advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ

এমএ আজম খান
১৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ মে ২০১৯ ০৯:২৬
advertisement

প্রকৃতি নিজেই স্বাধীন। তাই অতিযতেœর পাখি, তাকে কত আদর-যতন, খাঁচার পাত্রে। সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করার পরও সে ঘুমন্ত সময় ছাড়া খাঁচা থেকে বের হয়ে স্বাধীন জীবনে গমনের জন্য প্রতিটি মুহূর্তে ঘুরে ঘুরে খাঁচার ভেতর মাথা বের করে এবং খাঁচা কামড়িয়ে কামড়িয়ে বের হয়ে যেতে চায়। অর্থাৎ প্রাণী প্রকৃতি শান্তিপূর্ণ পরাধীনতার চেয়ে দুর্যোগপূর্ণ স্বাধীনতাই তাদের কাছে অধিক প্রিয়।

জ্যাঁ জ্যাঁক রুশোর (ইসৎ পরিবর্তিত) ভাষ্য, বন-বনানী, নদ-নদী ও শাসন করতে গেলে মানুষকেই তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পতিত হতে হয়। মানুষ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করতে করতে আজ এমন অবস্থায় পতিত হয়েছে, মানুষই আজ পরিবেশ বাঁচাও-পরিবেশে বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। আর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে যদি মনে করে তার স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়া যে কত ভয়াবহ, তার প্রমাণ ইতিহাসে রয়েছে।

পৃথিবীর স্বাধীন দেশগুলো স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা নিয়ে লড়াইয়ে রক্তের স্রোতে সাঁতার কেটে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে সানন্দে ঘরে ফিরেছে। পরিণতিতে পরাধীনতার কর্তাব্যক্তিরা জীবন নিয়েও পালাতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে পাকিস্তান কি ভাবতে পেরেছিল তাদের তিরানব্বই হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্য, শক্তিশালী কামান-গোলা থাকতেও তাদের মাথা নত করে করুণ আত্মসমর্পণ তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

তাই বলা হয় পরাধীনতা মৃত্যুসম। পরাধীনতার চেয়ে হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ সম্মানের ও বীরত্বের। তাই স্বাধীনতা ও প্রকৃতি পরস্পর সমান্তরাল। আমরা তিন কালে অবস্থান করিÑ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। অবশ্য পেছনের দিনগুলো যথাযথ মূল্যায়ন ও মহাকালের কাছ থেকে কী নিতে পেরেছি? তা-ই বর্তমানের পুঁজি। অতীতের সফলতা, ব্যর্থতার হিসাব মিলিয়ে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং সফলতার উপহার পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে যিনি এগিয়ে যান, তিনিই জ্ঞানী-ধীমান, স্মরণীয়-বরণীয়। জ্ঞান আঁধারের আলোবিশেষ। জ্ঞানের উৎস দুটি।

একটি চোখে দেখে, অন্যটি অন্তর চোখ। চোখে দেখা জ্ঞান অন্তর চোখে অনুভব করে সঠিক দিকনির্দেশনা বের করতে পারাই আসল জ্ঞান। সুফিপন্থিরা জ্ঞানকেই গুরু হিসেবে মান্য করেন। যার জ্ঞান যত বেশি, সেই তত সার্থক। এর মধ্যেও বিভাজন আছে। একটি পুস্তকি জ্ঞান, অন্যটি প্রকৃতি থেকে আত্মস্থ জ্ঞান। পুস্তকিবিদ্যা জ্ঞানের দ্বার খুলে দেয়। এর পর জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দিয়ে প্রকৃতির জ্ঞান আহরণে আত্মমগ্ন হতে পারলেই জ্ঞানের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে।

প্রসঙ্গত বলা যায়, লালন ক-অক্ষর গোমাংস। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন পালকির বেহারা। গুরু সিরাজ সাঁইর স্পর্শে প্রকৃতির জগৎকে বুঝে নিয়ে তার ওপর আত্মমগ্ন হয়ে তার হৃদয়ের গভীর ও নিগূঢ় জ্ঞানের জাগরণ ঘটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেক্সপিয়রের পুস্তকিজ্ঞানে একদমই অনুল্লেখ্য। কিন্তু তারা জীবনের শুরুতেই প্রকৃতির কাছ থেকে গ্রহণ করেন। আর প্রকৃতির জ্ঞানভা-ার তাদের অন্তরলোক আলোকে উদ্ভাসিত করে দিয়েছে। জ্ঞান না থাকলে স্বাধীনতার মূল্য বোঝা যায় না। স্বাধীনতাকে বুঝতে হলে আত্মমর্যাদাবোধ থাকতে হবে। ঝোঁকের মুখে স্বাধীনতার মূল্যায়নে পঞ্চমুখ অনেকেই।

দেখা গেছে, ব্যক্তিজীবনে সে স্বার্থান্ধ হয়ে বৈধতাবহির্ভূত কাজ না করে, এমন কাজ নেই। স্বাধীনতা ব্যক্তি ও জাতির জন্য অপরিহার্য। স্বাধীনতা ছাড়া ব্যক্তির আত্মবিকাশের সুযোগ হয় না। আর এই স্বাধীনতার রক্ষাকবচ রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব ছাড়া নাগরিকদের দ্বিতীয় কোনোই মাধ্যম নেই। যার মাধ্যমে জীবন প্রস্ফুতিত হয়। নাগরিকদের লালন রাষ্ট্রের কর্তব্য। সুশাসন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতার অপরিহার্য উপাদান ও রাষ্ট্র কর্তৃক ওই অধিকারগুলো নাগরিকদের জন্য জারি রাখা আদর্শ রাষ্ট্রের লক্ষণ। অধিকারগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিপালন হয়। অধিকার ভোগ করতে চাইলে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ পাশাপাশি অবস্থান করা দরকার। রাষ্ট্র বৈরী হলে নাগরিকদের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি হয়।

নাগরিকরা বৈরী হলে রাষ্ট্রক্ষমতা বৈরী হতে বাধ্য। নাগরিক ও রাষ্ট্র পরস্পরের মধ্যে সুনীতি ও সততাবোধের নৈতিক আদর্শের প্রতিপালন থাকলে সে দেশ ও নাগরিকের উন্নতি ও শান্তির সুখপাখি বিরাজিত থাকে। এমতাবস্থায় নাগরিক ও সরকার উভয়েই ধন্য হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মহামতি অ্যারিস্টটল দেশে অশান্তি ও বিপ্লবের জন্য কতিপয় কারণকে দায়ী করেছেন। তার মধ্যে যেটিকে আমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি, তা হলো বৈষম্য থেকে অসন্তোষ এবং অসন্তোষ থেকে বিপ্লব। কাজেই নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য ও বিভাজন যাতে প্রশ্রয় না পায়, সেদিকে রাষ্ট্রকে বাজপাখির মতো দৃষ্টি রাখতে হবে। অধিক সুবিধাভোগীরাই একসময় রাষ্ট্রযন্ত্রকে অলক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণে নেয়। এটা সংঘটিত হলেই বিপদ। বৈষম্য এখানেই সৃষ্টি।

গণমানুষের মনে অসন্তোষের দানা বাঁধে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রাষ্ট্রের চিন্তা ও চিত্রণ আমরা যেন ভুলে না যাই। বাঙালি প্রতিবাদপ্রিয় জাতি, সংগ্রামী, বিদ্রোহী। পরাভবহীন। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এ সত্যের দেখা পাওয়া যায়। এখনো দেশে অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৭০ শতাংশ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই গোষ্ঠীর চাওয়া-পাওয়া ও বঞ্চনা দূরীকরণে আন্তরিক হওয়া অবশ্য এবং অবশ্যই প্রয়োজন।

এমএ আজম খান : প্রাবন্ধিক

advertisement