advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

তিতাসে দুর্নীতি ২২ পন্থায়

লুৎফর রহমান কাকন
১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:১৪

দেশের বৃহত্তম গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ‘তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড’-এ দুর্নীতির ২২টি পন্থা চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তিতাসের সেবা পেতে এসব চিহ্নিত পন্থায় গ্রাহকদের ঘুষ দিতে হয়। তিতাস গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রাহকদের জিম্মি করে টাকা আদায় করেন। দুর্নীতির পন্থাগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছে দুদক। দুর্নীতি বন্ধে ১২ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনের গঠিত টিম তিতাসে অনুসন্ধান করে। দুর্নীতির পথ ও সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন দুদক গতকাল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর কাছে জমা দেওয়া হয়।

advertisement

দুদকের কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রতিমন্ত্রীর হাতে এ প্রতিবেদন তুলে দেয়। প্রতিবেদন তুলে দেওয়ার সময় ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার জরুরি। দুদকের টিম তিতাসের প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের পক্ষে কিছু সুপারিশ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের কাছে সেগুলো তুলে দেওয়া হলো বাস্তবায়নের জন্য। মন্ত্রণালয় সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলে আশা করছি দুর্নীতি কমবে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে আইনের শাসন সুদৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান খাত। এ খাত বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখছে। এ খাতে কোনো অনিয়ম করতে দেওয়া হবে না।

প্রতিবেদনে তিতাসে দুর্নীতির ২২টি উৎস এবং এসব উৎসের দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২টি সুপারিশ করা হয়। প্রতিমন্ত্রী এ সময় দুদককে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, তাদের এ উদ্যোগ জ্বালানি খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর অবদান রাখবে। সম্মিলিত উদ্যোগেই উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হবে। প্রতিবেদনে দুর্নীতির ২২টি উৎস চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো-

এক. অবৈধ সংযোগ; দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি সংঘটিত হয় অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। তিতাস ৬ শতাংশ যে সিস্টেমলস দেখিয়ে থাকে তা অবৈধ সংযোগের কারণে। দুদক বলছে ঢাকার আশপাশের এলাকা বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী, সোনারগাঁওয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সংযোগ রয়েছে।

দুই. তিতাসের কর্মকর্তারা নতুন সংযোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারণ অবৈধ সংযোগে বেশি পরিমাণ দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। ফলে বৈধ সংযোগ নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়। প্রতিটি অবৈধ সংযোগে গড়ে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

তিন. অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীরা বৈধতা পেতে চেষ্টা করলেও তিতাস তা করে না। কারণ এর সঙ্গে দুর্নীতি সম্পৃক্ত।

চার. অবৈধ লাইন ভ্রাম্যমাণ আদালত বিচ্ছিন্ন করলেও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাতের আঁধারে সংযোগ দিয়ে আসেন।

পাঁচ. অবৈধ সংযোগ বন্ধে সত্যিকার অর্থে তিতাসের শক্তিশালী কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেই।

ছয়. অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও প্রভাবশালীদের প্রভাবের কারণে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

সাত. তিতাসে অনেক ক্ষেত্রে গ্যাস সংযোগের নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করছে না। ফলে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আট. একই ব্যক্তি একাধিক দায়িত্ব পালন করায় কোনো দায়িত্ব ঠিকমতো পালিত হয় না।

নয়. ঘুষের বিনিময়ে এক শ্রেণির গ্রাহককে অন্য শ্রেণির গ্রাহক দেখিয়ে কম বিল আদায় করে দুর্নীতি হয়।

দশ. মিটার টেম্পারিং তিতাসে দুর্নীতির অন্যতম মাধ্যম।

এগার. তিতাসের অধিকাংশ এলাকায় কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটর ব্যবহার করছেন শিল্প মালিকরা।

বার. বৈধ সংযোগ দিতে হয়রানির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়।

তের. মিটার বাইপাস করে গ্যাস সংযোগ দিয়ে দুর্নীতি করা হয়।

চৌদ্দ. ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের চাপ কম দিয়ে দুর্নীতি করা হয়।

পনের. ইভিসি (ইলেকট্রিক ভলিউম কারেক্টর) বসালে গ্রাহকরা সঠিক পরিমাণ গ্যাস পেয়ে থাকেন, ফলে গ্রাহকদের ইভিসি দেওয়া হয় না।

ষোলো. অবৈধ সুবিধা নিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে একই এলাকায় পোস্টিং দিয়ে দুর্নীতি করা হয়।

সতের. এস্টিমেশন অপেক্ষা গ্যাস কম সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানোর মাধ্যমে দুর্নীতি করা হয়।

আঠার. গ্রাহকদের অবৈধ চুলা ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিল আদায় করে আত্মসাৎ করেন।

উনিশ. কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রফিট বোনাস পেতে বেশি গ্যাস বিক্রি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন।

বিশ. ভুয়া গ্রাহক সংকেত দিয়ে গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ দিয়ে দুর্নীতি করা হয়।

একুশ. গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা বিল যথাসময়ে তিতাসের মাদার অ্যাকাউন্টে না পাঠিয়ে ব্যাংকে রেখে সুদ খাওয়া হয়।

বাইশ. শিল্প মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বকেয়া বিল আদায়ে কোনো তৎপরতা দেখায় না তিতাস। উল্লিখিত সমস্যা বা দুর্নীতি ছাড়াও দরপত্রে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ; মালামাল ক্রয়ে দুর্নীতি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্তৃক সার্বক্ষণিক কোম্পানির গাড়ি ব্যবহার, জরিমানা, সংশোধিত বিল ও জামানত আদায়ে গ্রাস বিপণন নীতিমালা অনুসরণ না করা ইত্যাদি।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ সুপারিশ করেছে দুদকে অনুসন্ধান কমিটি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-প্রি-পেইড মিটার লাগানো; আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা; নিয়মিত ফলোআপ; দীর্ঘদিন শিল্প এলাকায় এবং একই বিভাগে পোস্টিং না রাখা; জনবলের দক্ষতা বাড়ানো; অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি; অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ; অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি; সিস্টেম লসের সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ; নিজস্ব সার্ভিলেন্স এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা; নিজস্ব প্রসিকিউশন বিভাগ এবং বকেয়া পাওনা আদায়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।