advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নানা হিসাব, নানা প্যাঁচ

ড. জোবাইদা নাসরীন
১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০১:২৬

গত ১১ এপ্রিল থেকে ভারতের ১৮টি রাজ্যের ৯১টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচন। ইতোমধ্যে দেশটির প্রথম দফা শেষ হয়েছে। ১৮ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। এটিকে বলা হচ্ছে, বিশ্বের সর্বকালের সর্ববৃহৎ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ৯০ কোটি ভোটার ভোট দেবেন। ভোট হচ্ছে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও।

একই সঙ্গে চার রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন হচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, অরুণাচল প্রদেশসহ একাধিক রাজ্যে প্রথম দফাতেই সব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য রয়েছে ১০ লাখ ভোটকেন্দ্র। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য রয়েছে এক কোটি নির্বাচনী কর্মকর্তা। মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩ এবং অংশগ্রহণ করছে ৪৬৪টি রাজনৈতিক দল।

সরকার গঠন করতে কোনো দল বা জোটের কমপক্ষে ২৭২টি আসন প্রয়োজন হবে। ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষের নতুন সংসদ গঠনের উদ্দেশ্যে মোট ৭ ধাপের ভোটগ্রহণ করা হবে এবং তা চলবে ১৯ মে পর্যন্ত। ৭ দফায় সারাদেশে ভোটগ্রহণের তারিখগুলো হলো ১১ এপ্রিল, ১৮ এপ্রিল, ২৩ এপ্রিল, ২৯ এপ্রিল, ৬ মে, ১২ মে ও ১৯ মে। শেষ দফার ভোট শেষ হলে এর ৪ দিনের মাথায় একসঙ্গে সব পর্বের ভোট গণনা করা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই নির্বাচন ভারতে কয়েক দশকের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনে কে জিতবে এবং কোন দল সরকার গঠন করবে- এ বিষয় নিয়ে কয়েক মাস ধরেই নানা জরিপ হচ্ছে। সব দেশেই নির্বাচনের আগে জনমত জরিপ হয়। এবারকার নির্বাচনের প্রাক-মূল্যায়নে মোদিই এগিয়ে আছেন। তবে ভারতের ২০০৪ সালের নির্বাচনে মতামত জরিপ ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতের বিমান হামলা, নোট বাতিল বা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কিংবা সংঘাতের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলবে এ নির্বাচনে। এসবের নিরীক্ষে এ কথা বলা যায়, বিজেপির ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো ব্যাপক বিজয়ের বিষয়টি এবার এত সহজ নাও হতে পারে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেস ও বিজেপি যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে, তা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা গেছে, এতে জনপ্রিয় বিষয়গুলো নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা আছে।

কংগ্রেসের ইশতেহারের প্রধান বিষয় হচ্ছে ভারতের ২০ শতাংশ চরম দরিদ্রের জন্য ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা তৈরি করা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে আছে অর্থকে গ্রামীণ খাত ও এলাকামুখী করা এবং স্থায়ী ভোগান্তির শিকার ও ক্ষুব্ধ কৃষকের জন্য ভালো কিছু করা। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়বস্তু এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ তুলে দেওয়ার সম্ভাব্যতার ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশের চোখ কেন এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি? এর কারণ রয়েছে অনেক। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গেই বাংলাদেশের সবেচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। তাই ভারতে কে ক্ষমতায় এলো, সেটির ওপর নির্ভর করবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশে কীভাবে সম্পর্কিত হবে। ভারতের স্থলসীমান্ত প্রতিবেশী বাংলাদেশ, বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম- ভারতের এ ৫টি রাজ্য বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী। এসব রাজ্যের ৩০টি লোকসভা আসন সরাসরি বাংলাদেশ ঘেঁষা।

তাই ভারতের নির্বাচনে বাংলাদেশ একটি বড় বিবেচনায় অন্তত এ ৫টি রাজ্যতে বটেইÑ এর মধ্যে ভাষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক গুরুত্বের বিবেচনায় সবেচেয়ে কাছের এবং গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমবঙ্গ। এখানে রয়েছে লোকসভার ৪২টি আসন। এ রাজ্যে এবারের সমীকরণটি নতুন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূলকে ঠেকানোর লক্ষ্যে কংগ্রেস নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে এক সময় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বাম ফ্রন্ট। ওই হিসেবে এবার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে রয়েছে বাম ফ্রন্টের একটি নির্বাচনী জোট। ওই জোট নিয়েই বাম ফ্রন্ট ও কংগ্রেস এগিয়েছে এবং বারবার ঘোষণা দিয়েছে, বিজেপি ও তৃণমূল রুখতে তারা একসঙ্গে লড়ছে পশ্চিমবঙ্গে। ওই হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে বাম ফ্রন্ট লড়ছে ২৫টিতে আর কংগ্রেস ১৭টিতে। তবে বাম ফ্রন্টের ২৫টি আসন ভাগ হয়েছে ফ্রন্টের অন্য শরিকদের মধ্যে। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস আগেই ঘোষণা দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনেই জিততে চলেছেন তারা।

অন্যদিকে বিজেপি অতটা আশা করছে না। তারা বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ঘিরে তাদের লক্ষ্য ২৩টি আসন। তাদের আশা-আকাক্সক্ষা সীমিত হওয়ার কারণ হলো, ২০১৪ সালের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র দুটি আসন। বাংলাদেশের নির্বাচনে একটা সময় পর্যন্ত যেমন ‘ভারত’ ইস্যুটিকে ব্যবহার করা হতো, তেমনি ওই ৫টি রাজ্যের নির্বাচনেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনে হয়তো সরাসরি কোনো প্রার্থী বাংলাদেশের নাম নিচ্ছেন না। অথচ কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিজেপির কোনো প্রার্থী অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বেশ সরব ছিলেন। এ বিষয়ে বেশকিছুটা এগোনো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো ২০১৪ সালে আসামের এক জনসভায় বলেছিলেন, লোটা-কম্বল নিয়ে সব বাংলাদেশিকে আসাম থেকে ফেরত পাঠানো হবে। আসামের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি নিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি চলেছে বেশ।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, তারা কিছুতেই ওই রাজ্যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি তৈরি করতে দেবেন না এবং তা ভোটে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লষকরা। শুধু পশ্চিমবঙ্গ কিংবা বাংলাদেশ ঘেঁষা রাজ্যগুলোই নয়, এই নির্বাচন কেন্দ্র করে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের বিরুদ্ধে আন্দোলন হাঁকাচ্ছে শিবসেনা, বিজেপি এবং আরও কট্টরপন্থি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। মূলত এনআরসি থেকে যাদের নাম বাদ পড়ছে, তাদেরই তকমা দেওয়া হচ্ছে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বলে। কারণ তারা মুসলিম এবং বাংলায় কথা বলেন। তবে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দু ও বৌদ্ধ শরণার্থীদের নাগিরকত্ব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার কথা বলেছে। এই বিষয়ে তারা একটি সংশোধনী বিলও আনেন। অথচ এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও পরিষ্কার করেছেন, ভারতের বুক থেকে প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে তারা বের করে ছাড়বেন। বিজেপির এসব বক্তব্যে কোথাও বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন, কাকে ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে। কারণ আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকায় অনুপ্রবেশ ইস্যু অনেকটাই রাজনৈতিক।

এ ক্ষেত্রে বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিরোধী দল কংগ্রেস। তারা ওই বিতর্কে না জড়িয়ে বরং এ অঞ্চলের জন্য সংবিধানে রক্ষিত বিশেষ মর্যাদা ফিরিয়ে আনার পক্ষে। তবে হিন্দু ও বৌদ্ধ শরণার্থীদের নাগরিকত্বের সংশোধনী বিল প্রত্যাহারের কথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কংগ্রেস নেতা এবং গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক সদস্য রাহুল বরাকে গিয়ে সেটি প্রত্যাহারের কথা বলেননি। কেননা রাহুলকেও মনে রাখতে হয়েছে, সেখানে বেশ সংখ্যক হিন্দু ভোটার রয়েছেন। গত ৫ বছরে যে মোদি সরকার নানা চ্যালঞ্জ মোকাবিলা করেনি, তা নয়। গদি নড়ার ঝড়ও উঠেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু পার পেয়েছে বিরোধী শক্তির অগোছালো আন্দোলনে। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বড় দুটি দল কংগ্রস এবং বিজেপির নির্বাচনী ইশেতহারে জননিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। জাতীয় নিরাপত্তা বলতে শুধু প্রতিরক্ষাই নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই গুরুত্বপূর্ণ- এ বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী বিবেচনায় আসা উচিত। আরও আছে। কর্মজীবী নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাবলিক পরিসরে নিরাপত্তা। এটি কোনো দলের নির্বাচনের ইশতিহারে আসেনি। তাই ভারতের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ অনেকটিই, শুধু কংগ্রেস বনাম বিজেপি নয়।

এত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য থেকে ৯০ কোটি ভোটার কোন দল বা জোটকে ভোট দিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সহায়তা করবেন, আপাতভাবে তা মনে হচ্ছে না। তবে সব মনে হওয়া ও ধারণার অবসান ঘটবে আগামী ২৩ মে। বাংলাদেশকেও নজর রাখতে হবে ওইদিন পর্যন্ত। প্রতিবেশী প্রভাবশালী রাষ্ট্র বলে কথা...! য় ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়