advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এ নষ্ট সমাজের উত্তরণ কোথায়

অজয় দাশগুপ্ত
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:৫০

কী হয়েছে সমাজের? কী হচ্ছে দেশে? রামকৃষ্ণ মিশম স্কুলের প্রশ্নপত্রে রবিঠাকুরের বাবার নাম মিয়া খলিফা, সানি লিওনের মতো যৌনতাময়ী নারীও আছে আরেক প্রশ্নের উত্তরে। এগুলো কিসের লক্ষণ? নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবি দেখে মনে হবে কাবুল বা সিরিয়ার কোনো শহরে মানুষ নেমেছিল পথে। এত সৈন্যসামন্ত, এত বাহিনী, তাও আবার অস্ত্র তাক করা। এত বিভীষিকাময়!

কয়েকদিন থেকে দেখছি ইমাম-মোল্লাদের ব্যাপারে নেগেটিভ খবরে ভর্তি মিডিয়া। এর পর দেখলাম পুরোহিতও বাদ পড়েননি। বালক বলাৎকারের দায়ে পুরোহিতকে ধরা হয়েছে। হঠাৎ করে মোল্লা-পুরোহিতরা একযোগে এসব কাজে নেমে পড়লেন কেন? আর যদি তা না হয়, তা হলে এসব রেগুলার ব্যাপার। এ দৈনন্দিন কাজের খবর কি কেউ জানতেন না। এ এক অদ্ভুত সমাজ এখন। কে যে কাকে কী জন্য কী করছে, তা বোঝা মুশকিল। মাদ্রাসার মেয়ে নুসরাত আমাদের বিবেক কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে।

advertisement

এ কম্পন কতদিন টিকবে, সেটিই বলা দায়। এও কি কোনো সময়ের ব্যাপার? ভুলে যাওয়ার দিন কি সমাগত? খেয়াল করবেন, সামাজিক অস্থিরতা খুব বেড়েছে। সরকার আর্থিক উন্নতি, অগ্রগতির কথা যত বলুক, সমান্তরালভাবে বেড়ে উঠেছে আপদ। এসব সামাজিক বিপদ এখন সর্বগ্রাসী। মেয়ের বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করা, অপমান করা এখন স্বাভাবিক বিষয়। এ সমাজ তা হলে কোন উন্নতির মুখ দেখছে? আমি বলছি না, উন্নতি তাদের বলেছে এসব করতে। আসলে যেটি বুঝতে হবে, সমাজ উন্নতি থমকে গেছে। আমি বলব, প্রায় পথ হারিয়ে ফেলেছে।

ধর্ম ধর্ম করতে করতে এখন এমন হাল, ধার্মিকের চেয়ে শোআপ করার প্রবণতা আজ জাঁকিয়ে বসেছে। কোথাও কোনো নিয়ম আছে বলে মনে হয় না। থাকলে ধর্মের নামে অন্য সম্প্রদায়ের ওপর এমন অকথ্য বাক্য প্রয়োগ বন্ধ হতো। এই যে উসকানি, এটিই আমাদের সমাজকে ক্রমাগত অন্ধ করে তুলছে। দেখলাম রবীন্দ্রনাথও আক্রমণের শিকার। ‘অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’র ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, এ নাকি বিধর্মীদের পথে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র।

আবার দেখুন, এক মডেলকে নিয়ে কত কথা। কেউ ইহকাল বিশ্বাস করে, না পরকালে বিশ্বাস করে, তা নিয়ে কিছুকাল আগেও মানুষ এভাবে ভাবত না। এসব তো ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নোংরামি প্রমাণ করে, আমাদের সমাজে পচন ধরেছে। তা হলেও চলত। কিন্তু দেখুনÑ কথায় কথায় জীবনের ভয়, মরণের ভয়। কাউকে মেরে ফেলা যেন হাতের ময়লা।

এত সস্তা জীবন আমরা দেখিনি কখনো। একজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এত হুমকি কী প্রমাণ করে? সমাজ যদি অভয় দিতে না পারে, তা হলে সমাজে মানুষ উন্নতি দিয়ে কী করবে? জীবনের প্রতি লোভী, কামনা, বাসনার দাস আমরা আসলে কী চাই? কী করছি আমরা? দেশ-বিদেশে কিছু মানববন্ধন, হই চই, তারপর প্রলেপ দিয়ে পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখা। এর ফাঁকেই বেড়ে ওঠে আরও কোনো নতুন দানব। যার আগ্রাসনে আমরা অতীতের ঘটনা ভুলে যাই, ব্যস্ত হয়ে পড়ি নতুন কিছু নিয়ে।

এমন করে চলতে দিলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? মুক্তিযুদ্ধের দেশ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলে গলা ফাটানো জাতি আসলে কোন জায়গায়? কীভাবে এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা? মূলত এর পেছনে আছে রাজনীতি। এক ধরনের রাজনীতি কোনোভাবেই দেশকে উদার আর মুক্ত থাকতে দিতে চায় না। তারা এখন চুপসে গেলেও আসলে তলে তলে এখনো শক্তিশালী। ভোট ঠিকমতো হয় না বলে তারা যে ফাল পাড়ে, এ কথা মিথ্যা নয়। ঠিকমতো ভোট হলে আসলে কী হতো বা কী হতে পারে, তা সবাই কমবেশি জানেন। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা আর প্রজ্ঞার কাছে মার না খেলে জাতির খবর ছিল। একা তিনি শক্ত হাতে হাল ধরে আছেন বলে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ভয় অন্যত্র। তিনি কি সব সময় তা পারবেন? তার তো বয়স হয়েছে। অন্যদিকে ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই। রাজনীতির কূটচালে আওয়ামী শিবিরেও এখন প্রচুর স্বাধীনতাবিরোধী আর দুশমনরা ঢুকে আছে।

শুধু তা নয়, প্ররোচনা আর ইন্ধনে তাদের ভেতরও ধর্মের নামে সংস্কার প্রবল। এ কারণে আওয়ামী লীগও আর আগের জায়গায় নেই। তাদের মনে এখন যতটা পাপ-পুণ্য, এর চেয়ে বেশি ভোটের হিসাব। ভোট পাওয়া, না পাওয়ার এই হিসাবে তারা এমন কোনো কাজ করতে রাজি নয়, যাতে তাদের ভোট কমে যায়। ওই হিসেবে হেফাজত আজ কৌশলের পার্টনার। এই আঁতাত যে কতটা গুরুতর হবে, সেটি কমবেশি জানার পরও পরিবেশ বাধ্য করেছে তা করতে। এর ফায়দা কারা নেবে? ওই গোষ্ঠী, যাদের হাতে সমাজ জিম্মি। মূলত জিম্মি নারীসমাজ। নারীরা এ দেশে আর কোনোকালে এতটা অবহেলিত ও নিগৃহীত ছিলেন, জানি না।

একদিকে নারীর শাসন, নারীর উন্নয়ন যখন বাংলাদেশকে দ্রুত সামনে নিয়ে যাচ্ছে, আরেকদিকে তখন চলছে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে চরম ষড়যন্ত্র। তারা নারীদের কী চোখে দেখে, সেটি বলার দরকার দেখি না। কথা হচ্ছে, এর শেষ কোথায়? মঙ্গল শোভাযাত্রা সীমিত হয়ে পড়ছে ক্রমেই। মুখোশ নেই, মুখই এখন মুখোশ। বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ, নেই নিরাপত্তা। তবু জোর করে আমরা তা বজায় রাখছি। এই বজায় রাখা কীভাবে কতদিন চলবে, তা কে জানেন? ভয় আমাদের ঘিরে ধরছে আবার। এটি কোনো সুস্থ বা ভালো সমাজের পরিচয় বহন করে না। এর ভেতর যে ভয় আর বিপদ, সেটিকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে কোনো উন্নতিই টিকবে না। তাই দায় সরকারকেই নিতে হবে। আইন আছে, বিচার নেই; বিচার আছে, শাস্তি নেই।

এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। আমরা নিশ্চিত জানি, বঙ্গবন্ধুকন্যা উদার মনের মানবী। তিনি দেশ ও জাতিকে ভালোবাসেন। এ নেতৃত্ব দেশ আগে পায়নি। সৌভাগ্য আমাদের, তিনি আছেন। তাই তাকে আরও কঠিন হওয়ার পথ বেছে নিতে হবেই। কারণ এই মৌলবাদের ক্যানসার কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না। মন খারাপের সময় শেষ হোক। মুক্তিযুদ্ধের দেশ ও সমাজ যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ কাজ কবে কারা শুরু করবেন, তা কেউ জানেন না। তবে এ কাজ হতেই হবে। বাংলাদেশ আর যাই হোক, হেরে যেতে পারে না। জয় তার স্বভাব। সে জিতবেই।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক