advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ওয়াসার পানির শরবত খেলেন না এমডি

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:১০
advertisement

ঢাকা ওয়াসার লাইনের পানি পান করে কেউ মারা গেলে তার দায়দায়িত্ব নেবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। তবে বাড়ির নিচে থাকা রিজার্ভারে (পানির ট্যাঙ্কে) জমানো ময়লা থাকলে ওয়াসা সেই দায়িত্ব নেবে না। গতকাল মঙ্গলবার কারওয়ানবাজারের ওয়াসা কার্যালয়ে সংস্থাটির পরিচালক (টেকনিক্যাল) প্রকৌশলী একেএম সহিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে এ কথা বলেন।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের শতভাগ সুপেয় পানির সুর পাল্টে সহিদ উদ্দিন বলেন, ওয়াসার গভীর কূপ থেকে উত্তোলন করা পানি শতভাগ নিরাপদ। তবে লাইনের পানিতে অনেক সময় ময়লা ঢুকে যায়। আবার সঠিক সময়ে পানির রিজার্ভার পরিষ্কার করা না হলে সেখানে ময়লা জমে। সেই ময়লা পানি ট্যাপ দিয়ে বের হয়। রির্জাভারে জমানো ময়লা পানির দায়দায়িত্ব তো ওয়াসা নেবে না।

এর আগে সকাল ১১টার দিকে ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খানকে লাইনের পানিতে শরবত বানিয়ে পান করানোর জন্য ওয়াসা কার্যালয়ের সামনে আসেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (৫৩ নম্বর ওয়ার্ড) পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান, তার স্ত্রী শামীম হাশেম খুকি, তাদের শিশুকন্যা এবং শামীমের বন্ধু মতিউর রহমান। তাদের সঙ্গে যোগ দেন পূর্ব রামপুরা উলনের বাসিন্দা মনিরুল ইসলামও। তাদের হাতে ছিল ওয়াসার ময়লাযুক্ত পানির জগ, গ্লাস, লেবু, লেবু কাটার ছুরি, চিনির প্যাকেট ও লবণ। সম্প্রতি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেছেন, ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ও নিরাপদ।

তার এই বক্তব্য ক্ষুব্ধ হয়ে অভিনব প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তাকে শরবত খাওয়ানোর ঘোষণা দেন মিজানুর রহমান। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এ ঘোষণার কথা শুনে সকাল থেকে কারওয়ানবাজারে গণমাধ্যমকর্মী ও উৎসুক জনতাও উপস্থিত হন। শরবতের উপকরণসহ ‘দূষিত পানির ওয়াসা, পানি দাও ময়লা না, দূষিত পানির দায় নিতেই হবে’-এমন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদীরা ওয়াসা ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

কিন্তু ওয়াসার নিজস্ব আনসার বাহিনী ও থানা পুলিশের সদস্যরা তাদের বাধা দেন। পুলিশের ভাষ্য ছিল, ওয়াসার এমডি অফিসে নেই। তখন ওয়াসা ভবনের প্রধান ফটকের সামনে বসে পড়েন মিজানুরসহ প্রতিবাদী মানুষগুলো। এর ঘণ্টাখানেক পর প্রতিবাদী ব্যক্তিসহ গণমাধ্যমকর্মীদের ডাকেন ওয়াসার পরিচালক (টেকনিক্যাল) প্রকৌশলী একেএম সহিদ উদ্দিন। সেখানে দূষিত পানির অভিযোগসহ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের দাবিতে ২০১২ সালে সাড়ে তিন হাজার মানুষের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে ওয়াসার এমডিকে চিঠি পাঠানোর বিষয় তুলে ধরেন মিজানুর রহমান। তবে দূষিত পানির অস্তিত্ব এবং ওই চিঠি গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করেন সহিদ উদ্দিন

এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয় প্রায় আধাঘণ্টা। দূষিত পানির অভিযোগ তোলেন পূর্ব রামপুরার মনিরুল ইসলাম। এ সময় ওয়াসার পরিচালক ভুক্তভোগীদের বাড়ির ঠিকানা চান। কিন্তু নিরাপত্তা ও হয়রানির ভয়ে তারা ঠিকানা না দিলেও এলাকাসহ রোড নম্বর দেন। এ সময় ওয়াসা কর্মকর্তা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রকৌশলী একেএম সহিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকার কোথাও দূষিত পানি নেই। তাদের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলাম। রিজার্ভার দূষিত হতে পারে। আগে পানি পরীক্ষা করব। তার পর সমস্যা দেখা হবে। এ সময় ওয়াসার এমডিকে না পেয়ে পরিচালক সহিদ উদ্দিনকে ওয়াসার পানিতে শরবত পান করাতে চান।

কিন্তু শরবতের জন্য আনা পানি ঢাকা ওয়াসার কিনা সে প্রশ্ন তুলে তা পান করতে রাজি হননি ওয়াসার এই কর্মকর্তা। জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ওয়াসার এমডি কীভাবে বললেন, ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ! আমরা ক্ষুব্ধ। উনি যেহেতু বলেছেন ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ, তাই সেই পানিতে ওনাকে শরবত খাওয়াতে এসেছি। আমরা তো বছরের পর বছর ধরে এ পানি পান করছি। ওয়াসার এমডি একদিন একই পানিতে শরবত পান করলে কী এমন দোষ হতো।

মিজানুর রহমান বলেন, ওয়াসার এমডি শরবত পান না করতে চাইলে তাকে এ কথার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে এবং পদত্যাগ করতে হবে। এটাই আমাদের দাবি। নয়তো তার বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনে নামব। আর সুপেয় পানি না পাওয়া পর্যন্ত ওয়াসার পানির বিল দেব না। এদিকে ঢাকা ওয়াসার পানি ‘শতভাগ বিশুদ্ধ’ বলে দাবি করলেও সেই পানি দিয়ে অন্যের বানানো শরবত খেতে আপত্তি জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি তো কারও পানিতে শরবত খাব না। আমি তো খাব আমার পানি। আমি কোনটা খাব না খাব, সেটা তো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। গত ১৭ এপ্রিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গবেষণায় বলেছে, ঢাকা ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করেন। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করেন। তবে টিআইবির এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ও বিশুদ্ধ।

ওয়াসার পানি পরীক্ষা করতে কমিটি ঢাকা মহানগরীতে ওয়াসার পানিতে দূষণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হাইকোর্টের নির্দেশে চার সদস্যের কমিটি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। গত ২১ এপ্রিল এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। কমিটির প্রধান করা হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। বাকি তিনজনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের। অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

advertisement