advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন

আমাদের সময় ডেস্ক
২০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:০৭

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসুবকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। ‘ঘাতকের আগুনে পুড়ে ছারখার আমাদের সোনালী সংসার’ শিরোনামে পোস্টটিতে সে তার দুঃখকষ্ট, ভাব-আবেগ, বোনের প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছে।

লিখেছে, আজ সারাদেশে, এমনকি দেশের বাইরেও আমার আপুর (নুসরাত) হত্যাকাণ্ডে মানুষ যেভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে, তাতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে কবির বলে যাওয়া কথা, ‘এমন জীবন করিবে গঠন/মরণে হাসিবে তুমি/কাঁদিবে ভুবন।’ রাশেদুলের লেখার শুরুটা ছিল, আবার এসেছিল বৈশাখ, পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে দেখছি আনন্দের বন্যা। আর আমাদের ছোট্টঘর নিকষ অন্ধকারে আচ্ছন্ন। অথচ গত বছর এই সময় আমাদের এ সংসারে কতইনা আনন্দ ছিল। আজ আপুমণিকে হারিয়ে সকল উৎসব অশ্রুজলে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ঘাতকের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল আমাদের সোনালী সংসার।

বুকে জমে থাকা কষ্টটা ঝেরে ফেলে এই কিশোর লেখে, ‘কখনো ভাবিনি আমাদের সমাজে মানুষের পোশাকধারী কিছু অসভ্য জন্তু-জানোয়ার বসবাস করে। যদি আগে জানতে পারতাম তা হলে কলিজার টুকরা আপুকে কখনো ঘর থেকে বের হতে দিতাম না। মানুষ কতটা নির্দয়-নির্মম হলে একজন মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে! কী অপরাধ ছিল আমার আপুর?’

পরক্ষণেই লেখে, ‘একজন লম্পটের যৌন নিপীড়ন রুখে দিতে প্রতিবাদী হয়েছিল আমার আপু। সেই প্রতিবাদের মৃত্যু হয়েছে ১০৮ ঘণ্টা বার্ন ইউনিটে (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) আপুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে।’ অনুযোগের সুরে রাশেদুলের লেখায় উঠে এসেছে, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বাবা-মায়ের পর শিক্ষকরাই আমাদের বড় অভিভাবক। আর সেই অভিভাবক যখন একজন ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন, তখন মনে হয় এই সমাজ আর ভালো নেই। আবার লম্পটকে বাঁচানোর জন্য তার পক্ষ নিয়েছিল কিছু রাজনীতিবিদ ও মানুষরূপী লম্পট। লম্পটের বিচার চাইতে গিয়েছিলাম ওসি সাহেবের কাছে। তিনি আমার আপুকে নিরাপত্তা না দিয়ে মানসিক নির্যাতন করে ভিডিও করলেন। ওসি সাহেব যদি সচেতন হয়ে বিষয়টি তদন্ত করতেন কিংবা আমার আপুর নিরাপত্তা জোরদার করতেন, তা হলে আমার আপুকে পরপারে পাড়ি দিতে হতো না।’

বোন হারানো ভাই লেখে, ‘মনে পড়ছে আপুমণির আইসিউতে বলা শেষ কথাগুলো-রায়হান, আম্মা-আব্বার দিকে খেয়াল রাখিস। আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করিস। আমাকে যারা পুড়িয়ে দিল তাদের যেন সঠিক বিচার হয়। না হলে আমি মরেও শান্তি পাব না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার আপুর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। লম্পটদেরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আপুকে দেশের বাইরে পাঠানোর জন্য ডাক্তারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও আপুকে বাঁচাতে পারেনি। আমাদের পরিবারকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডেকে তিনি একজন মমতাময়ী মায়ের পরিচয় দিয়েছেন। আমরা তার কাছে বলেছি, আমার আপুর হত্যাকারীদের যেন দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি আমাদের নিশ্চিত করেছেন, বিচারে কোনো দুর্বলতা রাখা হবে না। আসামিদের রেহাই দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিচার-প্রশাসনের প্রতি আস্থা রেখে বলতে চাই, এসব জানোয়ারকে কঠিন শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেন কোনো ভাইয়ের বুক থেকে তার বোনকে কেড়ে নিতে না পারে।’

নুসরাতের ভালোবাসা মনে করিয়ে রাশেদুল জানায়, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরে দেখি আপুর রুমটা খালি পড়ে আছে; যেই টেবিলে বসে পড়ালেখা করত সেখানে বই খাতাগুলো ঠিকই আছে, আছে আপুর ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো, নেই শুধু আমার কলিজার টুকরা আপুটিÑ বিশ্বাস করুন, একবুক চাপা কষ্ট, বেদনায় আমার ছোট্ট হৃদয়টি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। প্রতিটি মুহূর্তে মনে পড়ে যায় আপুর কথা। ঘুমের ঘোরে জেগে উঠি আপুর শেষ দিনগুলোর নির্মম কষ্টের কথা স্বপ্নে দেখে। শেষ রাতে চোখে একফোঁটা ঘুম আসে না আপুর কথা ভেবে। আমাদের পরিবারের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক ছিল আপু।

পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সাথে তার ছিল আন্তরিকতাপূর্ণ ভালোবাসার সম্পর্ক। শান্ত মেজাজের অধিকারী হওয়ায় পরিবারের সব সমস্যা অত্যন্ত ধীরচিত্তে সমাধান করত। আমাদের সাথে দূরের কথা পাড়া-প্রতিবেশীর কারও সঙ্গে কোনোদিন ঝগড়া-বিবাদে নিজেকে জড়ায়নি। অনেক আস্থাভাজন হওয়ার কারণে আব্বু কোনো দিন তার প্রিয় সন্তানের কোনো চাহিদা অপূর্ণ রাখেননি। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তার কোরআন তেলোয়াতের মধুর সুর এখনো আমার কানে বাজে। বাড়ির সব কাজে আম্মুকে সহযোগিতা করত।

আম্মু আমাদের নিয়ে টেনশন করলে আপু অভয় দিয়ে বলত, আমরা এমন কোনো কাজ করব না, যাতে আপনাদের সম্মানহানি হয়। বরং আমরা তিন ভাইবোন পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজে আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করব। সেই উজ্জ্বলতার প্রতিচ্ছবি ছিল আমাদের সংসার। আপুর মতো ক্ষণজন্ম বোন আমাদের ছোট ঘরকে সব সময় আলোকিত করে রাখত, যা আজ নিভে গিয়ে একমুঠো ছায়ায় পরিণত হয়েছে।’ নিজের পোস্টের একেবারে শেষ দিকে রাশেদ লেখে, ‘আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া, আমার আপুকে যেন তিনি জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন, আর খুনিদের দুনিয়া ও আখেরাতে কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। (আমিন)। হতভাগা নুসরাতের ছোট ভাই’।