advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গ্রন্থাগারই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে

আসিফ
১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ১০:০৯

আমাদের প্রাণী জগতের ইতিহাসে একটা সময় এসেছিল। টিকে থাকার ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত বংশগতিবিষয়ক জ্ঞানকোষও (জেনেটিক এনসাইক্লোপেডিয়া) কাজ করছিল না। কেননা পরিবেশ-পরিস্থিতির সহসা পরিবর্তন জিনের পক্ষে সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে কোনো প্রাণীকে দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেয় না জিনের তথ্যাবলি।

মূলত এই অসুবিধাগুলোকে অতিক্রমের জন্য মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটেছে। চারদিকের পরিবেশ-প্রকৃতির খুব দ্রুত পরিবর্তনকে জিনের চেয়ে দ্রুত সামাল দিতেই মস্তিষ্কের উদ্ভব ঘটে। প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে। মস্তিষ্ক বিকাশের কারণে আমরা অনুধাবন করতে পারি, বুদ্ধিমত্তা মানে, চারপাশ থেকে সরাসরি শুধু তথ্য ধারণ করা নয়, একই সঙ্গে বিচারবুদ্ধিও।

advertisement

এর মাধ্যমে তথ্যগুলোকে সমন্বয় সাধন ও ব্যবহার করা যায়, ভবিষ্যতের কোনো বিপদ সম্পর্কে আগে আভাস পাওয়া সম্ভব হয়। তা জিনের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো প্রয়োজনের তাগিদে মস্তিষ্কেরও উদ্ভব ঘটে। লাখ লাখ বছর ধরে জটিলতা ও তথ্যধারণের মধ্য দিয়ে এটি বিকাশ লাভ করে। জিনের চেয়ে বর্তমানে আমাদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি জানে। কেননা মস্তিষ্ক লাইব্রেরি ১০ হাজারগুণ বড়। এর পর আমরা প্রয়োজনবোধ করলাম মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কিছু জানতে। ওই সময়টা এসেছিল ১০ হাজার বছর আগে। ফলে শরীরের বাইরে বিশাল পরিমাণে তথ্য মজুদ রাখার পদ্ধতি আমরা শিখেছিলাম। মস্তিষ্কের বাইরে তথ্য সংরক্ষণের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। স্মরণ, তুলনা, সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণ ও বিমূর্ত তৈরি করার মতো ক্ষমতার কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেছিল। ফলে এ গ্রহে আমরাই একমাত্র প্রাণীÑ যারা এমন এক স্মৃতি সংরক্ষণাগার গড়ে তুলতে সামর্থ্য হয়েছিলাম।

এ জন্য আমাদের জিনের দরকার নেই, এমনকি মস্তিষ্কেরও। স্মৃতির এ আধারকে বলা হয় গ্রন্থাগার। এটাই এক্সট্রসোমেটিক নলেজ। এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার। মূলত মিসরের গ্রিক রাজাদের হাতে এই গ্রন্থগার গড়ে তুলেছিলেন। আলেকজান্দারের উত্তরাধিকার হিসেবে তারা শিক্ষার ব্যাপারে প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলেন। শত শত বছর গবেষণাকর্মকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন এবং ওই যুগের সবচেয়ে বড় মনিষীদের কাজকর্মের জন্য গ্রন্থাগারের পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। এই গ্রন্থাগারের মূল উপাদান হলো গ্রন্থ। গ্রন্থ তৈরি হয় গাছপালা থেকে। এটা হলো সমতল ও নমনীয় অংশগুলোর (এখনো যাকে ‘পাতা’ বলা হয়) সমবেশ, যাতে গাঢ় রঞ্জক পদার্থ দিয়ে আঁকাবাঁকা প্যাঁচানো হস্তাক্ষরের লেখা ছাপানো হয়।

এতে একবার ক্ষণিকের দৃষ্টি দিলে আমরা শুনতে পাব অন্য ব্যক্তির কণ্ঠস্বরÑ হয়তো হাজার হাজার বছর আগে মৃতদের কারো। সহস্র বছর দূর থেকে লেখক আপনার মাথার ভেতরে স্পষ্ট ও নিশ্চুপভাবে আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলছে। লিখন পদ্ধতি সম্ভবত মানবজাতির মহত্তম উদ্ভাবন, যা জনমানুষকে, দূরবর্তী সময়ের নাগরিকদের একত্রে বাঁধে, যারা কখনোই পরস্পরকে চেনে না। গ্রন্থ সময়ের শৃঙ্খলা ভাঙে, মানুষের জাদুকরী সামর্থ্যকে প্রমাণ করে। প্রাচীনতম লেখকদের কেউ কেউ কাদামাটির ওপর লিখেছিলেন। পশ্চিমা বর্ণমালার সুদূর পূর্বসূরি কিলকাকার (ঈঁহবরভড়ৎস পারস্য, সিরিয়া প্রভৃতি দেশের প্রাচীন শিলালিপিতে দৃষ্ট কিলকাকার বর্ণমালা) লিখন উদ্ভাবিত হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে নিকট-প্রাচ্যে।

