advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চার দিকে পানি তবু খাবার পানির সংকট

তারিকুল ইসলাম কাজী রাকিব,পাথরঘাটা
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ১১:১২

চারিদিকে নদ-নদীবেষ্টিত উপকূলীয় জনপদ বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা। চারপাশে অফুরন্ত পানির উৎস থাকলেও সুপেয় খাবার পানির অভাবে বিপর্যস্ত উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষের জনজীবন। সমস্যা নিরসনে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় পাঁচ শতাধিক পন্ড-স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) বসানো হলেও বেশিরভাগই অকেজো হয়ে আছে। ফলে ডায়রিয়াপ্রবণ এ উপজেলায় জনস্বাস্থ্য রয়েছে হুমকির মুখে।

ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, নিরাপদ উৎস থেকে পানি সংগ্রহের সুযোগ নেই এমন ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সিডর, আইলা, মহাসেন ও রোয়ানুসহ ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকাগুলোয় প্রায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে পানযোগ্য পানি থেকে বঞ্চিত। এর মধ্যে বরগুনার পাথরঘাটা অন্যতম। আন্তর্জাতিকভাবে পানিতে লবণের মাত্রা ৬০০ পিপিএম পর্যন্ত খাবার উপযোগী ধরা হয়।

কিন্তু পাথরঘাটার ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণের মাত্রা ৩০০০ পিপিএম, যা স্বাভাবিক মাত্রায় চেয়ে কয়েগুণ বেশি। বরগুনা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পাথরঘাটা পৌরসভাসহ ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে কাঁঠালতলী, কালমেঘা, পাথরঘাটা সদর, চরদুয়ানী ও নাচনাপাড়া ইউনিয়নে ভূপ্রাকৃতিক কারণে গভীর নলকূপ স্থাপন করা যায় না। এসব ইউনিয়নের জন্য বিকল্প পানির উৎস হিসেবে ৫৮৯টি পুকুরে বালুর ফিল্টার (পিএসএফ) বসানো হয়েছে।

এর মধ্যে বর্তমানে সচল আছে মাত্র ১৩১টি এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দেওয়া আরও ২০টির মতো ফিল্টার সচল আছে। বাকি সব ফিল্টার পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে। এ ছাড়া উপজেলার পানি সমস্যা নিরসনে ৯শ ৩টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও এর মধ্যে ৭৫০টিই অকেজো। গভীর নলকূপ স্থাপন না করতে পারায় বিকল্প হিসেবে ৩৩৪টি রেইন ওয়াটার হারবেস্টিন (বৃষ্টির পানি সরবরাহ ব্যবস্থা) স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান উপ-সহকারী প্রকৌশলী দোলা মল্লিক।

উপজেলার হাড়িটানা গ্রামের গৃহবধূ রহিমা বেগম প্রতিদিন ঠাঠা রোদের মধ্যে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে পাশের গ্রাম কোড়ালিয়ায় যান পরিবারের সদস্যদের জন্য সুপেয় খাবার পানি সংগ্রহ করতে। পানির লাইন দীর্ঘ হওয়ায় এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে তার চলে যায় একবেলা। পাঁচজনের সংসারে খাবার পানির প্রয়োজন মেটাতে শুধু এ বেলাতেই নয়, তাকে আসতে হয় আরেকবার।

প্রতিদিন এভাবেই সুপেয় পানির জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন এ উপকূলীয় গৃহবধূরা। রহিমা বললেন, ‘প্রতিদিন এভাবে পানি সংগ্রহ করতে দিনের অর্ধেকটা সময় চলে যায়। তারপর ঘর-গেরস্থালির কাজ তো আছেই। এভাবে কতকাল যে পানির জন্য মোগো সংগ্রম করা লাগবে কইতে পারি না।’ রহিমা বেগমের মতো পাথরঘাটার উপজেলা জুড়ে রয়েছে একই সমস্যা। কেউ পুকুরের পানি দিয়ে সারছেন গেরস্থালির কাজ।

আবার কেউ পুকুরের পানি ফুটিয়েই ব্যবস্থা করছেন খাবার পানির। এ ছাড়া ফিল্টার ও নলকূপ নষ্ট থাকায় পুকুর, ডোবানালা ও খালবিলের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুকুর ও ডোবার পানি খাওয়ায় অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে। এ বিষয়ে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাসুদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, পাথরঘাটায় নিরাপদ পানির তীব্র অভার রয়েছে।

এতে করে উপজেলার এলাকায় খাল-বিল, নদীনালার পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করায় লোকজন টাইফয়েড ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য হুমকিতে রয়েছে। তাই দ্রুত এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ পানি ব্যবস্থা করতে হবে। পাথরঘাটা পৌর এলাকায়ও একই সমস্যা। ডানিডার সহযোগিতায় পৌর এলাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে কাকচিড়া ইউনিয়নে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে পাইপের মাধ্যমে মাত্র ১৬০০টি হোল্ডিংয়ে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা উচ্চ দামে ক্রয় করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।

স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন সংকল্প ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ জানান, বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজ করছে জিও এবং এনজিও। কিন্তু প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়ে গেলে তাদের আর তদারকি থাকে না। তাই সুপেয় পানির সংকট মোচনে প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা। দীর্ঘ মেয়াদে পানি সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারে।