advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আগামীর বই ই-বুক

সাঈদ হাসান মোহাম্মদ মনির
৪ মে ২০১৯ ২২:০৭ | আপডেট: ৪ মে ২০১৯ ২২:১০
advertisement

যখন মুদ্রণ প্রযুক্তি ছিল না তখনো প্রকাশনা ছিল, ভবিষ্যতে মুদ্রণের প্রয়োজনীয়তা কমে গেলেও প্রকাশনা থাকবে। আধুনিক ছাপাখানা যা আমরা আজকাল ব্যবহার করছি সেই ধারার যন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় বর্তমান জার্মানিতে গুটেনবার্গের হাত ধরে। ছাপাখানার জন্মের সঙ্গে কি প্রকাশনার জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই।

মুদ্রণ প্রযুক্তি ও ছাপাখানা আধুনিকায়নের ফলে প্রকাশনা শিল্পে গতির সঞ্চার হয়েছে। মানব সভ্যতার সর্বপ্রথম লেখা গ্রন্থ গিলগামেশ মহাকাব্য (Epic of Gilgamesh) যা আক্কাডিয়ান ভাষায় লেখা হয়েছিল। মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরান, ইরাক, সিরিয়া এবং সৌদি আরব অঞ্চল) প্রাচীন সুমেরিয় সভ্যতা থেকেই লিপির আবিষ্কার হয়েছে বলে ধরা হয়। মানব সভ্যতার প্রথম সাহিত্য কর্ম ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ তাদেরই রচনা। গিলগামেশ মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র গিলগামেশ উরুক শহরের রাজা ছিলেন যিনি তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে শহরকে রক্ষা করেন।

এক সময় কাদামাটির বুকে পাথরে দাগ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করত মানুষ। এ পদ্ধতিকে বলা হতো কিলক লিখন পদ্ধতি। তারপর অনেক চেষ্টা ও সাধনার পর চীনে উদ্ভাবিত হয় কাগজ। মুদ্রণযন্ত্র আবিস্কারের আগে কাগজে লিখে ও ব্লক মুদ্রণ পদ্ধতিতে মানুষই প্রকাশনার কাজ করত।   মুদ্রণযন্ত্রও আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে কাগজের বুকে মুদ্রিত অক্ষর সাজিয়ে মানুষ তৈরি করল বই। আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তি আবিষ্কারের পরে কেউ কি পাথরে লেখে, মাটির ফলকে লেখে, প্যাপিরাসে লিখে প্রকাশনার করেছে? করেনি। কারণ নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হয় পুরোনো প্রযুক্তির অসামঞ্জস্য বা অসুবিধা দূর করার জন্য। আমরা চাইলেও বেশি দিন পুরোনোকে আকড়ে ধরে রাখতে পারব না। কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করার পদ্ধতি আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত মনোটাইপ, ইস্টার্ন টাইপ এবং টাইপ রাইটারের মাধ্যমে মুদ্রণ ও প্রকাশনার কাজ চলত। ১৯৯০-এর শেষের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইন্টারনেট-অনলাইনে সংবাপত্র ও সাময়িকীর প্রকাশ বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। 

কম্পিউটারের জন্মের পর অনেক জায়গা থেকেই মুদ্রিত সামগ্রীকে হটিয়ে দিয়েছে কম্পিউটার। এরপর ইন্টারনেটের আবির্ভাবের ফলে কম্পিউটারের ক্ষমতা বাড়লেও সেটি বই কিংবা কাগজকে এখনো পুরোপুরি হটিয়ে দিতে পারেনি। বর্তমানে বইয়ের আধুনিক রুপ হলো ই-বুক বা ইলেকট্রনিক বই। এটি একই সঙ্গে দেখতে ও পড়তে বইয়ের মতো, তার বুকে কালো কালো অক্ষরগুলো সাজানো। সে অক্ষর দেখা যাচ্ছে কম্পিউটারের মতো দেখতে একটা স্ক্রিনে।

‘কিন্ডল’ নামের নতুন ই-বুক প্রথম দফায় আমাজন যতগুলো বাজারে ছেড়েছিল মুহূর্তের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই ই-বুকটির এমন সাফল্য কাগজের বইকে হুমকির মুখে ফেলেছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে ইতিমধ্যে মুদ্রিত বইয়ের বিকল্প হিসেবে ই-বুকের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েই চলছে। এটি ইলেকট্রিক ডিভাইস হওয়ায় এমন সব সুবিধা পাওয়া যাবে যেটি সাধারণ একটি বই দিতে পারবে না। যেমন, এর ফন্টের আকার ইচ্ছে করলেই বাড়ানো কিংবা কমানো সম্ভব। আবার এতে থাকে একটি বিল্ট-ইন-ডিকশনারি, ফলে বইয়ের কোনো শব্দের মানে না বুঝলে সঙ্গে সঙ্গে এর মানে জেনে নেওয়া যায়।

ই-বুকের প্রসারে বইয়ের প্রকাশকরাও বসে নেই। তারাও বুঝতে পেরেছেন আগামীতে ব্যবসা ধরে রাখতে হলে তাদের বইকে ডিজিটালে রূপ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর তাই তারাও এখন উঠেপড়ে লেগেছেন বইকে ডিজিটাল করার কাজে। ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ বইকে ডিজিটালে রূপ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ই-বুকের ক্ষেত্রে কপিরাইটের যথার্থ প্রয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই প্রকাশনা সংস্থা এখন তাদের নতুন প্রকাশিত বইগুলোর ক্ষেত্রে মুদ্রিত এবং ডিজিটাল উভয় সংস্করণেরই কপিরাইট করিয়ে নিচ্ছেন। ডিজিটালে রূপায়িত এই বইগুলো বিক্রি করা হয় ই-বুক রিডার ব্যবহারকারীদের কাছে। ছাপনো বই নিয়ে তো সব সময় চলা যায় না, কিন্তু ই-বুক যেকোনো জায়গায় সহজে বহন করা যায়, ছোট্ট একটি ডিভাইসে লাখ লাখ বই পকেটে নিয়ে ঘোরা যায়। বর্তমানে ই-বুকের জন্য পিডিএফ, ইপাব, মোবি ফরম্যাটই বেশি জনপ্রিয়। ই-বুকের জন্য অনেক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট রয়েছে। এছাড়া গুগল তো আছেই। যেকোনো বইয়ের নাম লিখে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন বইটি। বাংলাদেশের বেশ কিছু ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখকদের বই বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব বইয়ের পিডিএফ ভার্সন অর্থাৎ ই-বুক ভার্সন পাওয়া যায়। ইসলামী ফাউন্ডেশন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানের বই ই-বুক ভার্সনে পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও সামপ্রতিক সময়ে অনলাইন ই-বুক প্রকাশনার যাত্রা শুরু হয়েছে। ‘একুশে ই-বুক’, ‘বই ঘর, ‘সেই ডটকম  বই’, ‘গ্রিন নেট পাবলিশার’  উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ই-বুক প্রকাশ করছে।

গত কয়েক বছর ধরে, ডিজিটাল ই-বুক প্রকাশনী স্বনির্ভর লেখকদের জন্য তাদের বই অনলাইনে বিক্রি করা অনেক সহজ করে দিয়েছে। এটি স্ব-প্রকাশিত ই-বুকের প্রতি অনুসারীও সৃষ্টি করেছে, অনেক পাঠকই কম খরচে বই ডাউনলোড করছে পছন্দ করেন, কাজেই এটি ডিজিটাল প্রকাশনীতে বিপ্লব সৃষ্টিতে সাহায্য করছে। পৃথিবীর বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলো এখন কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক ও অডিও বুক প্রকাশ করে। বড় বড় সংবাদপত্রগুলো মুদ্রিত সংস্করনের পাশাপাশি অনলাইন সংস্করন বের করে। বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রায় সব পত্রিকার অনলাইন সংস্করন আছে। এছাড়াও অনেক পত্রিকা শুধুমাত্র অনলাইন সংস্করনই বের করে।

পৃথিবীতে গড়ে প্রতিদিন আট হাজারের অধিক কাগজের বই বের হলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ২০%- ২৫% হারে ই-বুকের পাঠক বাড়ছে। এই শতকের শুরু থেকে কর্পোরেট দুনিয়া পেপার-লেস কিংবা কাগজীয় বিষয়াটি থেকে ক্রমেই বেড়িয়ে আসছে। ‘পোপারলেস অফিস’ ধারণাটি ক্রমেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ই-বুক বইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয় ছড়িয়ে পড়বে বইয়ের প্রতিনিধি হিসেবে সারা পৃথিবীতে।

লেখক : সাঈদ হাসান মোহাম্মদ মনির; খন্ডকালীন শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল প্রফেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (দিপ্তি)।