advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

জাহাঙ্গীর সুর
২০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:৪৩

নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের কষ্টিপাথর। আর নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা হলো গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল মাপকাঠি। এমনটাই বলেছেন ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস.ওয়াই. কুরাইশি। দ্য হিন্দুতে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘আ ক্রাইসিস অব ক্রেডিবিলিটি?’ শীর্ষক তার মতামতধর্মী নিবন্ধের সংক্ষেপিত অংশের ভাষান্তর করেছেন জাহাঙ্গীর সুর ভারতের নির্বাচন কমিশন দুর্দান্ত এক প্রতিষ্ঠান।

নির্বাচনী দক্ষতায় গোড়া থেকেই বিশ্বের নেতৃস্থানীয়। কিন্তু ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে সে চুলচেরা বিশ্লেষণের মুখোমুখি। এ রকমটা আগে কখনো দেখা যায়নি। বেশ কিছু ঘটনায় নির্বাচনী আচরণবিধির ফাটল ধরা পড়েছে, বিশেষত ক্ষমতাসীন দল বিধি ভঙ্গ করছেই। ৮ এপ্রিল ভারতের প্রেসিডেন্টকে লেখা এক চিঠিতে অবসরে যাওয়া আমলা ও কূটনীতিকরা নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

কমিশনের ‘দুর্বল হাঁটুভাঙা বিধি’র কথা তারা বলেছেন। লিখেছেন, ‘এখন বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে ভুগছে’ কমিশন। যে কারণে উদ্বেগ ভারতের প্রথম উপগ্রহ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন ২৭ মার্চ। চিঠিতে এটাকে ‘সংগতির অন্যায়রকম বিচ্যুতি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কেননা এর ফলে ক্ষমতাসীন দল অন্যায্য প্রচার পেয়েছে। বিনা নিবন্ধনে কী করে নমো টিভি যাত্রা শুরু করল, সে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কথা বাড়ছে প্রধানমন্ত্রীর জীবনীনির্ভর চলচিত্র নিয়ে যা মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ১১ এপ্রিল, ঠিক যেদিন নির্বাচন শুরু হয়েছে। ওই দলটি কমিশনকে অনুরোধ করেছে যেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া অবধি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এ ধরনের যত প্রামাণ্যচিত্র আছে তা যেন কোনোভাবেই কোনো মাধ্যমেই প্রচার করা না হয়। “মোদি: আ কমন ম্যান’স জার্নি” নামে যে ওয়েবসিরিজ রয়েছে, তাও প্রচারণামূলক বলে অভিহিত হয়েছে।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ে কথা তোলা হয়েছে ওই চিঠিতে। টানা হয়েছে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রসঙ্গও (তিনি সেনাবাহিনীর সদস্যদের ‘মোদির সেনা’ বলে অভিহিত করেছেন)। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠে এসেছে সেগুলো আসলে দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নিয়েছে। কমিশনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবশ্য এবারই প্রথম নয়।

ভূত আছে সরষের মধ্যেই আমার মতে, এ সংকটের মূল কারণ লুকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার মধ্যেই। কারণ, সরকারই একপাক্ষিকভাবে তাদের নিয়োগ দেয়। এ বিতর্ক বন্ধ করা সম্ভব হবে যদি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অরাজনৈতিক করা যায়; বোর্ড বসিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি কমিশনারদের বেছে নেওয়া হয়, যেমনটা অন্যান্য দেশে হয়ে থাকে। এমনকি দায়িত্বে থাকার সময়ও আমি এ পদ্ধতিতে সমর্থন জানিয়েছিলাম, কিন্তু পরে শাসননীতি বিষয়টাকে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে, কারণ তারা ক্ষমতা হারাতে চায় না।

এতেই প্রতীয়মান হয় যে, জাতীয় স্বার্থের চেয়ে রাজনীতি ও ভোটের স্বার্থই প্রধান হয়ে ওঠে। তবুও এগিয়ে যেতেই হবে নির্বাচন কমিশনের সুনাম ক্ষুণœ হয় আরেকটা কারণে। দুর্বশ্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সে শান্ত করতে পারে না, বিশেষত ক্ষমতাসীন দলকে। কারণ, কোনো দলের নিবন্ধন বাতিল করার মতো তার কোনো ক্ষমতা নেই; এমনকি চরমতম সীমালঙ্ঘনের বেলাতেও।

অথচ ১৯৫১ সালের রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্টের ২৯-এ সেকশনে কমিশনকে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ দেখানো হয়েছে। বেশ আগে থেকেই কোনো দলের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা পাওয়ার দাবি করে আসছে নির্বাচন কমিশন। ১৯৯৮ সালে এমন সংস্কারের কথা প্রথম তুলেছিলেন প্রথন নির্বাচন কমিশনার। পরে কয়েকবার এ দাবি সামনে আনা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিমকোর্টে একটা এফিডেভিটও জমা দিয়েছে কমিশন।

নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের কষ্টিপাথর। আর নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা হলো গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল মাপকাঠি। সে কারণেই, শিগগিরই নির্বাচনসমূহের অভিভাবকের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দরকার যেন সে তার স্বায়ত্তশাসনকে রক্ষা করতে পারে। সাংবিধানিক নিয়োগগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করতে পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়। নির্বাচনী বিধিভঙ্গের বিপরীতে দলগুলোর নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়ার সময় এখনই।

এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে জনগণের আস্থা আবার ফিরিয়ে আনার জন্য এটা একটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এসব সংস্থা নিয়ে নিশ্চয়ই আরও বিতর্ক হবে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে যে বিশদ কর্তৃত্ব রয়েছে, তার চর্চা করা এবং কঠোর হওয়া থেকে নির্বাচন কমিশনকে কিছুতেই প্রতিহত করতে পারবে না। এটা তার বিচক্ষণতা নয়; এটা সাংবিধানিক কর্তব্য। সুপ্রিমকোর্ট থেকে আগে কখনো তাকে সতর্কবার্তা কিংবা গুঁতা খেতে হয়নি।