advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চালকদের সাহসিকতায় বেঁচে যায় অনেক প্রাণ

জিয়াউর রহমান জুয়েল,রাঙামাটি প্রতিনিধি
২১ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:৩৮

বহুল আলোচিত রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ব্রাশফায়ারে আট খুনের জন্য নির্বাচন বর্জনকারী চেয়ারম্যান প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা ও তার অস্ত্রধারী সমর্থকদের দায়ী করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদনে আরও বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট।

তদন্তে চাঁদের গাড়ির চালকদের সাহসিকতার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তাদের কারণে ওইদিন অনেকেই প্রাণে বেঁচে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট। যারা নির্বাচন বর্জন করেছে তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’

advertisement

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। চলতি সপ্তাহেই সেটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। তার পরই করণীয় ঠিক করবে সরকার। বড়ঋষি চাকমা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বাঘাইছড়ি উপজেলার সাধারণ সম্পাদক। দলের সমর্থন নিয়ে তিনি এর আগে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। তার প্রতীক ছিল দোয়াত-কলম।

তবে ১৮ মার্চ ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর পরই অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বড়ঋষি চাকমা। এ নির্বাচনে সংস্কারপন্থি জেএসএস গ্রুপের সদস্য (এমএন লারমা) সুদর্শন চাকমা বিজয়ী হন। তাকে আওয়ামী লীগও সমর্থন দিয়েছিল। তবে ভোট শেষে সন্ধ্যায় তিনটি কেন্দ্রের সরঞ্জাম নিয়ে বাঘাইছড়ি সদরে ফেরার সময় ৯ কিলো নামক স্থানে নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাড়িবহরে ব্রাশফায়ার করে সন্ত্রাসীরা। এতে ঘটনাস্থলে সাতজন ও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। আহত হন অন্তত ৪০ জন।

এদিকে ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক দীপক চক্রবর্তীকে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত শেষে এর কারণ উল্লেখসহ ভবিষ্যতে যাতে আর এ ধরনের ঘটনা না ঘটতে পারে, সে জন্য সর্বাত্মক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশও করা হয়েছে।

হামলার কারণ : তদন্ত কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবেদনে হামলার সম্ভাব্য কারণের মধ্যে কেন্দ্রের গাড়িতে সুদর্শন চাকমার এজেন্ট ও কর্মী থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের উপস্থিতির কারণে গাড়িগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলেও জানানো হয়। মূলত ‘নির্বাচনী বিরোধ’ই এ হামলার অন্যতম কারণ বলে মনে করছে কমিটি।

আরও উল্লেখ করা হয়, ভোটগ্রহণ শেষে ফেরার সময় ঘোড়া প্রতীকের (সুদর্শন চাকমা) কর্মী কেন্দ্রের গাড়িতে ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। মন্টু চাকমা নামের একজন গুলিতে নিহত ও স্ট্রং চাকমা নামের অপর একজন আহত হওয়ায় এ অভিযোগের সত্যতাও মেলে। বাঘাইহাট থেকে তিনটি কেন্দ্রের গাড়ি রওনা দেওয়ার সময় আরেকটি চাঁদের গাড়িতে ঘোড়া প্রতীকের কর্মী-সমর্থক ছিল বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে। মাঝপথে ওই গাড়ি দীঘিনালার দিকে চলে যায়।

কমিটির সুপারিশ : প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে পাহাড়ের সঙ্গে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, পাহাড়ি তিন জেলায় একসঙ্গে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও হতাহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া গুলিবর্ষণের মুখেও সাহসিকতার সঙ্গে তিনটি চাঁদের গাড়ির চালকরা গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি। তারা যদি ওভাবে না আসতেন, তা হলে আরও বেশি প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। এ কারণে চালকদেরও পুরস্কৃত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব মো. নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হামলায় আহত, স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, রিটার্নিং কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গেই কথা বলেছে। সব মিলিয়ে হামলার উদ্দেশ্য চিহ্নিত করা গেছে। নির্বাচন বর্জন করে বড়ঋষি চাকমার সমর্থকরাই পূর্বপরিকল্পিত এ হামলা চালায় বলে জানা গেছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতেও বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।’ তবে এ বিষয়ে কথা বলতে বড়ঋষি চাকমার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক।