advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শবেবরাতের ফজিলত : করণীয়-বর্জনীয়

মুফতি তাউহিদুল ইসলাম
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:১৯

মহান আল্লাহ বছরের কোনো কোনো মাস ও দিবারাত্রিকে বিভিন্ন ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে বরকতময় ও বৈশিষ্ট্যম-িত করে রেখেছেন। বরকতময় এ সময়ে সামান্য মেহনত ও প্রচেষ্টার ফলে বিশাল প্রতিদানের অধিকারী হওয়া যায়, যা অন্য সময় অধিক মেহনত করেও অর্জন করা সম্ভব নয়। সেই সময়গুলোর মধ্যে শবেবরাত অন্যতম। ‘শবেবরাত’ নামটি একটি ফার্সি ও একটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত।

‘শব’ শব্দটি ফার্সি, অর্থ রাত আর ‘বরা-ত’ শব্দটি আরবি এর অর্থ মুক্তি। দুটি মিলে অর্থ হয় ‘মুক্তির রাত’। যেহেতু এ রাতে অগণিত মানুষের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া এবং বহু জাহান্নামিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, তাই এ রাতটি ‘শবেবরাত’ বা মুক্তির রাত নামে পরিচিত। হাদিস শরিফে এ রাতটি ‘লাইলাতুন্ নিস্ফ মিন শাবান’ [অর্ধশাবানের রাত তথা ১৪ শাবান দিবাগত রাত] বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে বেশকিছু হাদিস রয়েছে।

যথা, মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদি. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহতায়ালা অর্ধশাবানের রাতে [শবেবরাতে] তার সৃষ্টির প্রতি মনোযোগী হন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। [সহীহ ইবনে হিব্বান] হজরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত; রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, অর্ধশাবানের রাত {১৪ শাবান দিবাগত রাত} যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো। নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা এ রাতে সূর্যাস্তের পর প্রথম আসমানে আসেন এবং বলতে থাকেন, আছো কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছো কি কোনো রিজিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিজিক দেব। আছো কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দেব। আছো কি এমন, আছে কি এমন, এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বলতে থাকেন। সুনানে ইবনে মাজাহ।

হজরত আ’লা ইবনুল হারিস রহ. থেকে বর্ণিত; উম্মুল মু’মিনীন হজরত আয়েশা রাযি. বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমার আশঙ্কা হলো তার হয়তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়েশা! অথবা বললেন, ওহে হুমায়রা! তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি ইন্তেকাল করেছেন কিনা। নবীজি সালাøল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি তখন বললেন, ‘এটা হলো অর্ধশাবানের রাত, (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত) আল্লাহতায়ালা অর্ধশাবানের রাতে তাঁর বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।’

উল্লেখিত হাদিসগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ রাতে ইবাদতের কোনো ধরন নির্দিষ্ট নেই। এ রাতে এমন সব নেক আমল করা উচিত যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়। তাই এ রাতে আমরা নি¤েœাক্ত আমলগুলো করতে পারি। মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ অবশ্যই জামাতের সঙ্গে আদায় করা। নামাজ পড়া। এ ক্ষেত্রে অনির্ভরযোগ্য কিছু বইপুস্তকে নফল ইবাদতের বিভিন্ন নিয়মের কথা লেখা আছে। যেমন এত রাকাত পড়তে হবে, প্রতি রাকাতে এই এই সুরা এতবার পড়তে হবে।

অথচ সহীহ হাদিসে শবেবরাত, শবেকদর বা অন্য কোনো ফজিলতপূর্ণ রাতে এসব বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামাজ প্রমাণিত নেই। তওবা করা। তওবা বলা হয়-(ক) কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (খ) সঙ্গে সঙ্গে এই পাপটি পরিহার করা (গ) ভবিষ্যতে এই পাপটি আর করব না-এই মর্মে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করা (ঘ) বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তার হক আদায় করে কিংবা ক্ষমা গ্রহণ করে দায়মুক্ত হওয়া (ঙ) কোনো ফরজ, ওয়াজিব ছুটে গিয়ে থাকলে মাসআলা অনুযায়ী তার কাজা কাফফারা আদায় করা। অতঃপর আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা এবং অন্তর থেকে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করা, দুরূদশরিফ পড়া, জিকির-আজকার করা ও ইস্তেগফার পড়া ইত্যাদি। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী কিছু লোক এমন রয়েছে, যারা এই সাধারণ ক্ষমার রাতেও ক্ষমা পায় না, যতক্ষণ না তাওবা করে ফিরে আসে।

হাদিসের আলোকে এরা হলো : ১. আল্লাহতায়ালার সঙ্গে অংশীদার স্থাপনকারী মুশরিক। ২. হিংসুক।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী। ৪. যে পুরুষ টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরতে অভ্যস্ত।

৫. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। ৬. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি।

৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারী। শয়তান মানুষকে এই রাতে নেক আমল থেকে বিরত রাখার জন্য কিছু কুসংস্কারের প্রচলন ঘটিয়েছে।

এ জাতীয় কিছু কুসংস্কারমূলক কাজ হলো- ১. আতশবাজি, পটকা ইত্যাদি ফুটানো ও তারাবাতি জ¦ালানো। ২. মসজিদ, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও অন্যান্য জায়গায় আলোকসজ্জা করা। এসব অপচয়ের শামিল।

৩. হালুয়া-রুটি, খিচুড়ি পাকানো। এসবকে এ রাতের বিশেষ কাজ মনে করা। এতে মা-বোনদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, মসজিদে হৈচৈ ও শোরগোল হয়। ইবাদত করার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং এসবের পেছনে পড়ে এ রাতের তাওবা ইস্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি ছুটে যায়। তাই এসব কাজ বর্জন করে সঠিক আমলে লিপ্ত থাকাই কর্তব্য। য় মুফতি তাউহিদুল ইসলাম : মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুফতি, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, সাতমসজিদ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা