advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এসপি চিঠি পাঠান নুসরাতের পরিবারকে দোষারোপ করে

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা; ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি
১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ১৫:৫০

গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার আগে ফেনীর কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির ঘটনায় আইনবহির্ভূত জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগে সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ জন্য আজ বৃহস্পতিবার পিবিআইয়ের একটি তদন্ত দলের ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা।

ওসি মোয়াজ্জেমের এহেন কর্মকাণ্ডে যখন সর্বত্র চলছে সমালোচনা, তখন তাকে রক্ষায় তৎপর হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে এ সংক্রান্ত যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে উল্লেখ করেছেন, মামলা করতে নুসরাতের পরিবারই নাকি কালক্ষেপণ করেছিল। এ ছাড়া তারা মামলার এজাহার দুই দফায় ঘষামাজা করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে তার চিঠিতে। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ফেনীর এই এসপির প্রকৃত ভূমিকা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি করা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। গতকাল এ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে নুসরাত হত্যা মামলায় রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগের ছাপড়া মসজিদ এলাকা থেকে গতকাল ভোরে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আবদুল কাদিরকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। একই দিন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আবদুর রহিম শরিফ। এতে তিনি হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে সূত্রের খবর। এদিন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার কামরুন নাহার মনির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

অন্যদিকে নুসরাতকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে কিনা তদন্ত করতে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল এখন সোনাগাজীতে। তারা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাস্থল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছেন।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের আইনি সহায়তা দেবেন না মর্মে গতকাল শপথ করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা। এদিনও ফেনীর বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন।

ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু
নুসরাতকে যৌন হয়রানির ঘটনায় আইনবহির্ভূত জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগে সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে আজ বৃহস্পতিবার পিবিআইয়ের একটি তদন্ত দল ঘটনাস্থলে যাবে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নুসরাতকে জিজ্ঞাসাবাদের ওই ভিডিওচিত্রে ওসি মোয়াজ্জেমের যে বক্তব্য, তা আইনবহির্ভূত ও পরোক্ষ যৌন হয়রানি। ওই ভিডিওচিত্রের ভিত্তিতে গত ১৫ এপ্রিল আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আইন বহির্ভূতভাবে নুসরাতকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের অভিযোগ আনা হয় মামলায়। এ বিষয়ে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে ইতোমধ্যেই পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

পিবিআই সূত্র জানায়, মামলাটি আদালতে হওয়ায় ওসিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভর করছে। তদন্ত সূত্র জানায়, পিবিআইর এএসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নারী সম্পর্কিত মামলা হওয়ায় এতে এক নারী কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পিবিআইপ্রধান বনোজ কুমার মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, ‘এ ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনায় যার যতটুকু সম্পৃক্ত বা অপরাধ পাওয়া যাবে তার ততটুকু শাস্তি হবে।’

কাদিরকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার
নুসরাত হত্যা মামলায় রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগের ছাপড়া মসজিদ এলাকা থেকে গতকাল ভোরে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আবদুল কাদিরকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। এর মাধ্যমে মামলাটির এজাহারভুক্ত ৮ আসামির প্রত্যেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বড় ভাই আবদুর রহিমের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন হাফেজ আবদুল কাদির। নুসরাত হত্যার অন্যতম এই পরিকল্পনাকারী সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক ও ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

৫ দিনের রিমান্ডে কামরুন নাহার মনি
নুসরাত হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার কামরুন নাহার মনিকে গতকাল পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শরাফ উদ্দিন আহম্মেদ এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নুসরাতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাজু বলেন, আসামি নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মনির কথা উঠে আসে। সে এ ঘটনায় বোরকা ক্রয় করে হত্যাকারীদের কাছে সরবরাহ করেছিল।

শরিফের স্বীকারোক্তি
ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালতে গতকাল বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রায় ছয় ঘণ্টা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আবদুর রহিম শরিফ। ওই জবানবন্দির বরাত দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগ পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল জানান, নুসরাত হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন শরিফ। তবে তদন্তের স্বার্থে আর কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। প্রসঙ্গত মামলার আসামি নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে নুসরাতকে হত্যার আরেক পরিকল্পনাকারী শরিফের নাম।

প্রসঙ্গত নুসরাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন আর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনজন। তারা হলেন শরিফ, নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। বাকি আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন সিরাজউদ্দৌলা (৭ দিন), আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৫ দিন), জাবেদ হোসেন (৭ দিন), নূর হোসেন, কেফায়াতউল্লাহ, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, আবছারউদ্দিন, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেন (৫ দিন রিমান্ড)। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক হয়েছে সহপাঠী মো. শামীম ও জান্নাতুল আফরোজ মনি।

পুলিশের অবহেলার অভিযোগ তদন্তে ঘটনাস্থলে প্রতিনিধি দল
ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দপ্তরের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল গতকাল দুপুরে ফেনী পৌঁছেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ডিআইজি (মিডিয়া) শেখ মো. রুহুল আমীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্য তদন্ত দলে রয়েছেন। তদন্ত দল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনাস্থল, রাফিদের বাড়ি পরিদর্শন করেছে।

হত্যায় জড়িতদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার শপথ
নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার জন্য শপথ করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে মামলায় চার্জশিটভুক্ত করারও দাবি তোলেন তারা। গতকাল বুধবার দুপুরে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সামনের চত্বরে আইনজীবী রাইটার্স ফোরামের পক্ষে আয়োজিত মানববন্ধনে এ শপথ করেন তারা।

আইনজীবীরা বলেন, আমরা নারী নির্যাতন আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাচ্ছি আমার বোন, আমার মেয়ে নাতনিসহ পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার জন্য। কারণ নারী নির্যাতন ইভটিজিং, যৌন হয়রানি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে নারীরা কোথাও নিরাপদ নয়। এমনকি নারীরা প্রথমে নিজের ঘর থেকেই নিগৃহীত হয়ে নির্যাতনের শিকার হয়। নুসরাত হত্যাকা-ের ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার সঙ্গে সঙ্গে ওই থানার ওসি অভিযোগ না নিয়ে নুসরাতকে হয়রানি করেছিল তাকে মামলায় আসামি হিসেবে চার্জশিটভুক্ত করার দাবি তোলেন আইনজীবীরা।

শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন
নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে বুধবার শহরের শান্তি কোম্পানি রোডের মাথায় ও দাউদপুল এলাকায় মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ফেনী সিটি গার্লস হাইস্কুল আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতকরণে আশ্বাস দেন ফেনী-২ আসনের সাংসদ নিজামউদ্দিন হাজারী। মানববন্ধনে ফেনী সিটি গার্লস হাইস্কুল, শান্তি নিকেতন ইনস্টিটিউট, সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল ফেনীর প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।

প্রসঙ্গত গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে কৌশলে নুসরাতকে মাদ্রাসা ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় তাকে শুইয়ে তার হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। স্থানীয় হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। টানা ৫ দিন বেঁচে থাকার লড়াই করে মারা যান লাইফ সাপোর্টে থাকা নুসরাত। এর আগে ২৭ এপ্রিল ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।