advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আইএস তত্ত্ব ও লোন উলফ অপারেশন

২০ মে ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২০ মে ২০১৯ ০৯:৪৯
advertisement

সিরিয়ার রাকা শহর, তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) রাজধানী। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রি সিরিয়ান আর্মির হাতে পতনের পর আইএসের খেলাফত ভেঙে যায়। তবে তখনো যুক্তরাষ্ট্র আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয় এবং দখলে থাকা ভূখণ্ড সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়নি। রাকা হারানোর পরও আইএস যোদ্ধাদের বেশিরভাগ সিরিয়ার বেগুজ শহর দখলে রাখে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। বেগুজের পতনের মধ্য দিয়ে আইএস ভূখণ্ড হারালেও কথিত ‘ক্রুসেড’-এর বিরুদ্ধে জিহাদ থেকে সরে এসেছে এমন ভাবার অবকাশ নেই।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জেনারেল জোসেফ ভোটেল (সিরিয়া যার অপারেশন অঞ্চলে) বলেন, আইএস যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হলেও তার মানে এই নয় যে, নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখনো রয়ে গেছে নেতৃত্ব, যোদ্ধা, জোগানদানকারী, সম্পদ এবং সর্বোপরি ‘মতাদর্শ’, যা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া কথিত যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করবে।

এরই প্রেক্ষাপটে প্রায় পাঁচ বছর পর আইএস নেতা কথিত খলিফা বাগদাদির নতুন ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশে প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিভিন্ন টার্গেটের ওপর হামলার ইঙ্গিত দেন। সিরিয়ায় যুদ্ধ ও আইএসের সূর্য যখন মধ্যগগনে, ওই সময়ে জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছিল, সিরিয়া-ইরাকে আইএস যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজারের বেশি; যার মধ্যে প্রায় ১১০টি দেশের যোদ্ধারা শামিল ছিল। তবে বিভিন্ন দেশের আইএস সদস্য কত ছিল তার সঠিক তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, বিভিন্ন সময়ে প্রায় তিন হাজারের বেশি বিদেশি যোদ্ধা নিজ নিজ দেশে ফিরেছে ( বিবিসি নিউজ, মার্চ ২৫)।

ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার যোদ্ধা, যার মধ্যে প্রায় তিন হাজার বিদেশি সদস্য ইরাক, সিরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তান প্রধান রয়েছে। আফ্রিকার আইএস উপস্থিতির নতুন দেশের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বরকিনা ফাসো ও মালে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশ থেকেই আইএসে যোগদানকারী সদস্য ছিল। ধারণা করা হয়, এর মধ্যে মালদ্বীপ থেকেই ছিল বেশি। এ তালিকায় রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা। তথ্যমতে, শ্রীলংকায় গুটি কয়েকজন হলেও আইএসের অনুসারীদের আচমকা উত্থান বিশ্ববাসীকে হকচকিয়ে দিয়েছে। এত বড় ধরনের হামলা এশিয়া অঞ্চলে আইএসের সিরিয়ায় পরাজয়-উত্তর সময়ের সবচেয়ে বৃহৎ এবং ভয়াবহ হামলা।

প্রথম দিকে কিছুটা সন্দেহ থাকলেও এখন এটা পরিষ্কার যে, শ্রীলংকার এ হামলার হোতারা আল কায়েদার অনুসারী এবং ওই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে বিদেশি এবং শ্রীলংকার খ্রিস্টানদের ওপর আক্রমণ করেছে। আইএসের অন্যতম তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রীলংকা ‘ক্রুসেডার’ দেশ না হলেও খ্রিস্টান সম্প্রদায় ‘ক্রুসেড’ সমর্থক। আইএসের অন্যতম তত্ত্বমতে, পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে খ্রিস্টানজগৎ ১০৯৫ সালে পোপ আরবানার ক্রুসেডের আহ্বানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ক্রুসেড শুরু হয়েছিল, তা এখনো শেষ হয়নি এমনই কথা বিখ্যাত ইতিহাসবিদ লেখক কারেন আর্মস্ট্রং তার রচিত বিশ্বখ্যাত বই ‘হোলি ওয়ার : দি ক্রুসেডস অ্যান্ড দেয়ার ইমপ্যাক্ট অন টুডেস ওয়ার্ল্ড’-এ বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।

তার মতে, (উপসংহারে) মধ্যপ্রাচ্যে আরব আর ইহুদিদের মধ্যে সংঘাতের হোতা পশ্চিমাবিশ্ব এবং এখান থেকে পশ্চিমাবিশ্ব বের হয়ে না আসা পর্যন্ত এ সংঘাত শেষ হওয়ার নয় (পৃষ্ঠা-৫৩০)। এ তত্ত্বকে আরও উসকিয়ে দিয়েছেন স্যামুয়েল হান্টিংটন তার রচনা বহুল চর্চিত ‘ক্ল্যাশ অব দ্য সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’। এমনি আরও তত্ত্বের বিপরীতেই আইএস যে তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছে তাতে উদ্বুদ্ধ করতে রয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়া দখলের এবং যুদ্ধের ইতিহাস। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য তথা কথিত মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ‘তথৈবচ’ অবস্থা। এ ধরনের অস্থিরতার মধ্যে আইএস এবং সমমনা সংগঠনগুলো যে বেড়ে ওঠে তার উদাহরণ বর্তমান অবস্থা। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর কর্তৃত্ববাদী শাসন আর সংকুচিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই আইএস ও আল কায়েদা অনুসারীদের ‘ইসলামের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনতে’ (আইএস ও আল কায়েদার মতবাদ) জিহাদ নিজের দেশের মধ্যে চালানোর নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

আইএসের পরাজয় বা সংগঠন একেবারে ধ্বংস হয়েছে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আল কায়েদা যদিও বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টায় রত, তবুও আইএসের আধুনিকতার কারণে আল কায়েদা সে ‘জৌলুস’ হারিয়ে ফেলেছে। আল কায়েদার অনেক কৌশলকে আরও আধুনিক রূপ দিয়ে আইএস অনেক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে পুরনো কৌশলকে নতুন রূপ দিয়েছে। আইএসের কথিত পরাজয়ে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমাবিশ্ব উৎফুল্ল হলেও আইএস কর্তৃক যুদ্ধের কৌশল বদলানো নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন রয়েছে পশ্চিমা তথা বিশ্বের অন্যান্য দেশ। এ কৌশলটি অনেকটা গেরিলা পদ্ধতির নব্যরূপ, লোন উলফ অপারেশন বা ‘লোন উলফ মডিউল’।

অতি সম্প্রতি ভারতীয় ‘ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি’ দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও পশ্চিম বাংলার কয়েকজন আইএস সমর্থকের (কথিত সদস্য) গ্রেপ্তারের পর লোন উলফ মডিউলের কৌশল সামনে আসে, যা কেরালা-তামিলনাড়– মডিউল হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। লোন উলফ মডিউল তাদের সংগঠন এবং কার্যপ্রণালি সম্পর্কে কেরালা মডিউল এবং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে যতটুকু জানা যায় তাতে নিশ্চিত যে, এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিহত করা খুবই দুরূহ যদি আগাম খবর এবং নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া যায়। লোন উলফ অপারেশ একজন বা দুই সদস্যের সাধারণত এক সদস্য, গ্রুপ হতে পারে। এদের একজন নিয়ন্ত্রক যার নির্দেশেই আক্রমণ হয়, সাধারণত হামলার লক্ষ্যবস্তু নিয়ন্ত্রক দ্বারাই নিশ্চিত করা হয়।

লোন উলফ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় থাকে। সাধারণত বিদেশি, বিশেষ করে ইউরোপিয়ানদের দেশি লক্ষ্যবস্তু এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের যাদের টার্গেট করলে সর্বাধিক প্রচার হয়। লক্ষ্যবস্তু হতে পারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। নিয়ন্ত্রকরা সাধারণত টার্গেট এলাকায় খুব কমই থাকে। লোন উলফ ট্রেনিংও খুব কঠিন নয়। অনেক সময় সংগঠনের প্রচারের জন্য গণহত্যাতেও সম্পৃক্ত হয়। লোন উলফ গ্রুপেও হতে পারে। লোন উলফ মডিউলকে শনাক্ত করা কঠিন হয়। কারণ এদের হাতে বা গায়ে তেমন সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায় না, হয়তো কিছু ধারালো অস্ত্র ছাড়া। লোন উলফ অপারেশনে সাধারণত আইইডি ব্যবহার কম হয়, যে কারণে এদের সদস্যদের সহজে ধরা যায় না। তা ছাড়া নারী-পুরুষ হতে পারে; তবে গবেষণায় প্রতীয়মান যে, বেশিরভাগের বয়স ৪০ ঊর্ধ্বে নয়।

বর্তমানে এদের বেশিরভাগই শিক্ষিত এবং মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যও হয়ে থাকে। অনেক সময় লোন উলফ সদস্যরা কোনো সংগঠিত গ্রুপের নাও হতে পারে, তবে বিশেষ কোনো গ্রুপের মতাদর্শের অনুসারী হতে পারে। তথ্য প্রকাশ, এসব লোন উলফের তাদের নির্দেশদাতাদের কাছ থেকে যেসব ধরনের নির্দেশ, তা হলো ছুরি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিদেশিদের মাথা কাটতে হবে। এ ধরনের অস্ত্র বহন, ব্যবহার এবং সহজলভ্যতার কারণে লোন উলফ অপারেশনের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।

শুধু ধারালো অস্ত্রই নয়, লোন উলফ যে কোনো বস্তুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ফ্রান্সের নিচ শহরে জনসমুদ্রের ওপর ট্রাক চাপিয়ে দেওয়া। ওপরে লোন উলফ অপারেশন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা এ কারণে করলাম, ভারতের কেরালা ও তামিলনাড়–র মডিউলের সঙ্গে বাংলাদেশিও জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এই ব্যক্তির প্রকাশিত নাম মসিউদ্দিন ওরফে আবু মুসা, যার কাছ থেকে কয়েকটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছিল। মুসাকে পশ্চিমবাংলার সিআইডি গ্রেপ্তার করে তার মাধ্যমে গত বছরই কেরালা, তামিলনাড়– ও কর্ণাটকে লোন উলফ বলে আখ্যায়িত অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি শ্রীলংকার ঘটনার পর কয়েকজনকে আটক করে জানা যায়, আইএসের অনুসারীদের ওপর বর্তমানে লোন উলফ আক্রমণের নির্দেশনা রয়েছে। ভারতের দক্ষিণে আইএস অনুসারীদের অস্তিত্ব রয়েছে বলে জাতীয় অনুসন্ধানী সংস্থা বলেছে (এনআইএ)।

একই সঙ্গে পশ্চিমবাংলায়ও এদের গোপন তৎপরতার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এরই আলোকে বুদ্ধপূর্ণিমায় পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশে হামলার আশঙ্কার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। নিশ্চয়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ ধরনের তথ্য রয়েছে বলেই যথাপোযুক্ত ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে। বাংলাদেশে হলি আর্টিজানের ঘটনার পর বহু সার্থক অভিযানে সংঘটিত সন্ত্রাসের আশঙ্কা কমলেও লোন উলফ অপারেশনের সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এরই মধ্যে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশি বংশদ্ভূত সৌদি আরবে বড় হওয়া এবং আইএস যোদ্ধা মোতাজ আবদুল মজিদ কফিলুদ্দিন বেপারী। ওই ব্যক্তি নব্য-জেএমবির সদস্যদের সঙ্গে সভায় ছিলেন। বাকিদের ধরা যায়নি।

এই ব্যক্তি গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, কাজেই এই তিন মাস তার গতিবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগেও সিরিয়া ফেরত ডেসকোর একজন প্রকৌশলী গাজী কামরুস সালাম সোবহান ২০১৪ থেকে সিরিয়া আইএস যোদ্ধা ছিলেন, এখন কারাগারে রয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০-৬০ জন আইএস যোদ্ধা ছিল বলে তথ্যে প্রকাশ। এর মধ্যে অনেকের মৃত্যু হলেও অনেকেই আইএস ভূখ- পতনের পর বিভিন্নভাবে দেশে ফিরে অথবা অন্য কোথাও থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক তরুণকে মতাদর্শে দিক্ষিত করতে পারে।

বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষ করে ফেসবুকে যোগাযোগ, ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ে মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে নতুন সদস্যদের টানা হয়। যদিও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ যথেষ্ট সজাগ, তবুও সম্পূর্ণভাবে জনগণকে সচেতন করা এবং সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের লোন উলফ অপারেশনকে পরাজিত করা খুবই দুরূহ বিষয়। কাজেই জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই নয়, মিডিয়াও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মতৃপ্তিতে নয়, সচেতনতাই এ ধরনের আক্রমণকে যথাসম্ভব প্রতিহত করার অন্যতম কৌশল।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, বর্তমানে অনারারি ফেলো এসআইপিজি, এনএসইউ