advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাস ‘অধিগ্রহণ’ করে চাঁদাবাজি

শাহজাহান আকন্দ শুভ ও হাসান আল জাভেদ
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৮:৩৭

পুরান ঢাকার সদরঘাট থেকে গাজীপুরের গাজীপুরা রুটে যাত্রী বহনে ‘সুপ্রভাত প্রাইভেট লিমিটেড’ কোম্পানির নামে ১৮৭টি বাসকে পারমিট দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কিন্তু বাসপ্রতি এককালীন লাখ টাকা ও দৈনিক হারে চাঁদার বিনিময়ে ওই রুটে চলছিল প্রায় ৩০০ বাস ও মিনিবাস। এর মধ্যে অনেক বাস রাজধানীর বাইরের রুটে চলাচলকারী।

ফলে কোম্পানি ও পরিবহন নেতাদের চাঁদাবাজির অর্থসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে অতিরিক্ত বাসের ভিড়ে রেষারেষিতে জড়িয়ে পড়েন চালকরা। এ কারণেই সম্প্রতি পরিবহনটির একটি বাসের চাপায় প্রাণ হারান বিইউপি শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। যে বাসটির পারমিট ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের, চাঁদার বিনিময়ে অবৈধভাবে সুপ্রভাতের নামে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

সুপ্রভাতের একাধিক বাস মালিক জানান, অবৈধভাবে ১৩০টি বাস নামিয়ে ‘সুপ্রভাত প্রাইভেট লিমিটেড’ কোম্পানি এক লাখ করে মোট ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা এককালীন চাঁদা আদায় করে। এর বাইরে একেকটি বাস চলাচলে কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের দৈনিক চাঁদা দিতে হতো ১ হাজার ২৫০ টাকা। সে হিসাবে ওই রুটে দৈনিক চলাচলকারী অন্তত আড়াইশ বাসে চাঁদা আসত ৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা মাসে দাঁড়ায় ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

এর মধ্যে সরকার অনুমোদিত চাঁদার হার রয়েছে বাসপ্রতি মাত্র ৪০ টাকা। আর বাকি টাকা চলে যায় কোম্পানির সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুল ইসলাম (আশরাফ), সহসাংগঠনিক সম্পাদক ভূইয়া হুমায়ুন কবির তপনসহ ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির বিভিন্ন নেতা ও নানা সিন্ডিকেটের পকেটে।

সুপ্রভাতের যে বাসচাপায় (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৪১৩৫) বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার নিহত হন, সেটির মালিকের নাম ননী গোপাল সরকার। গ্রেপ্তারের পর তিনি পুলিশ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সুপ্রভাত পরিবহনের বাসগুলো থেকে কী পরিমাণ চাঁদা আদায় হয় তার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এ বাস মালিক জানান, মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন বাসপ্রতি ১ হাজার ৩০ টাকা চাঁদা দিতে হতো।

তা না দিয়ে কোনো বাসের চাকা ঘুরানো অসম্ভব। ফলে অন্য মালিকদের মতো তিনিও বাসটি চালকদের কাছে লিজে দিয়েছিলেন। আর সব মিলিয়ে প্রতিদিন তাকে ১ হাজার ২৫০ টাকা চাঁদা দিতে হতো। ননী গোপালের দেওয়া এসব তথ্য খতিয়ে দেখছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরিবহনটির কয়েক নেতা জানান, ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মো. আশরাফুল ইসলাম (আশরাফ)সহ ২৬ উদ্যোক্তা মিলে এ রুটে ‘বুড়িগঙ্গা যাতায়াত লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি খোলেন।

সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে আশরাফসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে রাতারাতি কোম্পানি বদলে রাখা হয় ‘সদরঘাট-গাজীপুর মিনিবাস মালিক সমিতি (সুপ্রভাত)’। এ কমিটির সভাপতি আবদুল আজিজ ও আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক। এর পর ২০১৪ সালে আবারও নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সুপ্রভাত স্পেশাল প্রাইভেট লিমিটেড ও সুপ্রভাত প্রাইভেট লিমিটেড’।

তবে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় জাবালে নূরের বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর বিপাকে পড়ে পুরো পরিবহন খাত। এ সুযোগে সুপ্রভাত বাস কোম্পানিতে একচেটিয়া হস্তক্ষেপ করেন ঢাকা সড়ক পরিবহনের একজন প্রভাবশালী নেতা। ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্যাডে এক চিঠিতে সুপ্রভাত পরিবহনকে ‘অধিগ্রহণ’ করা হয়।

তাতে বলা হয়, বর্তমান কার্যকরী কমিটি বাতিল করে সুপ্রভাত সরাসরি অধিগ্রহণ করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নিয়ন্ত্রণে আনা হলো। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সহসাংগঠনিক সম্পাদক ভূইয়া হুমায়ুন কবির তপন এর পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। এ বিষয়ে সুপ্রভাত পরিবহনের সাবেক সভাপতি বাবুল মিয়া আমাদের সময়কে বলেন, “পরিবহন বা বেসরকারি খাতে ‘অধিগ্রহণ’ নামক দখলদারিত্ব প্রথমবারের মতো সুপ্রভাতেই দেখলাম। এনায়েত উল্যাহ খানের নেতৃত্বে এটা হয়েছে।” দখলদারিত্বের পেছনে চাঁদাবাজিকেই দায়ী করেন তিনি।

কয়েকজন বাস মালিক ও চালক জানান, গাজীপুরা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশনে শাহ আলম, কবির, ফজলু, বাবুল, বিল্লাল, দিদার নামে কোম্পানির সুপারভাইজার রয়েছে। তারা প্রতিদিন বাসপ্রতি কোম্পানি খরচ হিসেবে ১ হাজার ৩০ টাকা এবং লাইনম্যানের মাধ্যমে আরও ২২০ টাকা হাত খরচ তোলেন। এ টাকার অর্ধেক যায় নেতাদের পকেটে; আর বাকিটা সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলামসহ এ রুটের ১২ জন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিআরটিএর পরিদর্শন টিমের সদস্যরা ভাগ করে খান।

যে কারণে কোন রুটে কতটি বাস চলে, নির্দিষ্ট ভাড়া আদায় হচ্ছে কিনাÑ সে খবর কেউ নেয় না। আবার বাসের ফিটনেসসহ আনুষঙ্গিক ত্রুটির সুযোগ পেয়ে সার্জেন্টরা মামলাসহ নগদ নারায়ণ আদায় করে। এতে চাঁদাবাজ পক্ষ সব সময় লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বাস মালিক ও গণমানুষ। তবে চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ আমাদের সময়কে বলেন, ‘সুপ্রভাত বাসে অনিয়ম হচ্ছিল। তা দূর করার জন্যই কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করেছিলাম। পরে আবার নেতাদের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেই।’

এদিকে বাস মালিকসহ পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে একেকটি রুটে যত যাত্রী চলাচল করে, জরিপের মাধ্যমে চাহিদানুযায়ী বাস চলাচলের অনুমোদন বা রুট পারমিট দেয় বিআরটিএ। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচ, চালক, হেলপার, কন্ট্রাক্টরের বেতনসহ বৈধ আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্ধারণও করা হয়। কিন্তু বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্যদের ম্যানেজ করে অনুমদনের প্রায় দ্বিগুণ বাস নামায় পরিবহন কোম্পানিগুলো।

তাতে এককালীন লাখ টাকা এবং দৈনিক চাঁদাবাজির হার বাড়ে। আর সেই খরচ জোগাতে চালকরা হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা। অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকেই। কেউ কেউ আবার পঙ্গু হয়ে অন্যের দয়ায় জীবন কাটাচ্ছেন।