advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আতঙ্ক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ভবিষ্যৎ

২৪ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ১০:০৩
advertisement

লাদেন কিংবা মোল্লা ওমরের চেয়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভয় একটুও কম নয়। এর কারণও আছে। এ মানুষটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যাবতীয় অপকর্মের দলিল ফাঁস করে দিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। সবার কাছে হেয় হতে হয়েছিল আমেরিকাকে।

এমন মানুষকে উচিত শিক্ষা দিতে আমেরিকা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসের আশ্রয় থেকে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে ১১ এপ্রিল জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো।

উইকিলিকস ও অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী তথ্য-প্রমাণ হাজির করেই দাবি করেছেন, আমেরিকার অনুরোধেই এই গ্রেপ্তার পর্ব। শেষ পর্যন্ত তাকে আমেরিকার হাতেই তুলে দেওয়া হবে। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠায় অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে সুইডেন সরকার। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন অ্যাসাঞ্জ।

তার পাল্টা অভিযোগ ছিল, মার্কিন সরকারের একাধিক গোপন বার্তা ফাঁস করে দেওয়ার জন্যই তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা হচ্ছে। তাকে সুইডেন থেকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে পরের মাসেই লন্ডন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন অ্যাসাঞ্জ। কিন্তু জামিন পাওয়ার পরই উধাও হয়ে যান। অবশেষে ২০১২ সালের আগস্টে অ্যাসাঞ্জকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন দেওয়ার ঘোষণা করে ইকুয়েডর সরকার। তার পর থেকেই কূটনৈতিক রক্ষাকবচ নিয়ে অ্যাসাঞ্জের অস্থায়ী আস্তানা ছিল লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাস। ৪৭ বছর বয়সী অ্যাসাঞ্জ সাত বছর ধরে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ব্রিটেনে গ্রেপ্তার এড়াতে ইকুয়েডরের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়ার আগ্রহেই সেখানে তিনি আশ্রয় পান। কোরেয়া ক্ষমতায় থাকার শেষ দিন পর্যন্ত ব্রিটেনকে অনুরোধ জানিয়ে গিয়েছিলেন অ্যাসাঞ্জকে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী’ হিসেবে বিবেচনা করে কূটনৈতিক মর্যাদা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ব্রিটেন তা করেনি। কারণ কূটনৈতিক মর্যাদা পেলেই অ্যাসাঞ্জ নিরাপত্তার খাতিরে রাশিয়ায় পালাতেন বলে আমেরিকার ধারণা ছিল। তাই নিজেদের হাতে পাওয়ার আগে পর্যন্ত অ্যাসাঞ্জকে লন্ডনেই রাখতে আগ্রহী ছিল তারা। আমেরিকা বরাবরই অ্যাসাঞ্জকে হাতে পেতে মরিয়া হলেও তা সহজ ছিল না।

এ ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে ইকুয়েডরের কীভাবে দরকষাকষি চলেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত গত ৩ ডিসেম্বরের একটি প্রতিবেদন থেকে। সেখানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের মে থেকে রিপাবলিকান-দলীয় রাজনীতিবিদ ও লবিস্ট পল মেনাফোর্ট ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে অন্তত তিন দফা বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকের মূল বিষয় ছিল অ্যাসাঞ্জকে হস্তান্তরের বিনিময়ে আমেরিকা ঋণ মওকুফ। এ আলোচনা সফল হওয়ার পরই লন্ডনের ১১ এপ্রিলের ঘটনা ঘটল। পল মেনাফোর্ট একসময় ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারকাজের হোতা ছিলেন। অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তার অধ্যায়েও এ মুহূর্তে তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে সর্বত্র।

ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রক্ষণশীল দলের এমপি অ্যাসাঞ্জের ‘গ্রেপ্তারের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য’ ইকুয়েডরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনোর প্রশংসা করেছেন। এ থেকেও স্পষ্ট, পুরো প্রক্রিয়াটি সচেতন পরিকল্পনামাফিকই হয়েছে। আর অ্যাসাঞ্জকে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পর একটি ভিডিওবার্তা প্রকাশ করেছেন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো। বার্তায় অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক আশ্রয়ের বিধি ভঙ্গের একগাদা অভিযোগ তুলেছেন তিনি। দাবি করেছেন, অ্যাসাঞ্জের আচরণ নিয়ে ইকুয়েডরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। দূতাবাসে থেকেই অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছিলেন অ্যাসাঞ্জ। বারবার তিনি কূটনৈতিক আশ্রয়ের স্পষ্ট নিয়ম ও রীতি ভঙ্গ করেছেন।

এমন কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস তিনি ব্যবহার করেছেন, যার অনুমতি ছিল না। দূতাবাসের সিকিউরিট ক্যামেরার ফুটেজ আটকে দিয়েছেন তিনি। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। এটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার, মোরেনোকে সামনে রেখে এবং ব্রিটেনের রাজনীতির খারাপ সময়ের সুযোগ নিয়ে আমেরিকাই পর্দার আড়াল থেকে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ইকুয়েডরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট দুর্নীতির দায়ে জনবিক্ষোভের মুখে পড়ে আমেরিকার তরফ থেকে এই মুহূর্তে বাড়তি সাহায্যপ্রত্যাশী। এ রকমও তথ্য প্রকাশিত হয়েছে যে, অ্যাসাঞ্জকে হস্তান্তরের বিনিময়ে ইকুয়েডরকে দেওয়া ঋণগুলো মাফ করে দিতে আমেরিকা এরই মধ্যে রাজি হয়েছে। বিনিময়ে অ্যাসাঞ্জকে হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প নিজেকে কূটনীতিকভাবে দক্ষ এক অভিভাবক হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।

আর অ্যাসাঞ্জকে প্রবেশ করতে হবে সাত বছরের স্বেচ্ছাবন্দিত্ব থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘ বন্দিত্বে। কে এই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ? অনেকেই তাকে অদম্য বীর মনে করেন। যিনি একা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে তাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। না, অস্ত্র-বোমা-মিসাইল দিয়ে যুদ্ধ নয়, অন্যরকম এক যুদ্ধের প্রবক্তা তিনি। নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার হচ্ছে দেখে নিজেকে যিনি ঠিক রাখতে পারেননি। একাই বানিয়ে ফেললেন এক নতুন কোডিং ট্যাগ, এক নতুন বোমা, এক নতুন স্বপ্ন, একটি নতুন আকাশ, একটি নতুন প্রহর। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নির্মিত সেই বোমার নাম ‘উইকিলিকস’।

বোমাটির কাজ, চাপা পড়া সত্য বের করে আনা। আর সেই কোডিং ট্যাগটি হচ্ছে, ‘আপনি কোনো দিন পারবেন না নিরীহ মানুষের হাসি ফিরিয়ে দিতে, পারবেন না যা তারা হারিয়েছে তা পুনরায় এনে দিতে, পারবেন না নবীনদের জন্য সুন্দর করে পৃথিবী সাজাতে, আসলে অত্যাচারীরা আপনাকে সেই সুযোগ দেবে না। চারদিক থেকেই গরিব দেশগুলোকে ঘিরে রাখা হয়েছে, একটা কথা মনে রাখবেন চোরে চোরে মাসতুতো ভাই, যতই চীন কিংবা জার্মানি আমেরিকাকে বলুক না কেন, তোমরা অমুক দেশকে আক্রমণ করলে আমরা তোমাদের ছাড়ব না, আসল কথা হচ্ছে বিশ্বযুদ্ধ লাগলে ক্ষমতাশালী দেশগুলোই একত্র হয়ে পৃথিবীর বাকি দেশগুলো ভাগ করে দখল করে নেবে।’

এক কথায় আমেরিকানদের থেকে আপনার-আমার বাঁচার কোনো রাস্তা নেই, সব স্থানেই তাদের হস্তক্ষেপ আছে, আপনি আপনার দেশে একটা তেলের খনি পেলে তার ভাগও তাদের দিতে হবে, না হয় অল্প দামে তাদের কাছে বিক্রি করতে হবে, অপারগতা জানালে আপনার দেশে ইন্টারন্যাশনাল সন্ত্রাসী আছে বলে ড্রোন কিংবা বিমান হামলা চালিয়ে নীরিহ মানুষ হত্যা করবে। আপনার কাছে কোনো অস্ত্র আছে? যা দিয়ে ন্যাটো কিংবা আমেরিকান বাহিনীর সঙ্গে লড়বেন? পারবেন কি নিজের শেষ সম্বল বাঁচাতে? পারবেন কি নিজের দেশের খনিজ সম্পদগুলো নিজেদের বলে দাবি করতে? কোত্থেকে পারবেন? আপনি তো বড় কোনো পারমাণবিক পরীক্ষাও চালাতে পারবেন না, তা হলে আপনার ন্যায্য বাণিজ্যও বন্ধ।

উন্নয়নশীল দেশগুলো আজ থেকে ৫০ বছর পর যে অস্ত্র ব্যবহার করবে, আমেরিকা তা আরও অন্তত ২০ বছর আগ থেকেই ব্যবহার করছে। আজ থেকে ২০ বছর পর ব্যবহার করার জন্য আমেরিকানরা পারমাণবিক বোমা কিংবা উন্নত বিমান কিংবা রোবট তৈরি করে প্যাকেট করে রেখে দিয়েছে। তা হলে পথ কী? উপায়ই বা কী? উপায় বের করেছিলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। উইকিলিকসের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন। উইকিলিকস দেখিয়েছে, কীভাবে আমেরিকানরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি অন্যায়-অবিচার করেছে। নিজের লালিত সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে নতুন নতুন কৌশলে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও তাদের সম্পদ দখলের চেষ্টা করেছে।

রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের এমন গুরুতর সব অপকর্ম, যা কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান জনসাধারণকে জানতে দিতে চায় না, সেগুলো সর্বসাধারণের সামনে অকাট্য দালিলিক প্রমাণসহ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তার বন্ধুরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আক্ষরিক অর্থেই নগ্ন করে দিয়েছেন। বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি যে তাকে সহজে ছাড়বে না, তা চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়। কিন্তু অ্যাসাঞ্জের কি নিজেকে বাঁচানোর কোনোই উপায় নেই? আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এরিক লুইস বলছেন, নিজেকে রক্ষা করার সম্ভাব্য চারটি উপায় রয়েছে অ্যাসাঞ্জের সামনে।

১. দ্বৈত অপরাধ : প্রত্যর্পণের অন্যতম একটি শর্ত হলো, যে অপরাধের কারণে বন্দি ব্যক্তিকে অপরাধী বলা হচ্ছে, সেটি দুই দেশের আইনেই স্বীকৃত অপরাধ হতে হবে। অর্থাৎ তথ্য ফাঁসের উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ করা যে ব্রিটিশ আইনেও অপরাধ, অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণ করতে হলে সেটি আগে প্রমাণিত হতে হবে।

২. ব্রিটেনের ‘উদারতা’ : অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযোগ, সেটিই কি একমাত্র অভিযোগ হয়ে থাকবে? নাকি নতুন করে আরও কোনো অভিযোগ আনা হবে? গুঞ্জন আছে, সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের দায়ে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সামনে নতুন অভিযোগ দায়ের করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ব্রিটিশ সরকার যদি নতুন অভিযোগের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার মতো ‘উদারতা’ দেখায়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অ্যাসাঞ্জের নামে নতুন মামলা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

৩ রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার : রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হচ্ছেন, এমন অভিযোগ এনে অ্যাসাঞ্জ মুক্তি প্রার্থনা করতে পারবেন কিনা, সে বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হওয়ার নজির যে একেবারে নেই, তাও কিন্তু নয়। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগানের প্রতিপক্ষ ফেতুল্লাহ গুলেনকে রাজনৈতিক আক্রোশের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছিল তুরস্ক। ৪. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা : একজন সাংবাদিক হিসেবে কেবল নিজের কাজ করছিলেন এবং মতপ্রকাশের জন্য তাকে অপরাধী বানানো উচিত নয়, এমন দাবি তুলেও নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারেন অ্যাসাঞ্জ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে, সেটি অস্পষ্ট হলেও ব্রিটেনের আইন অনুযায়ী যে অ্যাসাঞ্জকে শাস্তি পেতে হবে, সেটি এক প্রকার নিশ্চিত। জামিন লঙ্ঘনের অপরাধে এক বছরের কারাদ-ও পেতে হতে পারে তাকে। অ্যাসাঞ্জের আইনজীবীরা অবশ্য তার জামিনের পক্ষে আবেদন করতে পারবেন, তবে এরই মধ্যে একবার জামিন লঙ্ঘন করে ফেলায় পুনরায় তার জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement