advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন

আবুল কাসেম ফজলুল হক
১৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ মে ২০১৯ ২৩:২০
advertisement

বাংলাদেশে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। এ জন্য প্রথম পর্যায়ে দরকার সর্বজনীন কল্যাণে দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা, আলোচনা-সমালোচনা ও বিচার-বিবেচনা। শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, এ সম্পর্কে ধারণা যদি ঠিক হয়Ñ তা হলে ওই লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে চেষ্টা চালালে সমাধানযোগ্য সব সমস্যারই সমাধান করা যাবে। লক্ষ্য ও যাত্রাপথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে এগোতে হবে।

উন্নত প্রযুক্তি ও শ্রমশক্তির কল্যাণে উৎপাদন এবং সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু নৈতিক চেতনার নিম্নগামিতার কারণে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ অমানবিকীকৃত হয়ে চলছে। এ অবস্থায় জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যবস্থারও সংস্কার দরকার। অভীষ্ট সংস্কারের জন্য দীর্ঘকালের প্রচেষ্টা লাগবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য আর কায়েমি স্বার্থবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং লক্ষ্য এক নয়।

শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অবস্থা বিরাজ করছে, এতে সহজে এর উন্নতি সাধন সম্ভব হবে না। অভীষ্ট নির্ণয় ও অর্জনের জন্য যারা কাজ করবেন, তাদের সংঘবদ্ধ দূরদর্শী ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রথম পর্যায় কাজের জন্য কয়েকটি বিষয় কর্মসূচিভুক্ত করা যেতে পারে। যেমনÑ

এক. প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত রেখে এর মান উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। এ দুটি পরীক্ষা প্রবর্তনের ফলে শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছ এবং কোচিং সেন্টার, গাইড বুক ইত্যাদির ব্যবসায় স্বর্ণযুগ দেখা দিয়েছে। এগুলো বাতিল করা হলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও দেশি-বিদেশি যেসব শক্তি এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে, তারা পরিবর্তনে বাধা দেবে। জনমত প্রবল হলে বাধা টিকবে না।

দুই. কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে এমন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবেÑ যা শিক্ষার্থীদের মনে পাঠানুরাগ, অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞানস্পৃহা, দেশপ্রেম, স্বাজাত্যবোধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সুনাগরিকত্ববোধ ও উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষা জাগাবে। শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আনন্দের যোগ ঘটতে হবে। বর্তমানে শিশু-কিশোররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে শিক্ষার্থী হিসেবে। তার পরই তারা বইয়ের বোঝা পিঠে নিয়ে পরীক্ষার্থী হয়ে যায়, শিক্ষার্থী আর থাকতে পারে না। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের অন্ধ অনুসারীরা পরীক্ষা পদ্ধতির অভিপ্রেত পরিবর্তন সাধনে বাধা দেবে। সাম্প্রজ্যবাদী ও তাদের অনুসারীরা দুর্বল জাতিগুলোয় শিক্ষার উন্নতি চায় না। তারা কেবল সার্টিফিকেট দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার ব্যবস্থা চায়। জ্ঞানেই শক্তিÑ বৃহৎ সব শক্তি এটি বোঝে এবং এ শক্তিকে তারা কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। জাতীয়তাবাদ ও এর সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের চেতনা নিয়ে এবং জাতীয় ঐক্য অবলম্বন করে সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে।

তিন. ইংলিশ ভার্সন বিলুপ্ত করতে হবে। যারা সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব লাভ কিংবা বড় চাকরি পাওয়ার জন্য ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান, তাদের জন্য ইংল্যান্ড সরকার ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্থানীয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল আছে। তা ছাড়া আছে বিদেশি সরকার দ্বারা পরিচালিত ইংরেজি মাধ্যমের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসবের পাশে ইংলিশ ভার্সনের দরকার নেই। বাংলাদেশে যারা আজকাল কেবল বিশ্বমান অর্জনের কথা বলেন, তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জনজীবনের কথা একটুও ভাবেন না। যারা দ্বৈতনাগরিক, যাদের স্ত্রী অথবা স্বামী কিংবা সন্তান দ্বৈতনাগরিক বা বিদেশি নাগরিকÑ তারা যাতে বাংলদেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, উপসচিব থেকে সচিব, জজকোর্ট থেকে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে থাকতে না পারেন, সংবিধানে এর সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে।

চার. সারাদেশে সব শিশুকে বিদেশি ভাষা শেখানোর দরকার নেই। চাহিদা বিবেচনা করে সংখ্যা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও আরও কয়েকটি বিদেশি ভাষা ভালো করে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পৃথিবীর উন্নত ও অনুন্নত কোনো রাষ্ট্রেই সব শিশুকে বিদেশি ভাষা শেখানো হয় না। বর্তমানে মূলধারার (এনসিটিবি যে ধারার পাঠ্যপুস্তক জোগান দেয়) বাংলামাধ্যমে ইংরেজি শেখানোর যে ব্যবস্থা আছে, জনস্বার্থে এর পুনর্গঠন ও উন্নয়ন দরকার। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অন্তত একটি বিদেশি ভাষা সবাইকেই ভালো করে শিখতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা শেখার ব্যবস্থাকে যথাসম্ভব উন্নত করতে হবে।

পাঁচ. মাধ্যমিক পর্যায়ে মূলধারার বাংলামাধ্যমের বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক শাখাকে একীভূত করে এক ধারায় পরিণত করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জাতীয় ইতিহাস, পৌরনীতি ও নীতিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বিষয়রূপে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মূলধারার বাংলামাধ্যমের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সবাইকেই গ্রহণ করতে হবে। সারাদেশে বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক পর্যায়ের পর পেশামূলক শিক্ষাকে অনেক প্রসারিত করতে হবে এবং এর পাঠ্যসূচিতে পেশামূলক বিষয়গুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষা, জাতীয় ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে আবশ্যিক বিষয়রূপে স্থান দিতে হবে। সারাদেশে গরিবদের শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলামাধ্যমের মূলধারা খুব বেশি ত্রুটিপূর্ণ ও বিকারপ্রাপ্ত। মূলধারার বাংলামাধ্যমের শিক্ষাকে উন্নত করা হলে এর পাশে মাদ্রাসাধারাও উন্নতিতে আগ্রহী হবে। বর্তমানে মূলধারার বাংলামাধ্যম সবচেয়ে অবহেলিত, বিকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলছে।

ছয়. মাদ্রাসাশিক্ষার ক্ষেত্রে মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যে অবস্থা চলছে, এতে বিরোধমূলক নীতি পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অবলম্বন করতে হবে। সব কিছু করতে হবে রাষ্ট্রের সংবিধানের আওতায় থেকে।

সাত. বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সেমিস্টারের মেয়াদ চার কিংবা ছয় মাসের পরিবর্তে এক বছর করতে হবে। পরীক্ষার ফল গ্রেড পয়েন্টে প্রকাশ করা অব্যাহত রাখতে হবে। গবেষণায় গবেষকদের স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষার ২০ বছরমেয়াদি কৌশলগতপত্রের স্থলে জাতীয়তাবাদ ও এর সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ অবলম্বন করে নতুন উচ্চশিক্ষানীতি প্রবর্তন করতে হবে এবং এ জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

আট. জাতীয়তাবাদ ও এর সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদভিত্তিক কর্মনীতি নিয়ে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান সভ্যতার প্রগতিশীল মহান বিষয় দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি আমাদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যথাসম্ভব আত্মস্থ করতে হবে। আর তাদের উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী বিষয়াদি যথাসম্ভব পরিহার করে চলতে হবে। বিশ্বায়নের কর্তৃপক্ষ (যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, ন্যাটো, জি-সেভেন, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, জাতিসংঘ) ও এর সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র সম্পর্কে পরিপূর্ণ সচেতনতা দরকার। বাইরে থেকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে নিজেদের বিবেচনায় নিজেদের সত্তায় থেকে নিজেদের সত্তাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতির জন্য এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

নয়. বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্ভবপর সব পর্যায়ে রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করা, উচ্চশিক্ষা গবেষণা ও বিচারব্যবস্থায় বাংলা প্রচলন, বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চাসহ বাংলা ভাষার সার্বিক উন্নতির জন্য দূরদর্শী জাতীয় পরিকল্পনা ঘোষণা করে কাজ করতে হবে। বাংলা ভাষা, সব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্মীয় ভাষা, বিদেশি ভাষা ইত্যাদি বিবেচনা করে সুষ্ঠু জাতীয় ভাষানীতি অবলম্বন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে জনজীবনের বৈচিত্র্য ও ঐক্যÑ দুটিতেই যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং সবার উন্নতির নীতি অবলম্বন করতে হবে।

দশ. শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করতে হবেÑ যাতে ক. সারাদেশে বিভিন্ন বিষয়ে পেশামূলক শিক্ষার মাধ্যমে বৃহত্তম সংখ্যক যোগ্য, দক্ষ, উৎপাদনক্ষম, উন্নত চরিত্রবলসম্পন্ন কর্মী সৃষ্টি হয়; খ. শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শক্তিমান রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা ও ভালোভাবে পরিচালনা করার উপযোগী শিক্ষিত লোক তৈরি হয়; গ. দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রকৃত জ্ঞানী ও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আরও গুরুতর বিষয় আছেÑ যেগুলো পর্যায়ক্রমে কর্মসূচিভুক্ত করে নিয়ে কাজ করতে হবে। কেবল চিন্তা দিয়ে হবে না, চিন্তার সঙ্গে কাজ লাগবে। জনসাধারণকে জাগতে হবে। ঘুমিয়ে থাকলে ভালো কিছুই হবে না। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য লাগবে সংঘশক্তি। জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য পরিচ্ছন্ন কর্মসূচি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন গড়ে ওঠার আগেই সরকার যদি এই সংস্কার প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয় এবং এর বাস্তবায়ন শুরু করে, তা হলে তা সরকার ও জনগণÑ সবার জন্যই কল্যাণকর হবে। জগণের রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে কিনা, তা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের ওপর।

য় আবুল কাসেম ফজলুল হক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement