advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নুসরাত হত্যার পরিকল্পনাকারী রানা গ্রেপ্তার

ফেনী প্রতিনিধি
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৮:৪৬

নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বোরকা সোনাগাজীর স্থানীয় খাল থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

গতকাল শনিবার দুপুরে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি যোবায়ের আহাম্মদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বোরকাটি উদ্ধার করে পিবিআইয়ের তদন্ত টিম। এদিকে নুসরাত হত্যামামলায় আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তদন্তকারীদের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ইফতেখার উদ্দিন রানা (২১) ওই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের একজন।

পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মঈনউদ্দিন জানান, গতকাল শনিবার ভোরে রাঙামাটি সদরের টিঅ্যান্ডটি আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোনাগাজীর চরগনেশ এলাকার জামালউদ্দিনের ছেলে রানা হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে রাঙামাটি চলে গিয়েছিলেন।

পিবিআই কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন জানান, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তার ভাই যে মামলা করেছেন, তাতে রানার নাম নেই। তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কারাগারে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে দেখা করে আসার পর তার অনুসারীরা হোস্টেলে যে বৈঠকে বসে নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন, সেই বৈঠকে ছিলেন রানা। তাকে আজ রবিবার আদালতে হাজির করা হবে। অন্যদিকে, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মামলায় ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফউদ্দিন আহমেদ এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, রুহুল আমিনকে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফউদ্দিন আহমেদের আদালতে হাজির করে নুসরাত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছিল। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত রবিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফউদ্দিন আহমদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম। জবানবন্দিতে শাহাদাত বলেন, নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পর তিনি রুহুল আমিনকে বিষয়টি মোবাইল ফোনে জানান। তখন রুহুল আমিন তাকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি শুনেছি, তোমরা চলে যাও।’

কার্যত শাহাদাতের জবানবন্দির পর থেকে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রুহুল আমিনের যোগসাজশের অভিযোগ জোরালো হতে থাকে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারে রুহুল আমিনের নাম নেই। রুহুল আমিন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সদ্য বাতিল হওয়া পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার কাছের মানুষ বলে এলাকায় পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, শ্লীলতাহানি, আর্থিক অনিয়মসহ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন সময়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে রুহুল ছিলেন নির্লিপ্ত।

এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, নুসরাত হত্যাকা-ে সরাসরি জড়িত যোবায়ের আহাম্মদকে নিয়ে পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবালের নেতৃত্বে একটি দল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরে তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সোনাগাজী সরকারি কলেজসংলগ্ন ডাঙ্গি খাল থেকে একটি বোরকা উদ্ধার করা হয়। এ হত্যা মামলার অন্যতম আলামত বোরকা বলে জানান তদন্তকারীরা। বোরকা পরেই ঘাতকচক্রের পুরুষ সদস্যরা ছদ্মবেশে নুসরাতের শরীরে আগুন দিয়েছিল। জানা গেছে, যোবায়েরকে নিয়ে মাদ্রাসা ছাড়াও কয়েকটি স্থানে অভিযান পরিচালনা করে পিবিআই। আলোচিত হত্যা মামলার ৫ নম্বর আসামি যোবায়ের সোনাগাজী পৌরসভার তুলাতলি গ্রামের আবুল বাশারের ছেলে।

নুসরাত হত্যাকা-ে সরাসরি জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে এ পর্যন্ত ৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এর আগে ১৪ এপ্রিল রবিবার রাতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন মামলার অন্যতম আসামী নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। ১৭ এপ্রিল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফউদ্দিন আহমেদের আদালতে আবদুর রহিম ও শরীফ, ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় একই আদালতে হাফেজ আবদুল কাদের; পরদিন ১৯ এপ্রিল অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আলোচিত এ মামলায় এ পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মনি ও জাবেদ হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
নুসরাত হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন, জাবেদ ও কামরুন নাহার মনিকে গতকাল আদালতে উপস্থিত করে পিবিআই। গতকাল শনিবার বিকালে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফউদ্দিনের আদালতে তাদের উপস্থিত করা হয়। এর আগে রুহুল আমিনকে শুক্রবার সোনাগাজী থেকে আটক করা হয়।

কামরুন নাহার মনিকে ১৫ তারিখ সোনাগাজী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৭ এপ্রিল একই আদালত তার সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে জাবেদকে ১৩ এপিল চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। ১৯ এপ্রিল বিকালে ফেনীর সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফউদ্দিন আহমেদের আদালতে ফের তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

নুসরাত হত্যা মামলার আসামি নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জাবেদ ও কামরুন নাহার মনির নাম উল্লেখ করেন। তারা জানান, জাবেদ ও মনি সরাসরি কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করে। জাবেদ নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। মনি বোরকা সংগ্রহ এবং নুসরাতের হাত-পা চেপে ধরে আগুন লাগিয়ে দেয়। অপরদিকে এ দুজনের জবানবন্দিতে উঠে আসে, আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জানতেন।

মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ
নুসরাতের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল শনিবারও মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি শহরের ট্রাংক রোড প্রদক্ষিণ শেষে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সাংবাদিক নুরুল করিম মজুমদার। মানববন্ধনে স্কুলের হাজারো শিক্ষার্থী ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন প্রদর্শন করে নুসরাতের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবিতে স্লোগান দেন।