নথিপত্র সংরক্ষণ করাই ছিল এর উদ্দেশ্যÑ শস্য কেনা, জমি বিক্রি, রাজার বিজয়, যাজকদের মূর্তি, নক্ষত্রগুলোর অবস্থান, দেবতাদের কাছে প্রার্থনা। হাজারো বছর ধরে লিখনকে কাদামাটি ও পাথরের মধ্যে খোদাই করা হতো, আঁচড় কাটা হতো মোম বা গাছের ছাল কিংবা চামড়ায়, বাঁশ অথবা পেপিরাস বা সিল্কে রঙ মাখিয়ে আঁকা হতো। কিন্তু স্মৃত্মিস্তম্ভগুলোয় অন্তঃলিখনগুলো ছাড়া সর্বদা একবারে একটি কপি, সর্বদা ক্ষুদ্রসংখ্যক পাঠকগোষ্ঠীর জন্য সীমিত থাকত। তারপর দ্বিতীয় ও ষষ্ট শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে কাগজ, কালি ও খোদাইকৃত কাঠের ব্লকসম্পন্ন মুদ্রণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছিল চীনে। ফলে কোনো রচনার অনেক কপি প্রস্তুত ও বিতরণ করা গেল। এ ধারণাটি অনুধাবনে পিছিয়ে থাকা সুদূর ইউরোপের এক হাজার বছর সময় লেগেছিল।

এর পর হঠাৎ পৃথিবীব্যাপী গ্রন্থগুলো ছাপা হতে লাগল। ঠিক স্থানান্তর টাইপ উদ্ভাবনের আগে প্রায় ১৪৫০ সালের দিকে সমগ্র ইউরোপে ৩০-৪০ হাজারের চেয়ে বেশি ছিল নাÑ সবই হস্তলিখিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে চীনে অথবা আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারে যতগুলো ছিল, এর মাত্র এক দশমাংশ। অথচ এর মাত্র ৫০ বছর পরই প্রায় এক কোটি ছাপানো বই ছড়িয়ে পড়ল ১৫০০ সালের দিকে। পড়তে পারা সবার কাছে জ্ঞান অর্জন অনেক সহজসাধ্য হয়ে গেল, যেন সর্বত্র জাদুর ছোঁয়া লাগল। অতিসম্প্রতি গ্রন্থগুলো, বিশেষত সুলভ সংস্করণ বিপুল সংখ্যা ও স্বল্পব্যয়ে ছাপা হয়। মধ্যমমানের খাদ্যমূল্যের বিনিময়ে আপনি ভাবতে পারেন রোমান সম্রাজ্যের অবক্ষয় ও পতন, প্রজাতির উৎপত্তি, স্বপ্নের ব্যাখ্যা। বস্তুর প্রকৃতি নিয়ে আপনি এলিমেন্টসের জ্যামিতিকে আত্মস্থ করতে পারেন।

মানব প্রজাতির কী বিশাল অর্জন! তারপরও আবার জ্ঞান অর্জন ডিগ্রির হাতে বন্দি হলো-ভাবতে অবাক লাগে। গ্রন্থ হলো বীজের মতো। শত শত বছর ধরে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকতে পারে। এর পর সবচেয়ে সম্ভাবনাহীন ক্ষেত্রকেও ফুল ফুটিয়ে বিকশিত করতে পারে। বিশ্বের বড় বড় গ্রন্থগার ধারণ করে লাখে খ-, শব্দের বিবেচনায় ১০১৪ বিট তথ্যের সমতুল্য এবং সম্ভবত ছবির বিবেচনায় ১০১৫ বিটের সমতুল্য। এগুলো আমাদের জিনের তথ্য ধারণক্ষমতার চেয়ে দশ হাজারগুণ বেশি, এমনকি আমাদের মস্তিষ্কের চেয়েও দশগুণ বেশি। যদি সপ্তাহে একটা বইও শেষ করি, তা হলে আমার জীবনে শুধু স্বল্পকয়েক হাজার বই আমি পড়ব, যা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগারগুলোর ধারণকৃত এক শতাংশেরও প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।

কৌশলটি হলো জানা বা বোঝা কোন বইটি পড়তে হবে। গ্রন্থগুলোর জন্ম মুহূর্ত থেকেই এর তথ্য স্থিরকৃত নয়, বরং ঘটনাগুলোর প্রভাবে নিয়ত পরিবর্তনশীল। আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পর ২ হাজর ৩০০ বছরের পথ অতিক্রম করে এই বর্তমানে আমরা। যদি কোনো বই না থাকত, কোনো লিখিত নথিপত্র না থাকত, তা হলে চিন্তা করি কত বিস্ময়কর ও অপরিমেয় একটা সময় হতো ২ হাজর ৩০০ বছর। চারটি প্রজন্ম নিয়ে প্রতি শতাব্দী হলে ২৩০০ শতাব্দী ধারণ করে প্রায় ১০০ প্রজন্মের মানুষকে। যদি তথ্যগুলো শুধু মুখের কথায় প্রবাহিত হতো-তা হলে কত অল্প আমাদের অতীত সম্পর্কে জানা সম্ভব হতো, কত ধীর হতো আমাদের অগ্রগতি!

প্রাচীন অনুসন্ধানগুলো সম্বন্ধে আমাদের দৈবাত জানার ওপর প্রতিটি জিনিস নির্ভর করত এবং একই সঙ্গে সেগুলোর সত্যতার মাত্রাও। অতীতের তথ্যাবলি হয়তো শ্রদ্ধাযোগ্য বলেই বিবেচিত হতো। কিন্তু পর্যায়ক্রমিকভাবে পুনঃকথন বা বর্ণনায় এটা হয়ে উঠত বিশৃঙ্খল ও বিভ্রান্তিকর এবং শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যেত। বর্তমানে জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন আমাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে অশনিসংকেত দিয়ে যাচ্ছে। আমরা অবশ্য খুব একটা কেয়ার করছি বলে মনে হয় না। অন্তত পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রম থেকে তা মনে হয় না। ষষ্ট গণবিলুপ্তির দোরগোড়ায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি। অথচ বিবর্তনীয় জীববিদ্যা বলে, আমাদের এই জায়গায় আসার জন্য সম্ভাবনাময় জটিল এবং কখনো কুটিল পথ ধরে হাঁটতে হয়েছে। অবশেষে আমরা একটি প্রাযুক্তিক সভ্যতা নির্মাণে সামর্থ্য হয়েছি। কিন্তু আমরা সেগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করিনিÑ না বৈশি^কভাবে, না রাষ্ট্রিকভাবে। বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে সঠিক অর্থে নিতে পারিনি।

নিতে পারলে পৃথিবীর নদীগুলো বিষাক্ত করে তুলতাম না, বাস্তুসংস্থাননির্ভর পরিবেশ গড়ে তুলতে পারতাম। পূর্বপুরুষদের জ্ঞান অর্জন ও প্রজ্ঞা আরোহণে বইগুলো আমাদের সময় ভ্রমণে অনুমোদন দেয়। গ্রন্থাগার প্রকৃতি থেকে কষ্টসহকারে বের করা মহাপ্রতিভাদের অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানের সঙ্গে আমাদের সংযুক্ত করে। সংযুক্ত করে পুরো গ্রহ থেকে এবং আমাদের ইতিহাসের সব অংশ থেকে বের করে আনা সর্বোত্তম শিক্ষকদের সঙ্গেÑ যারা কোনো এক সময় বেঁচে ছিলেন, যারা ক্লান্তিহীনভাবে আমাদের দিকনির্দেশনা দেন এবং মানব প্রজাতির সামগ্রিক জ্ঞানে নিজেদের অবদান যোগ করতে আমাদের অনুপ্রাণিত করেন।

স্বেচ্ছাসেবামূলক ভূমিকার ওপর পাবলিক গ্রন্থাগারগুলো নির্ভর করে। আমি মনে করি, আমাদের সভ্যতার সমৃদ্ধি, আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তিকে অবলম্বন করে আমাদের সচেতনতার গভীরতা এবং ভবিষ্যতের জন্য আমাদের উদ্বেগ, সব কিছু যাচাই হতে পারে কতটা আমাদের গ্রন্থাগারগুলোকে গুরুত্ব ও সহযোগিতা দিই, এর ওপর। বর্তমানে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইতিহাসে বৃহত্তম বিশ্বকোষ সম্পাদকদের মিলনক্ষেত্রের একটি হচ্ছে উইকিপিডিয়াÑ যেটি নবনির্মিত আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের ছাদের নিচে স্থান নিয়েছে। গ্রন্থাগারের ৩২ মিটার উঁচু ছাদটি চিত্তাকর্ষক বর্গাকৃতির বা কাফারড স্থাপত্য। এর পৃষ্ঠে ৪ হাজার ২০০ বিভিন্ন অক্ষর উৎকীর্ণ করা আছে।

রোমান, কপ্ট, ক্রিশ্চিয়ানদের অতীতে অজ্ঞতা ও ধর্মান্ধতায় ধ্বংস হয়েছিল আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার। কিন্তু তা আমাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। আমাদের সৌভাগ্য, এখনো গ্রন্থাগারটি গ্রন্থরাজি সংগ্রহে নিজেকে প্রসারিত করে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের নিয়ে চলেছে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথে। য় আসিফ : বিজ্ঞান বক্তা