advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:৪২

লাখো শহীদের আত্মদানের বিনিময়ে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর দেশ হানাদারমুক্ত হয়েছিল। চতুর্দিকে তখন ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাস’। সবার মাঝেই ‘মনের মতো করে’ নতুন দেশটিকে গড়ে তোলার আবেগঘন স্বপ্ন। আমরা যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছি তাদের মধ্যে তো বটেই, এমনকি যাদের পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি তাদের মাঝেও, ‘নবজীবন রচনার’ স্পন্দন।

এর মাঝেই, কিছু লোক মুক্তিযোদ্ধা না হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে জাহির করতে শুরু করেছিল। ১৬ ডিসেম্বরের পরে যারা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সেজেছিল, জনগণ তাদের ‘সিক্সটিন্থ ডিভিশনের’ লোক বলে আখ্যায়িত করত। এদিকে স্বাধীন দেশে তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় সরকার শুরু থেকেই নানা সমস্যা ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল।

একদিকে শুরু হয়েছিল পরাজিত শত্রুদের অন্তর্ঘাত ও মুক্তিযুদ্ধের শিবিরে তাদের অনুপ্রবেশের পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। অন্যদিকে সরকার, প্রশাসন এবং ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনসহ আওয়ামী লীগের একাংশের বাড়ি-গাড়ি দখল, লাইসেন্সবাজি, চাঁদাবাজি এবং অভ্যন্তরীণ দলাদলি-হানাহানি-সংঘাত ইত্যাদি ঘটনাবলি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক ও জটিল করে তুলেছিল। এ রকম অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বিজয়কে সংহত ও তাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বামপন্থিদের বিশেষ ভূমিকা অত্যাবশ্যক ও জরুরি হয়ে উঠেছিল।

এই উপলব্ধি থেকেই ৯ থেকে ১১ এপ্রিলে ছাত্র ইউনিয়নের ৩ দিনব্যাপী ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছিল। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে (তখন সেটিকে ‘রেসকোর্স ময়দান’ বলা হতো) সম্মেলনের আয়োজন ছড়ানো ছিল। এত বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ কোনো সম্মেলন দেশবাসী এর আগে কখনো দেখেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ও কমরেড মণি সিংহÑ এই চারজন জাতীয় নেতাকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সম্মেলনের প্রবেশমুখে এই চারজন নেতার বিশাল ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অন্যরা এলেও মওলানা ভাসানী আসেননি। এটি ছিল জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে আরেকটি হোঁচট খাওয়ার ঘটনা। সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। অভূতপূর্ব শৃঙ্খলার সঙ্গে আয়োজিত এই বিশাল সম্মেলন ছাত্র সমাজ ও দেশবাসীকে অভিভূত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী করে তুলেছিল। ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনের পর পরই ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময়ই সংগঠনটি দুই অংশে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একটি অংশকে নিয়ে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ স্লোগান, অন্ধ সরকার বিরোধিতা ও ‘অতিবাম’ অবস্থান গ্রহণ করে জাসদের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

বৃহত্তম বামপন্থি সংগঠন হিসেবে আমরা যে অনেকটা একচেটিয়া প্রভাব এতদিন সৃষ্টি করে রাখতে পেরেছিলাম, সে ক্ষেত্রে তখন থেকে আমাদের জাসদের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে ঘটে যাওয়া ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশন’ এবং শাসক দল আওয়ামী লীগের ‘বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জাসদ দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিল। এ রকম অবস্থায় ১৯৭২ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ছাত্রলীগের ছিল দুটি পৃথক প্যানেল। তাদের ভোটের যোগফলের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন পূর্ণ প্যানেলে (একটি সদস্যপদ বাদে) জয়লাভ করেছিল। এ নির্বাচনে আমি ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছিলাম। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই সেবার জয়ী হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়ন। ডাকসুর দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্যান্য নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রগতির ধারায় ‘দেশ গড়ার’ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযান, ব্রিগেড আন্দোলন, ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধার অভিযান ইত্যাদি নানা ধরনের কাজ চলেছিল জোরকদমে। গ্রীষ্মের ছুটিতে ১০-১২ জন করে কর্মী নিয়ে ‘ছাত্র ব্রিগেড’ গঠন করে সেগুলো ৪-৫ সপ্তাহের জন্য শহর ছেড়ে দলে দলে ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে গ্রামে। কায়েমি স্বার্থবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অনেক ব্রিগেড সদস্য আহত হচ্ছিল।

মোট কথা, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠনের জন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। ডাকসু পরিণত হয়েছিল ছাত্র সমাজের এসব বহুমুখী কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রদের জন্য তখন ছিল সিটের দারুণ সংকট। সিট সমস্যা কিছুটা লাঘব করার জন্য ভিসি স্যারের সম্মতি নিয়ে ডাকসুর উদ্যোগে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাশ্রমে এফ রহমান হলের অস্থায়ী টিনশেড নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পরই দেশে বড় একটি বন্যা ও দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল।

সেই সময় ডাকসুর উদ্যোগে প্রতিদিন ভোরে হাজার-হাজার রুটি বানিয়ে বিমানবাহিনীর সহায়তায় হেলিকপ্টারে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়েছিল। পরবর্তী আবাদের মৌসুমে ফসল ফলানো নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রেসকোর্স ময়দান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের মাঠে বীজতলা তৈরি করে সেই চারা সরাসরি কৃষকের কাছে বিতরণ করা হয়েছিল। ক্যাম্পাসকে ঘিরেও নানা তৎপরতার সূচনা করা হয়েছিল। শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষাভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের লেখা এবং ক্যাম্পাসের খবরাখবর সহকারে ‘ডাকসু বার্তা’ নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ডাকসুর সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয়েছিল ‘নাট্যচক্র’।

সাংস্কৃতিক জগতের অনেক খ্যাতিমানের হাতেখড়ি হয়েছিল এই ‘নাট্যচক্র’কে কেন্দ্র করে। ক্যাম্পাসকে মুখরিত করে তোলা হয়েছিল নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নাটক মঞ্চায়ন ইত্যাদি চলছিল হলে হলে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে। কলাভবন চত্বরে আমেরিকার প্রগতিশীল সংগীতশিল্পী ডিন রিড, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণদাস বাউল প্রমুখসহ বড়-বড় দেশীয় শিল্পীর কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল। মুক্ত স্বদেশে ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক পরিবেশ জমজমাট হয়ে উঠেছিল।

আমাদের সময়ের ডাকসুর আরেকটি অনবদ্য অবদান ছিল ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণকাজের সূচনা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৬-৭ বছরে এটির নির্মাণ সমাপ্ত করা গিয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম ডাকসুর অনবদ্য কীর্তি হিসেবে এটি আজ দেশবাসী, বিশেষত ছাত্র সমাজের দ্রোহ-সংগ্রামের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আগে ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের। সেই দায়িত্বটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডাকসু পালন করতে শুরু করেছিল।

সারারাত জেগে ক্যাম্পাসের দেয়ালে ও রাস্তায় আলপনা আঁকা, ঢাকা শহরের প্রধান-প্রধান মোড়ে বর্ণিল পেইন্টিংসহ ভাস্কর্যসদৃশ হোর্ডিং স্থাপন ইত্যাদি সাজসজ্জার কাজগুলো ডাকসুর উদ্যোগেই হতো। একুশের প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর যে রুট বর্তমানে চালু রয়েছে সেটি ১৯৭২ সালে ডাকসুর উদ্যোগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। ডিজাইন চূড়ান্ত করে বিধ্বস্ত শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণ এবং শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যসহ সামগ্রিক অঙ্গসজ্জা ও আলোকসজ্জার বর্তমান ব্যবস্থাটি আমাদের সময়ের ডাকসুর উদ্যোগেই সূচিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ উন্নত করার জন্য আমাদের প্রয়াসের অন্ত ছিল না।

জনপ্রিয়তা (!) কমতে পারে জেনেও ‘অটোপ্রমোশন’ বা ‘পরীক্ষা পেছানোর’ অযৌক্তিক দাবিকে আমরা প্রতিবারই প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও প্রতিরোধ করেছিলাম। ১৯৭৩-এ পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা আমরা সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রমাণ করে দিয়েছিলাম। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পরিবর্তন করা হয়েছিল। একদল ছাত্র নামধারী নকলবাজ এসব কারণে ক্ষমতাসীনদের মদদে ডাকসু অফিসে হামলা চালিয়ে অফিস তছনছ করেছিল।

‘কর্তৃপক্ষের দালাল সেলিমের কল্লা চাই’ বলে স্লোগান তুলেছিল। কলাভবনের করিডরে তারা ককটেল নিক্ষেপ করলে তার স্পিøন্টারের আঘাতে ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী সুলতানা আহত হয়েছিল। দীর্ঘ পরাধীনতার ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ায় ‘হারানো সময়’ পুনরুদ্ধার করা কর্তব্য হয়ে উঠেছিল। আমরা ছাত্র সমাজকে সে কারণে আরও মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করতাম। বাড়তি খাটুনি দিয়ে এক্সট্রা সময় পড়াশোনা করে ৩ বছরের কোর্স পারলে ২ বছরে শেষ করার জন্য বলতাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রেওয়াজ চালু করা হয়েছিল যে, প্রত্যেক বিভাগে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের ‘ব্লোউন-আপ’ ছবি নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে রাখা হতো। তা ছাড়া একাডেমিক বছর শুরুর প্রথম দিনটিতে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান-সালাম জানানো শেষে শিক্ষক-ছাত্রদের মিলিত শোভাযাত্রা শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে নতুন শিক্ষা বছর শুরু করত। এসব রেওয়াজ ১৯৭৫-এর পর আর অব্যাহত থাকেনি। যে সময়টির কথা বলছি, সেই সময়টিতে ‘ভিয়েতনাম’ ছিল বিশ্বের প্রগতিশীল মানুষের কাছে অতিপ্রিয় একটি নাম।

আর সাম্রাজ্যবাদ ছিল তীব্র ঘৃণার বস্তু। সে সময় ডাকসুর নেতারাসহ ৬ জন ছাত্রনেতাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সেদেশে ভ্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কলাভবনের বটতলার বিশাল ছাত্র সমাবেশে দাঁড়িয়ে একটি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে প্রবল ঘৃণায় পকিস্তানের ও গণহত্যার প্রধান মদদদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই আমন্ত্রণপত্রটি আমি ছাত্রছাত্রীদের উল্লসিত সম্মতিতে ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। উত্তর ভিয়েতনামের ওপর মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানের বোমাবর্ষণের প্রতিবাদ জানানোর জন্য ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি কলাভবনের বটতলা থেকে মার্কিন দূতাবাসে (যেটি তখন মতিঝিলের আদমজী কোর্ট বিল্ডিংয়ে অবস্থিত ছিল) একটি স্মারকলিপি পেশ করার উদ্দেশ্যে বিশাল মিছিল বের হয়েছিল।

শান্তিপূর্ণ সেই মিছিলটি প্রেসক্লাবের সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে মিছিলের ওপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। নিহত হয়েছিল ছাত্রনেতা মতিউল ইসলাম ও মীর্জা কাদের। আহত হয়েছিল অনেকে। এই বর্বর হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ডাকসু ও ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ২ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে প্রথম ‘হরতাল’ সংগঠিত করা হয়েছিল। দেশব্যাপী অভূতপূর্ব সফল হরতাল পালন, বঙ্গবন্ধুর আজীবন ডাকসু সদস্যপদ প্রত্যাহার ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগ পাল্টা হামলা চালিয়ে ন্যাপ অফিস, ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।

এতেও আন্দোলন স্তব্ধ করা যায়নি। অবশেষে সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান, ইউএসআইএস অফিস শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া, ভিয়েতনামকে দূতাবাস খোলার অনুমতি দেওয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অপসারণ করা, গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা, গুলিবর্ষণে গুরুতর আহত পরাগ মাহবুবকে সরকারি খরচে যুক্তরাজ্যে প্রেরণসহ আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ইত্যাদি পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করেছিল।

আন্দোলনের ফলে অতিগুরুত্বপূর্ণ এসব বিজয় অর্জিত হয়েছিল। সেদিন ‘সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে দেশ গড়ার’ আমাদের সেই সংগ্রামে সবাইকে সঙ্গে পাওয়া যায়নি। অনেকেই দুরাচার ও দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে সংগঠিত হয়েছিল ‘সেভেন মার্ডার’। ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সাহায্যে ‘ব্রাশফায়ার’ পরিচালনা করেছিল। ১৯৭৪ সালে ঘটেছিল ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের কলঙ্কিত ঘটনা।

এই ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে আমি বা ডাকসু ও ছাত্র ইউনিয়ন কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। কিন্তু পরের দিন সাংবাদিকদের কাছে এ ঘটনার জন্য জাসদ-ছাত্রলীগকে অভিযুক্ত করে একটি চরম ‘মিথ্যা’ কথা বলেছিলাম। আমার জীবনে এ ধরনের, সম্ভবত একমাত্র একটি মিথ্যাচার করার জন্য আমি অবশ্য অনেক আগেই প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছি। এভাবে অনাকাক্সিক্ষত নানা সংঘাত ও অপরাধী কর্মকা- প্রসারিত হয়ে বাড়িয়ে তুলেছিল নৈরাজ্যের সন্ত্রাসী আবহাওয়া। কলুষতার কালো থাবা ব্যর্থ করে দিচ্ছিল আমাদের ‘দেশ গড়া’র সংগ্রামের মহান প্রয়াসগুলো। নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ১৯৭৩ সালেই আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছিল।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের ডাকসু নির্বাচন ভণ্ডুল হওয়ায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নেওয়া সত্ত্বেও, কাগজে-কলমে আমি ডাকসু ভিপি রয়ে গিয়েছিলাম। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তোলা ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমার কর্তব্য বলে আমি গ্রহণ করেছিলাম। প্রবল বিপদ ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে সেজন্য সেদিন ঘরে-ঘরে ঘুরে-ঘুরে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এ ক্ষেত্রে তেমন একটা পাওয়া যায়নি।

তারা বেশিরভাগ ভয়ে চুপ করেছিল, অনেকে আবার দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার কৌশল গ্রহণ করেছিল। তবে আমরা চেষ্টা করে কাউকে-কাউকে সক্রিয় করতে পেরেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় যেদিন প্রথম খুলেছিল সেদিনই আমরা ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’ স্লোগান তুলে ক্যাম্পাসে ঝটিকা মিছিল করেছিলাম। ৪ নভেম্বর বটতলা থেকে ‘মৌন মিছিল’ করে ৩২ নম্বরের বাসায় গিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেছিলাম। সে সময়ই সংঘটিত হয়েছিল জেল হত্যাকাণ্ড।

৫ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল ও গায়েবানা জানাজা সংগঠিত করেছিলাম। তার পরই ৭ নভেম্বর ঘটনাবলি দেশকে নৈরাজ্যের আরেক পর্বে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের ওপর নেমে এসেছিল চরম নির্যাতন। কিছুদিন পরই আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে প্রায় দুই মাস আটক রেখে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছিল। তখনো আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসুর ভিপি। তার পর টানা দুই বছর বিনা বিচারে নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে ঢাকা জেলে বন্দিজীবন কাটিয়েছিলাম। এর মধ্যেই ডাকসুর বিলুপ্তি ঘোষিত হয়েছিল। ১৯৭৮-এর শেষে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সেভাবে আর ক্যাম্পাসে ফিরে যাইনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বছরে এক-আধবার সেখানে যাওয়াও হয় ঠিকই। কিন্তু ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যেভাবে যাওয়া হতো এখনকার যাওয়া তেমনটি মোটেই নয়। পুরনো সেই দিনগুলোর কিছু ঘটনার কথা লিখতে গিয়ে প্রবলভাবে অনুভব করলাম যে, আরও অনেক ঘটনা, অনেক কথা বলা বাকি থেকে গেল। সেগুলো লিখতে গেলে একটি বই হয়ে যাবে। সেসব কথা যে লিখে রাখা উচিত, তা আমি অস্বীকার করি না। সে চেষ্টা আমি করব। পেরে উঠব কিনা জানি না।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি