advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভারতের নির্বাচনী বাগ্যুদ্ধ

অমিত গোস্বামী
২৬ এপ্রিল ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০১৯ ২৩:৩১
ভারতের লোকসভা নির্বাচন এখন অর্ধেক সমাপ্ত। বাকিটা শেষ হবে ১৯ মে। ফল ২৩ মে। ভারত দেশ হিসেবে অনন্য। কারণ এই দেশ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের লালনকারী দেশ। কাজেই এ দেশের নির্বাচনে বাগযুদ্ধ যে চূড়ান্ত পর্যায়ে চড়বে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতে বাকস্বাধীনতা প্রবলভাবে বিদ্যমান। যাকে যা খুশি বলা যায়। কিন্তু এবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে তুমুল তরজায় নেমেছে, তা ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছে বারবার। এবার নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি নেমেছে তাদের গড় রক্ষায়। বিরোধীরা নেমেছে সেই দুর্গ চূর্ণ করতে। কাজেই কথার খেলা চলছে তুমুল বিক্রমে। সেই বাক্যবাণের প্রচারে চ্যানেলগুলো টিআরপি বাড়িয়ে নিচ্ছে চড়চড় করে। সাধারণ নির্বাচনে বাগযুদ্ধ থাকবেই। চলবে পারস্পরিক দোষারোপ। বিশ্বের সর্বত্র এমনটা হয়ে থাকে। রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য বিভেদ ও হিংসার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এই নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ। পুলওয়ামাকা- এবং পরবর্তী সার্জিকাল স্ট্রাইকের পটভূমিতে পোডিয়ামে উঠে সবাইকে চমকে দিয়ে ডায়ালগ ছুড়ে দিলেন নরেন্দ্র মোদিÑ ‘হাও ইজ দ্য জোশ?’ শ্রোতার মধ্যে থেকে সমস্বরে উত্তর এলোÑ ‘হাই স্যার!’ আনকোরা নন তিনি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি ডিজিটালি সাউন্ড। এ কথা এখন ছোট্ট শিশুরও আর অজানা নেই। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এককাট্টা ভারতীয়ের আবেগ এই জোশ। সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের সমবেত দাবিতে আসমুদ্রহিমাচলের জোশ উচ্চাঙ্গমাত্রায়? ভারতে পাকিস্তানবিরোধী সুপ্ত আক্রোশকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে রাজনৈতিক ফলের আশায়। বিরোধীরা প্রতিবাদে নামলেন। এ কী! সেনা অভিযান নিয়ে রাজনীতি? রাহুল গান্ধী বলেন, ‘মনমোহন সিংহের আমলেও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর কথা মেনে তা গোপন রাখা হয়। এখন তো সেই বিধিনিষেধের তোয়াক্কাই করা হয় না। তাই সেনাবাহিনীর কাজকর্মের মধ্যে ঢুকে পড়তেও বাকি রাখেননি মোদি। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সিদ্ধান্ত শুধুই সেনাবাহিনীর। কিন্তু তিনি সেটিকে নিজেদের রাজনৈতিক সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন।’ বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের জন্য নিজেকে দেশের ‘চৌকিদার’ বলে উল্লেখ করে থাকেন মোদি। টুইটার অ্যাকাউন্টে তার নাম ‘চৌকিদার নরেন্দ্র মোদি’। দুর্নীতির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীকে লাগাতার আক্রমণ করে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী এর আগে যে ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ সেøাগান তোলা শুরু করেছিলেন, এখন তা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের জন্য প্রতিটি সভাতেই তিনি ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, চৌকিদার চোর হ্যায়’ সেøাগানেই বিঁধছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। তবে নাম না করে। এবারের ইস্যু যুদ্ধবিমান রাফায়েল। রাহুল গান্ধীকে এক সময় ‘পাপ্পু’ বলে সম্বোধন করে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। শেষে নেগেটিভ পাবলিসিটির সাহায্য নিয়ে নিজেকে বারবার পাপ্পু বলে সেই ট্যাগ অনেকটাই ওঠাতে সক্ষম হয়েছেন রাহুল গান্ধী। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে বিজেপির পছন্দের অনিল আম্বানির সংস্থা রিলায়েন্সকে ৩০ হাজার কোটি টাকার সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে মোদি সরকার। কাজেই ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। প্রিয়ংকা গান্ধীকে এবার পূর্ব-উত্তরপ্রদেশের দায়িত্ব দিয়েছে কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় জলসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘প্রিয়াংকা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবেন না। কারণ তার স্বামী চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত। রাজ্যের মানুষ একজন চোরের বউকে যেভাবে দেখে, তাকেও সেভাবে দেখবে।’ এবার বেগুসরাই থেকে লড়ছেন সিপিআইয়ের কানহাইয়া কুমার। জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাবেক সভাপতি। তিনি যখন কথা বলছেন, তখন মুগ্ধ হয়ে শুনছে শ্রোতা। পুরো ময়দান হাততালিতে ফেটে পড়ছে। তাকে ঘিরে সই শিকারিদের ভিড়, সেলফি তোলার হিড়িকও চোখে পড়ার মতো। চোখা চোখা বাক্যবাণে তুলাধুনা করছেন নরেন্দ্র মোদিকে তার দেশীয় উচ্চারণে। তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ঠিক ভোটের আগে কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। স্বভাবতই লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তিন বছর আগের ঘটনার চার্জশিট জমা দেওয়ার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আদালতে কী হবে, সেটি ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু শাসক দল তাকে দেগে দিতে চাইছে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে। আর কানাহাইয়া কুমারের প্রত্যুত্তরÑ ‘রাম নেহি, ও নাথুরাম হ্যায়’। প্রঙ্গত নাথুরাম গডসে হত্যা করেছিলেন মহাত্মা গান্ধীকে। নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দিনেই শিলিগুড়ি সভামঞ্চ থেকেই নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আপনাদের উন্নয়নের স্পিডব্রেকার হচ্ছেন দিদি। বালাকোটে ঘরে ঢুকে জঙ্গিদের মারা হয়েছে। চোট ওখানে লেগেছে, তোমাদের ব্যথা হচ্ছে কেন? কলকাতায় বসে দিদির যতটা ব্যথা হয়েছে, এতটা ইসলামাবাদ বা লাহোরের হয়নি।’ এর উত্তরে দিনহাটার সভায় মমতা বলেনÑ ‘মোদিবাবু, আপনার চেয়ার টলোমলো। মিথ্যা কথা বলতে এমন ওস্তাদ কোনো লোক আগে কখনো দেখিনি। গায়ের জোরে মিথ্যা বলেছেন এক্সপায়ারিবাবু প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদ এক্সপায়ার করে গেছে।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে দিনপাঁচেক আগে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন নরেন্দ্র মোদিÑ ‘চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্ত হলে আপনার এত ভয় কেন?’ মোদি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো মুখ্যমন্ত্রী প্রতারক-লুটেরাদের বাঁচাতে দিনদুপুরে ধর্নায় বসেছেন। আপ তো চোরো কা রানি।’ এর উত্তরে রায়গঞ্জের সভায় মোদির তীব্র সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি নিজের প্রচার ছাড়া কিছু করেন না। নিজের নামে সিনেমা বানিয়েছেন। নিজের নামে দোকান বানিয়েছেন। এই ধরনের দুর্যোধন, দুঃশাসনের মন্ত্রিসভা আগে কখনো হয়নি ভারতবর্ষে। ফ্যাসিবাদের সম্রাট। ফ্যাসিবাদী সম্রাট। হিটলার বেঁচে থাকলে আজ লজ্জায় গলায় দড়ি, কলসি নিয়ে আত্মহত্যা করতেন।’ দিনদুয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘এ দিদিই নাগরিকত্ব বিল নিয়ে ভুল বোঝাচ্ছেন রাজ্যবাসীকে। এ জন্য সোচ্চার হয়েছে বাংলার মানুষ। তাই এবার আর ইতিহাস ক্ষমা করবে না স্পিডব্রেকার দিদিকে। এ কারণে বলছি, এখন দিদির দলে শুধু আছেন জগাই-মাধাইরা।’ এর জবাব দিয়ে তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্ক হয়। তিনি হারাতঙ্কে ভুগছেন আর রোজ ভুলভাল বকছেন। এখানে এলে মোদিকে সরপুরিয়া দেব। কাঁচাগোল্লা দেব। মিহিদানা দেব। আমরা অতিথি এলে খাওয়াই। কিন্তু ভোট দেব না। আপনারাও ভোট দেবেন না।’ গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গকে সোনার বাংলা করতে হলে আগে সেখান থেকে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের বের করতে হবে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে হিন্দু, খ্রিস্টান, জৈন ধর্মের মানুষকে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হবে।’ এটি সরাসরি সাম্প্রদায়িক উসকানি। জবাবে মমতা বলেন, ‘শুনে রাখুন, এখানে এনআরসি করতে দেব না।’ এবার ভোটে নারীদের সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করতে ছাড়ছেন না অনেক পুরুষ নেতা। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াংকা গান্ধীকে ‘স্কার্টওয়ালি বাই’ বলে কটাক্ষ করেছেন বিজেপি নেতা জয়করন গুপ্তা। উত্তরপ্রদেশের মিরাটে এক নির্বাচনী সভায় তিনি বলেন, ‘কংগ্রেসের এক নেতা আসছে দিন তো দেখতেই পাচ্ছেন না। স্কার্টওয়ালি বাই শাড়ি পরে মন্দিরে যাচ্ছেন। গঙ্গার প্রতি সম্মান দেখাচ্ছেন।’ ভারতের বহুজন সমাজ পার্টির নেতা মায়াবতীকে উদ্দেশ করে ক্ষমতাসীন বিজেপির এক বিধায়ক বলেছেন, ‘তিনি (মায়াবতী) নারী, না পুরুষÑ বোঝা মুশকিল।’ আর যিনি এমন কথা বলেছেন, তিনিও নারী। তার নাম সাধনা সিংহ। তিনি আরও বলেছেন, ‘ওর কার্যত শ্লীলতাহানি করা হয়েছিল। যেমনÑ ইতিহাসে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ হয়েছিল।’ উত্তরপ্রদেশের সাবেক মন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রভাবশালী নেতা আজম খানের অশালীন মন্তব্যের জেরে তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দেশটির জাতীয় মহিলা কমিশন। একটি নির্বাচনী জনসভায় আজম খান বিজেপি প্রার্থী অভিনেত্রী জয়াপ্রদাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘আমি ওনাকে রামপুরে নিয়ে এসেছিলাম। আপনারা সাক্ষী আছেন, আমি কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দিইনি। আপনাদের তার প্রকৃত রূপ চিনতে ১৭ বছর লেগে গেল। কিন্তু আমি ১৭ দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম, তিনি খাকি অন্তর্বাস পরেন।’ বিজেপি জয়াপ্রদার প্রার্থী ঘোষণার পরই তাকে ‘নাচনেওয়ালি’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন আজম। সেই বিষয়টি উল্লেখ করে একটি জনসভায় কেঁদেও ফেলেছিলেন জয়াপ্রদা। জম্মু-কাশ্মীরের রাজনীতিকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আটকাতে সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টে একটি মামলা করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে টুইটারে পিডিপি নেত্রী লিখেছিলেন, ‘আদালতে সময় নষ্ট করছেন কেন? বিজেপি ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিক। তারপর তো নিজে থেকেই আমাদের ভোটে দাঁড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ তখন ভারতীয় সংবিধান তো আর জম্মু-কাশ্মীরের ওপর কার্যকর থাকবে না।’ মেহবুবার এই টুইটের জবাবে সদ্য বিজেপিতে যোগ দেওয়া ক্রিকেটার গৌতম গম্ভীর লেখেন, ‘এটি ভারত। আপনার মতো কোনো দাগ নয়Ñ যা মুছে যাবে।’ জবাবে মুফতি লেখেন, ‘আশা করি, আপনার রাজনৈতিক ইনিংস ক্রিকেটের ক্যারিয়ারের মতো জঘন্য হবে না।’ জবাবে মেহবুবাকে ‘ক্যালাস’ নারী বলে কটাক্ষ করেন গম্ভীর। নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারতীয় রাজনীতি যে ভাষাসন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে, তা ভারতীয় কৃষ্টির সঙ্গে মানানসই নয়। এই খিস্তিখেউড় কোনো প্রজন্মই ভালোভাবে নিচ্ছে না। ফলে ঝড় উঠছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভারতের ধামাধরা সংবাদমাধ্যম এই হুজুগে সাড়া দিতে গিয়ে নিজেদের আস্থা হারাচ্ছে পাঠক-দর্শকের কাছে। তাই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও সংযত হওয়ার সময় এসেছে। য় অমিত গোস্বামী : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক