advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধামাচাপার চেষ্টা অর্থ ছড়িয়ে

শাহজাহান আকন্দ শুভ,ঢাকা; আরিফুর রহমান,ফেনী ও ওমর ফারুক,সোনাগাজী
২০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯ ১৬:২৮

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নির্যাতন ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়। এই অপচেষ্টার প্রধান খলনায়ক নুসরাত রাফিকে যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা।

নিজ কক্ষে নুসরাতকে যৌন নিগ্রহ করে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে থেকেই তিনি ঘাটে ঘাটে অর্থ ছড়ান। এ অর্থের ভাগ পান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য, গণমাধ্যমকর্মীসহ ফেনী ও সোনাগাজী প্রশাসনের অনেকেই। অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর আরেক দফা অর্থ ছড়ানো হয়। এদিকে নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে আটক করেছে পিবিআই। অন্যদিকে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।

advertisement

নুসরাত জাহান রাফির যৌন হয়রানি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কে কী পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন তা জানতে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট অনুসন্ধান শুরু করতে যাচ্ছে। এর পর সিআইডি বাদী হয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করবে। এরই অংশ হিসেবে সিআইডি ওসি মোয়াজ্জেমসহ নুসরাতের যৌন হয়রানি ও হত্যাকাণ্ডের মামলার সব আসামিসহ অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব তলব করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া নগদ লেনদেনও খতিয়ে দেখবে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি নুসরাতকে যৌন হয়রানি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা দিতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। এ অর্থের উৎস জানতে চাই। এখানে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আমাদের টিম সোনাগাজী যাবে। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা বলব। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, পিবিআই যৌন হয়রানি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করছে। আমরা মানিলন্ডারিং হয়েছে কিনা তা দেখব।

নুসরাতকে যৌন নিগ্রহ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের পর সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও রাজনীতিবিদ এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর অপচেষ্টা করেন। এ কাজ করতে ওসি কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিককে ব্যবহার করেন। এ কাজে মোটা অঙ্কের অর্থ ছড়ান অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ সহযোগীরা। এ ধরনের অভিযোগে ১০ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রত্যাহার করা হয়।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নুসরাত হত্যাকাণ্ড ও যৌন নিগ্রহের ঘটনা ধামাচাপা দিতে অধ্যক্ষ সিরাজের স্ত্রী শুধু ওসি মোয়াজ্জেমকে ১৮ লাখ টাকা দেন। এ ছাড়া অর্থ দেওয়া হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য, স্থানীয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলকে। এ ছাড়া অধ্যক্ষের পক্ষে মানববন্ধন করতেও অনেক অর্থ দেওয়া হয়। সিআইডি অর্থ লেনদেনের পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখবে।

এদিকে নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। শুক্রবার বিকালে আওয়ামী লীগের এ নেতাকে সোনাগাজীর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিবিআইপ্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানিয়েছেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিকদের প্রভাব রয়েছে বলে এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর দিন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতিকে আটক করা হলো। তিনি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর শাহাদাত হোসেন শামীম ফোনে রুহুল আমিনকে ঘটনা জানিয়েছিলেন।

একই অভিযোগে এর আগে সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

নুসরাত ছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী। গত ৬ এপ্রিল আরবি পরীক্ষা দিতে গেলে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০ এপ্রিল মারা যান।
মাদ্রাসা কমিটি বাতিলের নির্দেশ নুসরাতের হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। গত বুধবার ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আহসান উল্লাহ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছায়।

এ বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, মাদ্রাসা কমিটির সদস্যরা নুসরাত হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় এ নির্দেশ এসেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠির নির্দেশনা মোতাবেক ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে। কমিটি গঠন করতে হলে নীতিমালা অনুসারে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকতে হবে। আমরা সে জন্য অপেক্ষা করছি।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন আহমদ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. আহসান উল্লাহ কমিটি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আগামী ২-১ দিনের মধ্যে ৫ সদস্যবিশিষ্ট অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানানো হয়।

জাবেদ ও পপিকে আদালতে উপস্থাপন নুসরাত হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত আসামি জাবেদ হোসেন ও জড়িত থাকার অভিযোগে আটক উম্মে সুলতানা পপিকে (শম্পা) আদালতে উপস্থাপন করেছে পিবিআই। এর আগে এ দুজনই রিমান্ডে ছিল। জাবেদ ১৩ এপিল চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হয়। ওই দিন থেকে তাকে সাত দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে উম্মে সুলতানা পপিকে ১০ এপ্রিল সোনাগাজী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর ১১ এপ্রিল সুলতানা পপিকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়।

এ দুই আসামির রিমান্ড শেষে শুক্রবার বিকালে ফেনীর সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহমেদের আদালতে উপস্থাপন করা হয়। পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম তাদের আদালতে উপস্থিত করার তথ্য নিশ্চিত করেন।

এর আগে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে এ দুজনের নাম উল্লেখ করেন। তারা জানায়, জাবেদ ও পপি সরাসরি কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করে। নুসরাতের গায়ে জাবেদ কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয় আর পপি হাত-পা চেপে ধরে ওড়না দিয়ে বেঁধে ফেলে। এ সময় তাদের সঙ্গে আরও তিনজন ছিল।

নুসরাতকে হত্যার দায় স্বীকার করে গতকাল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ভাগনি (শ্যালিকার মেয়ে) উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা।

শুক্রবার রাতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহমেদের আদালত তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পিআইবির চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল বলেন, ‘নুসরাত হত্যাকাণ্ডের যে দুজন নারী সদস্য জড়িত ছিল তাদের মধ্যে উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা একজন। সে জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বলেন, তাকে সে নিচ থেকে ডেকে নেয় ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে।

গত ৯ এপ্রিল শম্পা সন্দেহে সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে উম্মে সুলতানা পপিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় এ পর্যন্ত এজাহারের নয়জনকে গ্রেপ্তারসহ ১৮ জনকে আটক করা হয়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে পাঁচজন। ১৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড দেওয়া হয়।

এদিকে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া সহপাঠী কামরুন্নাহার মনিকে নিয়ে ঘটনাস্থল ও বোরকার দোকান পরিদর্শন করেছে পিবিআই। গতকাল দুপুরে পিবিআইয়ের একটি দল মনিকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মনিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে একটি দল মনিকে নিয়ে সোনাগাজী পৌর শহরের মানিক মিয়া প্লাজায় একটি বোরকার দোকানে গিয়ে মালিকের সঙ্গে কথা বলে। পরে দলটি ওই মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেখানে নুসরাতকে কীভাবে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তার বিবরণ দেন মনি।

মো. শাহ আলম আরও বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া মনির কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া পুরুষদের গায়ে থাকা বোরকাগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

ফেনীতে মশাল মিছিল : নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে ফেনীতে মশাল মিছিল করেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবী পরিবার। গতকাল সন্ধ্যায় ফেনী ট্রাংক রোডের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে অংশগ্রহণ করে পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।