advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শপথ নিলেন জাহিদ বিব্রত বিএনপি

নজরুল ইসলাম
২৬ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০১৯ ০৯:২৫

গণফোরামের সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খানের পর বিএনপির জাহিদুর রহমানও (ঠাকুরগাঁও-৩) একই পথে হাঁটলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্য হিসেবে জাহিদ শপথ নিলেন। এর মাধ্যমে মাসখানেক ধরে চলা নানা আলোচনা ও গুঞ্জন সত্যি হলো। বিএনপি মহাসচিব ছাড়া বাকি চারজনও শপথ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল বিএনপি।

এ ব্যাপারে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে শনিবার ডাকা হয়েছে স্থায়ী কমিটির বৈঠক। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জাহিদের শপথ বাকিদের উৎসাহিত করতে পারে বলে জ্যেষ্ঠ নেতাদের ধারণা। একটি সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে অন্তত দুজন গতকাল সংসদ ভবনে গিয়ে শপথের বিষয়ে কথা বলেন। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চিন্তা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই পথে হাঁটবেন না।

আমাদের সময়কেও তিনি বলেছেন, তার শপথ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যিনি শপথ নিয়েছেন তিনি প্রতারণা করেছেন। দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহিদের শপথের পরই তারা অন্য নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। দল চাইছে জাহিদ শপথ নিলেও বাকিদের আপাতত ‘বিরত’ রাখা। তা না হলে সময়ের আবেদন করে হলেও ‘সময়ক্ষেপণ’ করা।

সংবিধান মতে, কোনো সংসদ সদস্য শপথের জন্য সময়ের আবেদন করলে স্পিকার চাইলে তা মঞ্জুর করতে পারেন। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোটের ওই ফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেও তা উপেক্ষা করে গণফোরামের সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান এর আগে শপথ নেন। এর বিরুদ্ধে ব্যাপক সরব ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। গতকাল জাহিদ শপথ নেওয়ার পর কয়েকজন নেতা দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে স্কাইপে কথাও বলেন। এর পরই শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে। তাকে বন্দি রেখে কোনো দর কষাকষি ছাড়াই এমপিদের শপথগ্রহণের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়নি। তারা শপথ না নিয়ে সময়ের আবেদন করলেও সরকারে সঙ্গে দর কষাকষির একটি সুযোগ থাকত। অবশ্য নববর্ষের শুভেচ্ছাবিনিময় করতে যাওয়া বিএনপি নেতাদের খালেদা জিয়া স্পষ্ট করেই বলেছেন, শপথ নয়, প্যারোলও চাইবেন না। মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে একই সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলের এমন সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ৬ এমপির মধ্যে জাহিদ প্রথম শপথ নিলেন।

জানা গেছে, বিএনপি নীতিনির্ধারকদের ধারণা, আগামী দু-একদিনের মধ্যে আরও কয়েকজন শপথ নিতে পারেন। তাই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি একসঙ্গে করবেন। এ জন্য শনিবার পর্যন্ত বিএনপি দেখতে চাইছে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে দাঁড়ায়। এদিকে শপথ নেওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহিদুর রহমান বলেছেন, সংসদে গিয়ে নেত্রীর মুক্তি দাবি করবেন। বহিষ্কার হবেন জেনেই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে শপথ নিয়েছেন।

তার ভাষায়, ‘দল বহিষ্কার করলে করুক। আমি তো আর দলকে ছেড়ে যাচ্ছি না। আমি দলের সঙ্গেই থাকব। ৩৮ বছর ধরেই তো আছি। সুতরাং আমি এই দলেরই লোক।’ এদিকে জাহিদুরের শপথের খবরে নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো নেতাকর্মী বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে কটাক্ষ করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এরই মধ্যে দুুপুরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়। তাকে উদ্দেশ করে নেতাকর্মীরা বলতে থাকেন, ‘দাদা, কোনো দালাল দলে থাকতে পারবে না।’

আগে থেকেই কার্যালয়ে ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। পরে তারা মহাসচিবের কক্ষে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। পরে বিকালে এ নিয়ে ওই তিন নেতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে স্কাইপের মাধ্যমে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জানতে চাইলে গয়েশ্বর রায় আমাদের সময়কে বলেন, আগামী শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হবে, সেখানে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। অবশ্য হারুনুর রশিদ, আমিনুল ইসলাম, উকিল আবদুস সাত্তার ও মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, কেউ যাতে শপথ না নেয়, দলীয় কার্যালয় ডেকে তাদের দলের সিদ্ধান্ত অফিসিয়ালি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই দলের সিদ্ধান্ত জানেন। এই চার এমপির বক্তব্য প্রায় অভিন্ন। তারা মনে করেন, এখনো সময় আছে। দল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন বলে তারা মনে করেন।

জানা গেছে, চার এমপির পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তারা সবাই শপথগ্রহণে আগ্রহী এবং তা দলের মহাসচিবকে একাধিকবার জানিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ থেকে নির্বাচিত মো. হারুনুর রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, আশা করি দল তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে। আমি এখনো সেই অপেক্ষায় আছি। দল যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে সে ক্ষেত্রে এখনো সময় আছে। তবে যিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নিয়েছেন, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি হবে না, এটা দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিদ্ধান্ত দেবে।

এ ব্যাপারে আমার বলার কিছুই নেই। ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. তৈমুর রহমান আমাদের সময় বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জাহিদুল ইসলামের (ঠাকুরগাঁও-৩) শপথ-এটা দলের সঙ্গে বেইমানি করা। জেলার সহসভাপতি ও পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুলকে দু-এক দিনের মধ্যে জেলা কমিটির বৈঠক ডেকে বহিষ্কার করার কথা জানান তৈমুর।

তিনি আরও বলেন, শপথ নেওয়ার ব্যাপারে এলাকার জনগণের দিক থেকে জাহিদের ওপর কোনো চাপ নেই। পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম জিয়া বলেন, আমরা সর্বস্তরের দলীয় নেতাকর্মী তাকে প্রত্যাখ্যান করছি। কেউ এটা মেনে নিতে পারছেন না। দলের সবাই এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। আমি মনে করি, ব্যক্তিস্বার্থে জাহিদ শপথ নিয়েছেন। সরকারের সঙ্গে আঁতাত রয়েছে কিনা সন্দেহ হয়। মো. হারুনুর রশিদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩) এবং মো. আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২) থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন।

তারা বলেন, শপথ নেওয়ার ব্যাপারে তাদের ওপর স্থানীয় জনগণের চাপ রয়েছে। তবে তাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ওই এলাকার নেতাকর্মীরা। জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের গোমস্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাইরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, তাদের ওপর এলাকার জনগণের কোনো চাপই নেই। তারা যদি শপথ নেন সেটা ব্যক্তিগত স্বার্থে নিতে পারেন; বরং যদি শপথ নেন এলাকায় তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে। বগুড়া-৪ থেকে নির্বাচিত মোশারফ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে তিনি যাবেন না।

শপথের পর যা বললেন জাহিদ : জাহিদুর রহমান বলেন, দল বহিষ্কার করলে করুক। আমি তো আর দলকে ছেড়ে যাচ্ছি না। তিনি জানান, ‘মহাসচিব ছাড়া দলের বাকি সদস্যরাও শপথ নিতে পারেন। দেখি তারা আসেন কিনা। এলে একসঙ্গে যোগ দেব। বিএনপির এই সাংসদ বলেন, ‘জন্মের পর থেকে এই আসনে বিএনপি কখনো জেতেনি। ১৯৯১ সাল থেকেই আমি নির্বাচন করে যাচ্ছি। সংসদ নির্বাচন করেছি মোট চারবার।

তাই এলাকার ৯৫ শতাংশ মানুষ আমার শপথ নেওয়ার পক্ষে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই আসনে কখনো বিএনপি জেতেনি। অর্থাৎ ধানের শীষের জন্মের পর আমিই প্রথম জিতলাম। জাহিদুর রহমান বলেন, ‘এমনিতে আমার আর নির্বাচন করার ইচ্ছা নেই। আমি ক্লান্ত। ১৯৯১ সাল থেকেই তো নির্বাচন করে যাচ্ছি। চারবার সংসদ নির্বাচন এবং একবার পৌর নির্বাচন। বাপের টাকায় রাজনীতি করি। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা আছে। মামলা চালানোর টাকা তো দল দেয় না। আমাদেরই দিতে হয়।

শপথ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জাহিদুর রহমান বলেন, আমি মনে করি শপথ নেওয়া উচিত। কারণ আমাদের নেত্রী কারাগারে। তিনি অসুস্থ। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা চলছে, তারা জেলে আছে। বাইরে থেকে কিছুই হচ্ছে না। সুতরাং বাইরে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে ভেতরেই যাই, অন্তত চিৎকার করে কথা তো বলতে পারব।’

বিএনপির নেতারা আপনাকে গণদুশমন বলে আখ্যায়িত করেছে। এ বিষয়ে জাহিদুর রহমান বলেন, ‘কয়েক দিন আগে দলের মহাসচিব আমাদের পাঁচজন নির্বাচিত সাংসদকে ডেকেছিলেন। তিনি শপথ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এসে সংসদে যোগ দিয়েছি। সুতরাং এ কথা তারা বলতেই পারেন। আরও বলবেন। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।