advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

খালেদার জামিন হলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শপথের সিদ্ধান্ত

নজরুল ইসলাম
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৮:৩৮

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি খালেদা জিয়া জামিনে মুক্ত হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ছয়জনের শপথ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক অর্থে বিবেচনা করবে বিএনপি। সে ক্ষেত্রে মুক্ত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির পরবর্তী বৈঠক ডেকে শপথ না নেওয়ার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে বলে দলটির নীতিনির্ধারণী একাধিক নেতা এ আভাস দিয়েছেন।

সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খান কারাবন্দি চেয়ারপারসন চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে সাক্ষাৎ করেন। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে। খালেদা জিয়া বলেছেন, শুধু প্যারোলে মুক্তি নিলেই হবে না, মান-সম্মানের কথাও ভাবতে হবে। সংসদে যোগদান প্রশ্নে খালেদা জিয়া বলেন, লাভ কী হবে এতে?

advertisement

ওই সময়ে এক নেতা বলেন, ম্যাডাম তো আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পেতে পারেন। সরকার বাধা না দিলে তো তার জামিনে মুক্তি কোনো বাধা হওয়ার কথা নয়। তাই জামিনে মুক্ত হওয়ার পর যদি দলের সবাই চায় একাদশ জাতীয় সংসদে সরকার যাদের নির্বাচিত করেছে তাদের শপথ নেওয়া প্রয়োজন, তা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। ওই সিদ্ধান্ত ম্যাডামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেওয়া হবে। এ সময় খালেদা জিয়া কোনো মন্তব্য করেননি। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, খালেদা জিয়া আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়ার অধিকার রাখেন। এ ধরনের দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক সময়েও আছে। সরকারের অনুকম্পায় খালেদা জিয়ার মুক্তি নেওয়া সম্মানজনক হবে না।

এ অবস্থার মধ্যে গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আমাদের এ ৬ জন সংসদে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমরা দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের নির্বাচিত সদস্যরা শপথ নেবেন না। এটাও বলা আছে, এটা (সিদ্ধান্ত) তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। এটা আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের (তারেক রহমান) সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের স্থায়ী কমিটি নিয়েছে। সুতরাং এখান থেকে ফিরে যাওয়া বা কেনো পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না। সেজন্য আজকে বিষয়টা এখানে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। কারণ এর প্রয়োজন নেই।

একই অনুষ্ঠানে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, আজকে একটা নির্বাচন নাকি কী হয়েছে, আপনারা সবাই জানেন। আমার দৃষ্টিতে এই তিনশ আসনে কেউ জয়লাভ করেনি, এই তিনশ আসনে কেউ পরাজিত হয়নি। জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে জনগণ। সেই জনগণ যখন শতভাগ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেনি, তাকে নির্বাচিত বলার সুযোগ নেই। আমাদের যারা জয়লাভ করেছেন, তা জনগণ বিশ্বাস করে না। কারণ জনগণ ভোট দিতে পারেনি। গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদে শপথ নিলে তা জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে যাওয়া হবে। সংসদে শপথগ্রহণের সঙ্গে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। এটার সঙ্গে দেশনেত্রীর মুক্তির কী সম্পর্ক; এই আলোচনা কীভাবে আসতে পারে, এ বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার। জাতির আর কত বিভ্রান্ত করা যাবে। আমরা বিভ্রান্ত করতে চাই না।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমাদের সময়কে বলেন, খালেদা জিয়ার নামের পাশে আপসহীন অবস্থা রেখে যদি আদালতের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তি হয়, তা হলে আগের স্থায়ী কমিটিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরবর্তী বৈঠক ডেকে পরিবর্তন করা হবে। ওই বৈঠকও মুক্ত খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেওয়া হবে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পর্দার অন্তরালে সরকারের নানা পর্যায়ে কথাবার্তা চলছে বলে দলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানা গেছে। এ অবস্থায় উদ্যোগটি সফল হলে চলতি মাসের ৩০ তারিখের আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি দৃশ্যমান হতে পারে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, কোনো খবর যখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন ধরে নিতে হবে কোথাও না কোথাও এর ভিত্তি আছে। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেছেন, গণতন্ত্রের নেত্রী গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে জনগণের কাছে হস্তান্তর করে কারও যদি সংসদ যাওয়ার শখ থাকে যান, কিছু বলব না। কিন্তু তিনি (খালেদা জিয়া) জেলে থাকবেন আর পার্লামেন্টে গিয়ে কথা বলবেন সেই কথা শোনার জন্য; কিন্তু আমরা কখনই প্রস্তুত থাকব না।

একাদশ নির্বাচনে বগুড়া-৪ আসনের বিএনপির নির্বাচিত সদস্য মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রতিদিন ১০-১৫ চ্যানেল-মিডিয়া ফোন দেয়, আপনারা নাকি সংসদে যাচ্ছেন, আপনারা নাকি শপথ গ্রহণ করছেন। আমি জাতীয়তাবাদী দলের ধারক-বাহক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে আদর্শিত, ম্যাডামের দীক্ষায় দীক্ষিত, দেশনায়ক তারেক রহমানের আদর্শে আদর্শিত হয়েছি। আপনাদের আমি কথা দিচ্ছি, যদি আমার দলের নির্দেশনা আসে আপনারা সংসদে যান, তা হলে সংসদে যাব। যদি নির্দেশনা না আসে আমি কথা দিচ্ছি, সংসদে যাব না ম্যাডামের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি দাবি করেন তিনি।

গয়েশ্বরের বক্তব্য নিয়ে বিএনপিতে তোলপাড় খালেদা জিয়া তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে অনেক সফলতা থাকলে ‘সৎ পরামর্শক’ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে গয়েশ্বরচন্দ্র রায়ের বক্তব্য নিয়ে বিএনপিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগেও বলছি, আজও বলছি, বেগম খালেদা জিয়া যাদের পরামর্শ নেবেন সেই পরামর্শে যারা উৎসাহিত হবেন তার পাশে যারা থাকবেন, আমি বলছি, খালেদা জিয়া ব্যর্থ সৎ, সিনসিয়ার, সাহসী সহযোগী সৃষ্টি করতে পারেননি।

তার এই বক্তব্য দেওয়ার পর খালেদা জিয়াভক্ত নেতাকর্মীরা গয়েশ্বরচন্দ্রের ব্যাপক প্রশংসা করেন। গতকাল দলের নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলাপচারিতায় এক নেতা বলেন, দাদা সঠিক কথা বলেছেন। কিন্তু দলের সিনিয়র কয়েক নেতা তাদের অনুসারীদের সামনে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ এবং বর্তমানে কারও কারও বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করার অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, ‘আমি তো আমাকে বাদ দিয়ে কথা বলিনি। এতে কারও মন খারাপ করা উচিত নয়। কারণ আজ খালেদা জিয়া কারাবন্দি। তার জন্য গত ১৪ মাসে কিছুই করতে পারিনি।’