advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

যথাযথ বাংলা ভাষাহীন বাঙালি উৎসব

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক
১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ১০:১১

‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ প্রতিপাদ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ সারাদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউনেস্কো।

রমনার ঐতিহাসিক বটমূলসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে দেশীয় ঐতিহ্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বাঙালির সংস্কৃতি ও শিকড়কে। কিন্তু যে বাংলা সন নিয়ে এত আড়ম্বর, ওই বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। জ্ঞাত-অজ্ঞাতে উপেক্ষিত হয়েছে যথাযথ বাংলা ভাষার প্রয়োগ। ভাষারও যে ভাষা থাকে, দুঃখ-কষ্ট-যাতনায় আড়ষ্ট থাকেন ভাষাপ্রেমী ও শুদ্ধ প্রয়োগকারী, এ কথা যেন কেউ ভাবেননি। নববর্ষের ব্যানার, ফেস্টুন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যথাযথ বাংলা শব্দ-বাক্য বাদ দিয়ে বাংলায় লেখা হয়েছে বহু ইংরেজি শব্দ।

একটি জাতি যে ধারায় তার নিজস্ব ভাষা নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও চর্চা করবে, ওই ধারায় সে জাতির ভাষার প্রকাশ ঘটবে। পৃথিবীর সব সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে ভাষাচর্চা, সংরক্ষণ বা উৎকর্ষের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ থাকে। বর্তমানে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত সম্প্রসারণশীল ভাষা। বাংলা ভাষার ইতিহাস বা ব্যাকরণশৈলীও অত্যন্ত উঁচুমানের। রয়েছে সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে বাংলা ভাষার রক্ষণাবেক্ষণ বা উৎকর্ষের প্রচেষ্টা তেমন বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারিতে কিছু নিবন্ধ-প্রবন্ধ চোখে পড়লেও মার্চ আসতে না আসতেই তা হারিয়ে যায়।

ফলে বাংলাকে যারা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে চান, তাদের বেশি বিপাকে পড়তে হয়। শিক্ষিত, সচেতন শ্রেণির ফেসবুক, টুইটারে ব্যবহৃত ভাষাও সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয় না। এক ধরনের তাচ্ছিল্য পরিলক্ষিত হয়। তা ভাষাপ্রেমীর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। প্রতিনিয়ত ভুল শব্দ-বাক্য দেখতে দেখতে এক সময় সঠিকটাও যেন হারিয়ে যায়। স্বীকার্য যে, বিশ্বায়ন ও উন্নয়নের ফলে সব বাংলাভাষীকেই নতুন বিষয় ও শব্দের সম্মুখীন হতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় ভাব প্রকাশের জন্য অনেক সময় নতুন শব্দ-বাক্য তৈরি হয়। কিন্তু এগুলোর লিখিত প্রয়োগেও ভাষার ব্যাকরণ বা নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা করা হয় না। অক্ষুণ্ন থাকে না শব্দশৈলীর ন্যূনতম বিধিও।

প্রচারমাধ্যম বা নেটওয়ার্কের আওতায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বাংরেজি-বাংলিশ ব্যবহার চোখে পড়ে খুব বেশি। দ্রুত ভাব প্রকাশে সমসাময়িক প্রজন্ম (লিখিত ও মৌখিক) এমন সব উদ্ভট শব্দ তৈরি করছেÑ যা রীতিমতো ভাষার জন্য আতঙ্ক হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক উদীয়মান লেখকদের মধ্যেও এ জাতীয় প্রবণতা লক্ষণীয়। মনে হয়, বাংলায় যথাশব্দ-অনুশব্দ-প্রতিশব্দ না জেনেই তারা ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত (অর্ধেক ইংরেজি, অর্ধেক বাংলা) শব্দ বসিয়ে ফস ফস করে লিখে যাচ্ছেন। তাদের ঘ্যানর ঘ্যানর পেঁচালি, ভ্যান ভ্যান বা বকর বকর কথায় ধপাস করে পড়ে যাচ্ছে প্রাণপ্রিয় বাংলার বর্ণ-শব্দ। এভাবে যত্রযত্র ব্যবহৃত ‘বাংলিশ’, ‘ফাউদিস’, ‘শত্রুজ’জাতীয় শব্দগুলোর অর্থ বোঝার জন্য কোনো অভিধান নেই। ব্যবহারকারী ছাড়া প্রথমবার শোনা অনেক শ্রোতার কাছে এর অর্থ হয়ে উঠছে দুর্বোধ্য।

ভাষাবিজ্ঞানীদের ‘চলমান প্রক্রিয়া’ বা ‘ব্যবহার সংখ্যাতিরিক্ত’ যুক্তির বদৌলতে দিন দিন অধিক কঠিন হয়ে পড়ছে সেগুলোর ভুল কিংবা সঠিক মূল্যায়ন করাও। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ ব্যবহারের যে নিয়ম-নীতি আছে, তা ‘শ’, ‘স’-এর ব্যবহার বা উচ্চারণবিষয়ক আধিক্যতায় পরিপুষ্ট। এতে প্রত্যয় ব্যবহারের নিয়মবিধিও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ব্যাকরণের সহজ-সরল-কঠিন বিষয়ে ভাষা পণ্ডিতদের প্রকাশ ভিন্নতার কারণেও বাংলা ভাষায় সমাধানযোগ্য বিষয়ে ধূম্রজাল তৈরি হচ্ছে। ফলে বহু ইংরেজি শব্দের আগে-পরে-মধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলা ধ্বনি, বর্ণ, প্রত্যয়। বিদেশি শব্দে বাংলার ‘া’, ‘’ে, ‘’ি, ‘ী’ ‘র’, ‘তে’, ‘কে’ ‘ই’ যুক্ত হচ্ছে যত্রতত্র। টেলিভিশন ও বেতারের বাংলা অনুষ্ঠানেও বাংলা-ইংরেজি মিশ্রিত শব্দ-বাক্যের ব্যবহার লক্ষণীয়। টেলিভিশনের স্ক্রলিং বা পত্রপত্রিকার বানানরীতিতেও যেন পার্থক্য রয়েছে। নাটক, সিনেমা, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনেও সঠিক বানানরীতির প্রয়োগ হচ্ছে না। প্রমিত ও উপভাষাতেও কৃতঋণ বিদেশি শব্দ ইংরেজির কমবেশি ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। বাঙালির মুখের ভাষার ক্ষেত্রেও এ প্রবণতা অত্যধিক।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কৃতঋণ শব্দের আত্তীকরণের প্রকৃতিও বহুবিধ। অতীতে বাংলা ভাষা প্রচলনে আইন হয়েছে। সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন, বেতার-দূরদর্শনে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ এবং দূষণ রোধে হাইকোর্টের রুল ও নির্দেশনা রয়েছে। এর একটি ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং আরেকটি ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে এসেছে। ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ নামে একটি ভাষাবিষয়ক আইন ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ পাস হয়। কিন্তু আইনগুলোর প্রয়োগের ধরনক্ষেত্রও অনুপস্থিত। বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব-গৌরব; আমাদের অহঙ্কার-অলঙ্কার, ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রেরণা-চেতনা, পূর্বপুরুষ থেকে পাওয়া সম্পদ।

বর্তমানে ইংরেজির সঙ্গে সংযুক্ত করে যেভাবে বাংলা ভাষায় মিশ্র শব্দ তৈরি হচ্ছে, সেটিকে ভাষার আত্তীকরণ না বলে ইংরেজির আগ্রাসন বলা যায়। যোগ্যতা বা মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে বিশেষ কোনো উদ্যোগ না থাকলে ভাষা তার গ্রহণযোগ্যতা বা গুণাগুণ হারিয়ে ফেলবে, অনাকাক্সিক্ষত শব্দ ও বাক্যের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকবে। প্রযুক্তিগত কারণে প্রতিনিয়তই যেসব নতুন ভাষা ও শব্দ বাংলায় আসছে, সেগুলোর তাৎক্ষণিক এবং সময়োচিত বাংলা পরিভাষা ব্যবহারকারী জানতে পারলে অধিক ও কার্যকর ফল আসতে পারে। প্রচলিত বিধির যুক্তির মানদণ্ডে অনেক পারিভাষিক শব্দের গ্রহণযোগ্যতাও বিবেচনা করা যাবে।

বর্তমানে দুদ্দাড়ে চলছে ইংরেজি শেখা। শিক্ষিত-সচেতন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের সঠিক বাংলা প্রয়োগের আন্তরিকতাও প্রশ্নসাপেক্ষ। ভাষাতাত্ত্বিকদের প্রথাগত ঐক্যহীনতা ও প্রচলিত-চলমান ধারার জোরাল যুক্তিতে বারবার ফাঁপরে পড়ে ভাষার প্রতি মমত্ববোধে মুগ্ধ বাঙালি। খেয়ে-দেয়ে আইটাই পেটে বা উসখুসে হাঁস-পাঁস করে নববর্ষ পালিত হলেও তলানিতেই থাকছে চকচকে সঠিক ও পরিশুদ্ধ বাংলার শব্দ-বাক্য-ভাষা। আজকাল গড়গড়, তরতর কথার কেউ যেমন পটাপট জবাব দেন না, তেমনি ভাষাপ্রেমীর হাউমাউ চিৎকারেও পণ্ডিতের মিনমিনে কথার মাথার কোনো পরিবর্তন হয় না, কোনো সান্ত¡না মেলে না বাংলা ভাষাপ্রেমের নীরব কান্নার।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : জেন্ডার, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন গবেষক