advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আমাদের সচেতনতা ও প্রতিষ্ঠান রক্ষা

২০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:৫১

জগতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। প্রতিনিয়ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পরিবর্তেনের হাওয়া লেগেই আছে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে অনেক কিছুর ব্যাখ্যাও বদলে যাচ্ছে। এই আকাশ-বাতাস সংস্কৃতির সময় অনেক কিছুই অ্যানালগ হয়ে গেছে আবার এক সময়ে আধুনিক বলে খ্যাত বিষয়ও বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

চিঠি লেখা মানে, কাগজ-কলমে লেখা আবার তা নিজ হাতে ঠিকানা লিখে নিজে ডাকঘরে গিয়ে বাক্সের মধ্যে ফেলে আসার দিন অনেক আগেই জাদুঘরে চলে গেছে। এখন সব কিছু হাতের মুঠোর ভেতরে জমে থাকে। যখন যেটা দরকার, তখন সেটি নিমেষের মধ্যে চলে আসে। এই যখন অবস্থা, তখন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বা পরিবারের ভেতরে যে মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা, তা কি পুরনোর কাতারে চলে যাচ্ছে? চলে গিয়ে নতুনতর ডিজিটাল মূল্যবোধ জাঁকিয়ে বসতে চাচ্ছে? আচ্ছা, আমরা প্রতিষ্ঠান নিয়ে হতাশার স্তরে ভ্রমণ করার আগে মোটা দাগে প্রতিষ্ঠান বলতে কী বুঝি, তা একবার জেনে নিই। এ ‘প্রতিষ্ঠান’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত শব্দ।

advertisement

অনেকেই সভা-সমিতিতে খুব হতাশ হয়ে বলতে থাকেন, আমাদের দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। যা আছে, তাও এক সময় থাকবে না। তখন এই সমাজ ও দেশের কী অবস্থা হবে? এমন কথায় বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠান শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তো প্রশ্ন আসে, প্রতিষ্ঠান তাহলে কী? অনেকের কাছে অনেক রকম ব্যাখ্যা আছে। আমার কাছে সরলভাবের কথা হলো-প্রথমে সংগঠন, পরে প্রতিষ্ঠান। সমাজ বা রাষ্ট্রের সীমানায় প্রথমে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। দশজন মিলে একই উদ্দেশ্য ও একই লক্ষ্যে দশজনের মঙ্গল কামনায় একটি গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে কার্যক্রম চালনার জন্য মিলিত হয়ে থাকেন।

এ রকম একটি সংগঠন চলতে চলতে ৫০ বা ১০০ বছর পর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের অনিবার্য কিছু শর্ত আছে। সব সংগঠনই প্রতিষ্ঠান নাও হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের কিছু উপাদানও আছে। যেমন-থাকতে হবে মানুষের বিশ্বাস বা আস্থা। তারপর মূল্যবোধ এবং তার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও থাকতে হবে। এখন আসুন, আমরা আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্রে কী কী প্রতিষ্ঠানের সেবা অথবা শাসন কিংবা নিয়ন্ত্রণ দেখে থাকি, এর একটি আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথমে আসুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের একটা আস্থা ও বিশ্বাস আছে। আমাদের ধারণা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি না পেলে তার কোনো দাম নেই। তাকে কেউ চাকরিও দিতে আগ্রহী হবেন না। কোনো ছাত্রছাত্রী যত খারাপই হোক, মানে গাধা মার্কাই হোক না কেন, সরকারি কোনো অফিস-আদালত ওই সার্টিফিকেটের কোনো দাম নেই বা মানি না বলতে পারবে না। বললেও সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। একটি উদাহরণ দিই। আমাদের দেশে অনেকের এসএসসি সার্টিফিকেটে যে জন্ম তারিখ থাকে, তা অনেক সময় সঠিক থাকে না। রেজিস্ট্রেশনের সময় হেড মাস্টার হিসাব মেলানোর জন্য আন্দাজি একটি তারিখ বসিয়ে দিয়েছেন।

এখন উপায়? সমস্যা নেই। ওই যে হেড মাস্টার দিয়েছেন, তিনি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তিনি কী আর মিথ্যা তারিখ দিয়েছেন? রাষ্ট্র বা সমাজ এটি মেনে নিয়েছে। কেউ যদি মামলা করেন, তা হলে মনে হয় হেড মাস্টার ঠিক থাকবেন। এটিই হলো প্রতিষ্ঠানের মাজেজা। ফেল করলেও মানতে হবে! চিল্লাচিল্লি করতে পারেন। কিন্তু ঘোষণা হলে উল্টানো মুশকিল আছে। বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজমান, এতে কী ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেখে বা শুনে আমাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা কিংবা আস্থা রাখতে পারছি? স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কী তাদের প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানগুলো আগের মতো ধরে রাখতে পারছে না? না হলে কেন? তারপর আছে বিবাহ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান বহু পুরনো ও সনাতন।

কোনো ছেলেমেয়ে বিয়ে করে ঘর-সংসার করে, সন্তান উৎপাদন করে থাকে, প্রজন্ম তৈরি করে। এটা ঘটা করে আত্মীয়স্বজনের সামনে হয়ে থাকে। বিয়ে গোপনের বিষয় নয়। দশজন সাক্ষী থাকে, অমুকের মেয়ের সঙ্গে অমুকের ছেলের শুভবিবাহ হয়েছে। বিয়ের এক বছর পর দুইজন মা-বাবা হলে কেউ আপত্তি করবেন না। না হলেও আপত্তি নেই। কিন্তু তারাই যদি প্রেম করে মিলিত হয়ে সন্তানের মা-বাবা হতেন, তা হলে সমাজ কি মেনে নিত? নেবে না কেন? কারণ সমাজের প্রচলিত বিবাহ পদ্ধতির সিল নেই। মানে, কাজি নেই, নিজের লোকজন নেই। এ কারণে ওই বিয়ে অবৈধ এবং সন্তানও অবৈধ।

সমাজ তাকে জারজ সন্তান নামে অবহিত করবে। সমস্যা কী? বিয়ে করে যে কাজ করত, বিয়ে না করেও ওই কাজ করেছে! সমস্যা কী? সমস্যা হলো, তাদের কাছে স্বীকৃত বিবাহ পদ্ধতির সিল নেই। এটিই হলো প্রতিষ্ঠানের মাজেজা। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান কি আগের মতো চলছে? ভেঙে যাচ্ছে কি? এমনভাবে রাষ্ট্রের আরও প্রতিষ্ঠান আছে। যেমন-পরিবার প্রতিষ্ঠান। যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। তারপর মসজিদ, মন্দির ও গির্জার কার্যক্রম। কোর্ট-কাছারি, থানা ইত্যাদির কার্যক্রম বিবেচনা করলে আগের যে ধারণা মানুষের মধ্যে ছিল, এখন আর তা পুষ্ট থাকছে না! স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, প্রতিষ্ঠান কি ভেঙে যাচ্ছে? নীতিশাস্ত্রের প-িতরা বলেছেন, মানুষ ভালো থাকতে বাধ্য। কেন? প্রধানত চারটি কারণে।

প্রথমত ধর্মীয় কারণ, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রীয় আইন, তৃতীয়ত সামাজিক প্রথা ও চতুর্থত প্রাকৃতিক নিয়ম। এখন আসুন, ধর্ম আমাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তা একটু খুঁজে দেখি। প্রকৃত বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তা সব দেখেন-জানেন। পাপ করলে শাস্তি হবে, পুণ্য করলে বেহেশত পাবেন। এসব কারণে মানুষ ভালো থাকতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবে তা কি হচ্ছে? তারপর রাষ্ট্রীয় আইন। জোর যার মুল্লুক তার। এই প্রবাদ কী বহাল, না বহাল নেই? ব্যতিক্রম বাদে যাদের টাকা আছে, রাজনৈতিক পরিচয় আছে-তাদের আইন মানানো খুবই যন্ত্রণার। যারা প্রয়োগে আছেন, তারাই মালুম করতে পারেন। ফৈজদারি-দেওয়ানি মামলার ভয়ে, পুলিশের ভয়ে অনেকেই ভালো কাজ বা ভালো থাকতে বাধ্য হয়ে থাকেন। কিন্তু সবাই নন! তাহলে? সামাজিক প্রথা এখন আর কেউ মানেন না। সমাজই তো ভেঙে-চুরে যাচ্ছে! যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে, তারা সমাজের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন!

সমাজে এখন কেউ আর একঘরে বা আটক হয়ে পড়েন না। নানাভাবে সব অপকর্ম জায়েজ করা হয়। তা হলে ভালো থাকতে কেউ চান কি? শেষে প্রাকৃতিক নিয়ম। এখানেও ঝামেলা, এখানেও উল্টাপাল্টা। বন্যার সময় বন্যা নেই, খরার সময় খরা নেই, শীতের সময় শীত নেই! দেখে মনে হয়, প্রকৃতিও মানুষের আচরণ শুরু করেছে। শীতের সময় গরম কাপড় আর গরমের সময় পাতলা কাপড় পরতে বাধ্য থাকলেও অনেকেই নিয়মকে অনিয়ম বানাতে স্বাধীনতা চান! তো কথা হলো-ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল আর বাংলাদেশ আমল এক আমল নয়। অনেক কিছু বদলে গেছে। পুরনো বিদায় নিয়েছে, নতুন এসেছে এবং আসতেই থাকবে। কিন্তু নতুনের মুক্ত বাতাসে পুরনো মূল্যবোধ সব বাতিল করতে হবে। তা কি ভালো, না মন্দ-এই হিসাব আমাদের মেলাতে হবে।

মানুষ কারো অধীন থাকতে আগ্রহী নয়। নর-নারী সবাই মুক্ত জীবন পছন্দ করে থাকেন। জন্মের সময় স্বাধীন থাকলেও জন্মের পর থেকেই সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে যায়। এই ধর্মীয়, সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যাবতীয় প্রতিষ্ঠান আর আগের অবস্থানে নেই। মানে, থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। যারা প্রতিষ্ঠানের বারোটা বাজানোর মহৎ কাজে লিপ্ত, তারাও এক সময় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করবে তাদের সম্পদ ও মানসম্মান রক্ষার জন্য।

কিন্তু দেখা যাবে, সিস্টেম কাজ করছে না। তখন হবে বুমেরাং!! আমাদের স্বার্থেই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করে যুগোপযোগী করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর এসব প্রতিষ্ঠান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অন্যতম প্রাথমিক উপাদান। সব কিছু নষ্টদের দখলে যাওয়ার আগেই আমাদের সচেতন হয়ে প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে এবং অবিরত ইতিবাচক সংযোগ রাখতে হবে। সব কথার সারকথা, নিজ থেকে শুরু করাই আসল কিছু। য় আলম তালুকদার : শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা