advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘সকাল হওয়ার পর দেখি ১৪-১৫ জন বেঁচে আছি’

অনলাইন ডেস্ক
১৩ মে ২০১৯ ১৭:৫২ | আপডেট: ১৩ মে ২০১৯ ১৭:৫৩
advertisement
advertisement

লিবিয়া থেকে ইউরোপ প্রবেশে প্রতিনিয়ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবে প্রাণহানি ঘটছে বহু মানুষের। তবুও থেমে নেই এ যাত্রা।

গত ১০ এপ্রিল ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টায় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবে ৬৫ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি বলে জানিয়েছে বিবিসি। ভয়াবহ এ ঘটনায় বেঁচে গেছেন ১৬ জন। যাদেরকে বর্তমানে রাখা হয়েছে তিউনিসিয়ার উপকূলীয় শহর- জারজিসের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে।

তবে যে ১৬ জন এ ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ এক জীবন সংগ্রামের গল্প। ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রতারকচক্রের মাধ্যমে সাগর পাড়ি দেওয়া এসব বাংলাদেশিদের এ পথে পাড়ি দেওয়ায় শিউরে ওঠার মতো গল্প।

বিবিসির একজন সংবাদদাতা তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন কর্মকর্তা মঞ্জি স্লেমের মাধ্যমে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। টেলিফোনে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা দুজন বাংলাদেশি বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা। তাদের একজন সিলেটের সিজুর আহম্মেদ।

সিজুর আহম্মেদ বলেন, ‘ঢাকা থেকে দুবাই। দুবাই থেকে ত্রিপলি। ছয় মাস আগে যাত্রা শুরু করি। দালাল ধরে আসি। দালাল বলেছিল যে, লিবিয়া থেকে লোকজন আবার ইটালি যাচ্ছে, তুমি কি যেতে চাও? বলেছিল, ওখানে লাইফ অনেক ভালো। আমি জমি বন্ধক রেখে সাত লাখ টাকা জোগাড় করে এখানে আসি। আমার সঙ্গে আমার মামাতো ভাই এবং খালাতো ভাইও ছিল। ওরা সাগরে মারা গেছে আমার চোখের সামনে।’

সিজুর আহম্মেদ বলেন, ‘আমি দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলাম। সেখান থেকে বাংলাদেশে এসে বেকার হয়ে পড়ি। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকতে চাইনি। একদিন আমার চোখের সামনে আমার সামনের দোকানের লোককে মেরে ফেলা হল। ওর দোকানের মাল লুটপাট করে নিয়ে গেল। ভয়ে চলে আসলাম। লাইফে অনেক রিস্ক।’

প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি আহমেদ বিলাল। সাগরপথে ভয়ংকর এই অভিজ্ঞতার কথা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সাগর পাড়ি দিতে যে কোনো ঝুঁকি আছে, দালাল আমাদের সেটা বলে নাই। বলেছে, অনেক ভালো সুবিধা, অনেক ভালো লাইন হয়েছে। বলেছে জাহাজে করে একেবারে ইটালিতে পৌঁছে দেবে। কীসের জাহাজ? আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছে। তিন মাস রাখছে একটা রুমে, ৮২ জন বাঙ্গালি। একটা টয়লেট। আমাদের ঠিকমত খেতে দেয় না। তিনদিনে একদিন খাবার দেয়। মারধোর করে। গোসল করি নাই তিন মাস।’

আহমেদ বিলাল বলেন, ‘আমরা ছিলাম দেড়শো জন লোক। একটি মাছ ধরা ট্রলারে করে আমাদের মধ্য সাগরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ছোট নৌকায় তোলা হয়। দুইটা নৌকা ছিল। একটা নৌকা শুনেছি ইটালি চলে গেছে। একটা নৌকায় তোলা হয়েছিল ৬০ জন। আর আমাদের নৌকায় তুলেছিল ৮০ জনের ওপরে। ছোট নৌকাটি পাঁচ আঙ্গুল পানির উপর ভেসে ছিল। ঢেউ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নৌকা উল্টে গেছে। এরপর আমরা সাগরের পানিতে আট ঘণ্টা সাঁতার কেটেছি। যে নৌকাটি উল্টে যায়, সেটি ধরে আমরা ভেসে ছিলাম।’

আহমেদ বিলাল আরও বলেন, ‘আমরা যে আশিজনের মতো ছিলাম, প্রতি পাঁচ মিনিটে যেন একজন করে লোক হারিয়ে যাচ্ছিল। এভাবে একজন একজন করে অনেক লোক হারালাম। আশি জন থেকে আমরা রইলাম আর অল্প কয়েকজন। সকাল হওয়ার পর দেখলাম আমরা মাত্র ১৪-১৫ জন লোক বেঁচে আছি। তখন হঠাৎ দেখি একটা মাছ ধরার ট্রলার। আমাদের মনে হলো আল্লাহ যেন আমাদের জন্য ফেরেশতা পাঠিয়েছে। আর যদি দশ মিনিট দেরি হতো আমরা সবাই মারা যেতাম। আমাদের হাত পা আর চলছিল না। আমরা সবাই মিলে 'হেল্প, হেল্প' বলে চিৎকার করছিলাম। তারপর ওরা এসে আমাদের উদ্ধার করে। আমি এখন ভাবছি, এখান থেকে দেশে ফিরে গিয়ে কি করবো? দেশে তো অনেক টাকা-পয়সা লোকসান করে এসেছি। পরিবারকে পথে বসিয়ে এসেছি। এখন কোন মুখে দেশে যাব।’

সাগরপথে ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার মাহফুজ আহমেদ। ভয়াল সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে আহমেদ বিলাল বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে আমি রওনা দেই। বাংলাদেশ থেকে প্রথম দুবাই যাই। সেখান থেকে আম্মান। সেখান থেকে আবার যাই তুরস্ক। তারপর তুরস্ক থেকে লিবিয়ার ত্রিপলি। আমার আপন দুই ভাইও আমার সঙ্গে ছিল। আমরা দালালকে জনপ্রতি নয় লাখ টাকা করে দেই। আমার এই দুই ভাইকে বাঁচাতে পারিনি। ওরা মারা গেছে।

আহমেদ বিলাল বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারিনি এই পথে এত বিপদ। দালাল বলেছিল, মাছের জাহাজে করে সুন্দরভাবে আমাদের নিয়ে যাবে। আমরা অনেক টাকা খরচ করেছি। তিন ভাই মিলে ২৭ লাখ টাকা। জমি বিক্রি করে, আত্মীয়-স্বজনের কাছে থেকে এই টাকা জোগাড় করি। এখন তো এই ভুলের মাশুল তো আর দিতে পারবো না। এখন আমি দেশে চলে যেতে চাই। যে দালালের মাধ্যমে আমরা আসি, তাকে আগে থেকে চিনতাম না। সিলেটে সাইফুল নামে এক লোক, সে আমাদের পাঠিয়েছে। বাকি দালালরা লিবিয়ায়। এরা সবাই বাংলাদেশি। এরা লিবিয়ায় থাকে। একজন দালালের নাম রুম্মান। একজনের নাম রুবেল। আরেকজনের নাম রিপন। এদের বাড়ি নোয়াখালি। এই দালালদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাদের ক্যাম্পেও আমরা ছিলাম।’

আহমেদ বিলাল আরও বলেন, ‘সেখানে আরও শ-দেড়শো বাংলাদেশি এখনো আছে। সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, মাদারিপুর, ঢাকা-বিভিন্ন জায়গার লোক আছে সেখানে। এদের সঙ্গে আবার অন্যান্য দেশের দালালরাও ছিল। আমার ধারণা, যে পরিস্থিতির শিকার আমরা হয়েছি, কয়েক মাস পর এই বাংলাদেশিরাও সেরকম অবস্থায় পড়বে। আমি বাংলাদেশ সরকারকে এটা বলতে চাই, আমাদের যেন বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়। আমাদের যেন দেশে ফিরিয়ে নিয়ে সাহায্য করে।’

advertisement