পানির মতো সব জায়গায় টাকা উড়ামু। তখন মামলা-টামলা সব দেখবা ভাইস্যা গেছে। আমি বাঁচতে যদি দুই-চারটারে বলিও দেওয়া লাগে, সেইটাও দিমু। তাই সাবধানে পা ফেলতে কইও তোমার মা-বউরে।’

গত ৬ এপ্রিল বিকালে মোবাইল ফোনে আরমানের মাকে শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘খালা, মামলাটা আরমানের উকিল জাকিরের কাছ থেকে সাফ-সুতরা কইরা লিখিত নিয়ে আসেন। আমি রোজার ঈদের আগেই আরমানকে জেল থেকে বের করে দেব। আপনাদের এক টাকাও খরচ লাগবে না। আমি সব রেডি করে রাখছি।’

এ সময় কথা প্রসঙ্গে আরমানের ছোট ভাই শমসের মাদক কারবারি শাহাবুদ্দিনকে বলেন, জাকির উকিল বলছে আপনি (শাহাবুদ্দিন) কোর্টে সারেন্ডার হলেই সব সমাধান হয়ে যাবে। এ কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন শাহাবুদ্দিন।

এ বিষয়ে পল্লবী থানার তৎকালীন ওসি দাদন ফকির (বর্তমানে মিরপুর মডেল থানার ওসি) বলেন, সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির স্থলে অন্য আসামিকে কারাগারে পাঠানার কোনো সুযোগ নেই। তাই সঠিক আসামিকেই সেদিন আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল। ঘটনাটি অনেক আগের হলেও আমার জানামতে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কেউ কখনো আসেননি। এর পরও এক আসামির স্থলে অন্য আসামিকে কোনো পুলিশ সদস্য যদি আটক করেন, নিরপরাধ ব্যক্তিকে আদালতে চালান করেন, তা হলে এ বিষয়ে সব দায়দায়িত্ব যে পুলিশ কর্মকর্তা ওই আসামিকে আদালতে সোপর্দ করেছেন, তারই।

অভিন্ন বক্তব্য আরমানকে গ্রেপ্তারে অভিযানকারী দলের এসআই তৎকালে পল্লবী থানায় কর্মরত মো. রাসেলেরও। তবে ২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি আরমানকে আদালতে যে পুলিশ কর্মকর্তা সোপর্দ করেছিলেন, পল্লবী থানার সেই এএসআই শহিদুরের অনেক খোঁজ করলেও তার বিষয়ে কেউ-ই কিছু জানাতে পারেননি।

advertisement