advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

২ লাখ ৬৮ হাজার টাকার জন্য এত কিছু...?

জাকির হোসেন তমাল
৮ মে ২০১৯ ১৭:০৬ | আপডেট: ৮ মে ২০১৯ ২৩:৫৬
রামেক হাসপাতালের বেডে ছাত্রলীগ নেতা কানন (বাঁয়ে) ও তার দুই হাতের এক্সরে রিপোর্টের ছবি
advertisement

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেই প্রাণটা জুড়ে যায়। সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসটির শীতল ছায়া সব সময় সাবেকদের টানে। কিন্তু মাঝে মাঝে সেই সবুজ ক্যাম্পাসটি ঘিরে এমন কিছু সংবাদ গণমাধ্যমে আসে, যার কারণে সেই সবুজ অর্থহীন হয়ে পরে।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এই ক্যাম্পাসটি আম-লিচুতে ভরে যায়। সেই আম-লিচু চোখের সামনেই বড় হতে দেখেন শিক্ষার্থীরা। যখন সেই আম-লিচু খাওয়ার উপযোগী হয়, তখন সেটি পেড়ে নিয়ে যান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শিক্ষার্থীদের মুখে সেই ফল ওঠে না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই ফল বিক্রি করে দেয়। সেই ফলের মালিক শিক্ষার্থীরা হলেও তারা সেটি খেতে পারেন না। স্থানীয়দের কাছে সামান্য কিছু টাকার লোভে সেই আম-লিচু প্রতি বছর বিক্রি করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা নিজের ক্যাম্পাস থেকে দু-একটি ফল খেতে গেলে শুরু দ্বন্দ্ব। এমনকি সেটা মারামারি পর্যন্ত গড়ায়।

মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পেছনে লিচু খেতে গিয়ে স্থানীয়দের কাছে মারধরের শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত সাতজন ছাত্র। তাদের আরেকটি পরিচয় রয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়দের হামলায় তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান কাননের দুই হাত-ই ভেঙে গেছে। তিনি বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসানও রামেকে চিকিৎসাধীন। অন্য পাঁচজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

সামান্য টাকার জন্য ফল বিক্রি  

বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকল্প থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চলতি বছর ক্যাম্পাসের চারটি অংশের গাছের ফল ইজারা দেওয়া হয়েছে। চারটি অংশ থেকে পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৭০ হাজার, ৩০ হাজার, এক লাখ ৫১ হাজার ৯৯৯ ও ১৬ হাজার ৫০ টাকা। সবমিলিয়ে এই টাকার পরিমাণ মাত্র ২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ টাকা। তবে আরও তিনটি অংশ ইজারার জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সেটি কেউ ইজারা নেয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের চারপাশের গাছ, শহীদুল্লাহ ও মমতাজউদ্দিন কলাভবন এলাকার গাছগুলো এবার ইউজারা দেওয়া হয়নি।    

লিচু খেতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই নেতাকে যেভাবে পেটানো হয়েছে, এর দায় কে নেবে? একজনের দুই হাত ভেঙে দেওয়া হলো। কী নির্মম ঘটনা। সামান্য ফল খেতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পেটানো হচ্ছে, এই নির্মমতার জন্য দায়ী কে? নিশ্চয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর দায় কোনোভাবেই তারা এড়াতে পারেন না।

কিন্তু এই সামান্য আড়াই লাখ টাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছের ফল ইজারা দিতে হবে কেন? যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এতই টাকার প্রয়োজন হয় তাহলে একটি তহবিল গঠন করুন। আমরা সাবেক শিক্ষার্থীরা সেই তহবিলে টাকা জমা দেব। আশা করছি, সেই আড়াই লাখ টাকার চেয়ে অনেক বেশি টাকা জমবে সেই তহবিলে। আর এতে যদি লজ্জা পান, তাহলে গাছের ফল বিক্রি করা বন্ধ করুন। শিক্ষার্থীদের অধিকার আছে সেই ফল খাওয়ার। সেই ফল খেতে গিয়ে মঙ্গলবার রাতে যারা শিক্ষার্থীদের পেটালেন, তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসুন। তাদেরকে বিচার করে প্রমাণ করুন, বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের পক্ষে। নয়তো আমরা ভেবে নেব, এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অজানা ছায়া কাজ করছে।

কার মদদে শিক্ষার্থীদেরকে মারধর?

আম বা লিচু খেতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধরের এমন ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নয়। প্রতি বছরই ক্যাম্পাসটিতে অনেক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয় এভাবে নিজেদের বাগানের ফল খেতে গিয়ে। আমরা যখন ক্যাম্পাসে ছিলাম (২০১১-২০১৬), তখনও অনেক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হতো এই আম-লিচু খেতে গিয়ে। তবে এতটা ভয়াবহ হামলা হতো না। এভাবে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়া বোধহয় নতুন ঘটনা।  

নিজের ক্যাম্পাসের ফল খেতে গিয়ে বারবার মারধরের ঘটনা ঘটলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। উল্টো শিক্ষার্থীদের ঘারে দোষ চাপায় প্রশাসন। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসির বাসভবনের সামনে ফল খেতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে থানায় পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। প্রো-ভিসির নির্দেশেই নাকি সেটি করা হয়েছিল। পরে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। 

কাজেই বিষয়টি খুব পরিষ্কার যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায় না ক্যাম্পাসের ফল শিক্ষার্থীরা খাক। অথচ বিষয়টি উল্টো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সামান্য কিছু টাকার জন্য শিক্ষার্থীদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে স্থানীয়দের। সেই লেলিয়ে দেওয়া স্থানীয় ব্যক্তিরাই এখন শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। হাত-পা ভেঙে দিচ্ছে।

ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের, ফল তারাই খাবে...

শিক্ষার্থী ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় অর্থহীন। শিক্ষার্থীরা আছেন বলেই আজ আপনারা ভিসি, প্রো-ভিসি। নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক ভাবা বর্তমান প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা এক সময় এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ছিলেন। তখনকার কথা হয়তো তারা এখন ভুলে গেছেন, তাই শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। শিক্ষার্থীরা না থাকলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব থাকবে না; কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী থাকবে না। এই চরম সত্যটা ভুলে না যাওয়াই মঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য।       

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল খাওয়ার অধিকার অবশ্যই শিক্ষার্থীদের রয়েছে। তারা এই ফল খাবেন, এটাই স্বাভাবিক। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই ফল অন্যদের কাছে বিক্রি করে অপরাধ করেছে। তাদের সেই পথ থেকে বের হয়ে আসা উচিত।

জাকির হোসেন তমাল : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও সাংবাদিক