advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চাল রাখার জায়গা নেই গুদামে

মো. মাহফুজুর রহমান
২১ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ মে ২০১৯ ১০:১৩

তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেননি সরকারের তরফে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা। এবারও সরকারি গুদামে ধান-চাল মজুদের জায়গা নেই। অভিযোগ রয়েছে, মিলমালিক ও মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা- কর্মচারীর যোগসাজশে এহেন সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে।

চলতি মৌসুমে সরকারের পক্ষে বোরো কেনার কার্যক্রমে যে ধীর গতি, এ নিয়ে নানা কথা উঠলেও আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নেপথ্যের কারণ। সংগ্রহ অভিযান শুরুর মাসখানেক পর এ তথ্যের সত্যতা স্বীকারও করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

advertisement

একদিকে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দেশের ধানচাষিদের মধ্যে যখন চরম হতাশা বিরাজ করছে, অন্যদিকে তখন গুদামে স্থান সংকটের কথা জানালেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তিনি বলেছেন, সরকারিভাবে ধান-চাল মজুদের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এ কারণে বরাদ্দের অতিরিক্ত ধান কিংবা চাল সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তবে চাল রপ্তানির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০১১ সালে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় নির্ধারিত সময়ে ধান-চাল কিনতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। ২০১৫ সালেও তাই। তৎকালে মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় খাদ্য গুদাম।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু গতকাল আমাদের সময়কে জানান, গুদামে জায়গা বাড়ানোর কৌশল ঠিক করা হয়েছে। আর ঈদ উপলক্ষে ভিজিএফের বরাদ্দ এলে গুদাম অনেকটাই খালি হয়ে যাবে, বলেন তিনি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২১ লাখ টন খাদ্য মজুদে সক্ষম সরকার। তা হলে কেন মজুদ সংকট? (*কি পরিমাণ খাদ্য মজুদ, তা না জেনে কীভাবে এমন প্রশ্ন করা হলো?) এর উত্তর মেলানো যাচ্ছে না। গত ১২ মে খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে দেশের সব বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, গুদামে খামারের (বস্তার সারি) উচ্চতা ১২ ফুটের পরিবর্তে সাড়ে ১৫ ফুট করে হলেও যেন বোরো চাল ঢোকানো হয়। এখন মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বলা হয়েছে, ছাদ ছুই-ছুই হলেও চাল গুদামজাত করতে হবে।

এ দিকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সরকারি গুদামে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল। এ ছাড়া গুদামে চটের বস্তা ও অন্যান্য সহায়ক সামগ্রী রাখতেও স্থানের প্রয়োজন। যদি ২১ লাখ টন ধারণক্ষমতা থাকে, তা হলে বোরো চাল ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করতে সমস্যা কোথায়? এর উত্তর মিলছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও কাছ থেকে। নেপথ্যে চাল সিন্ডিকেট সরকারের চাল সংগ্রহের সবচেয়ে বড় অভিযান শুরুর আগে সামাজিক নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ইতোপূর্বে গুদামজাতকৃত চাল সরিয়ে ফেলাই যুক্তিযুক্ত। এতে করে নতুন চালের জন্য গুদামে বেশি স্থান পাওয়া যায়। আর পুরনো চালও নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বরাবরই এমন পরামর্শই দিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকারের সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে সিন্ডিকেট।

একাধিক সূত্রের খবর, দেশে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে ৮০ জনের একটি সিন্ডিকেট চাল সংগ্রহ-মৌসুমের শুরুতেই খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে আঁতাত করে সামাজিক নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন খাতের গতি স্তিমিত করে রাখে। ফলে গুদামে আগে থেকে মজুদকৃত চাল গুদামেই থেকে যায়। একই সময়ে মিলাররাও নানা অজুহাত দেখিয়ে ধান কেনা থেকে বিরত থাকে। সরকার সংশ্লিষ্টরা গতকাল জানিয়েছেন, সাত-আট দিনের মধ্যে চাল কেনা শুরু হবে। কিন্তু তখন প্রান্তিক কৃষকের ভা-ার প্রকৃত অর্থেই থাকবে শূন্য।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকের কান্নায় মর্মাহত হয়েছেন; জানতে চেয়েছেন, কেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে? খাদ্য বিভাগসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ নিয়ে তদন্ত করতে মাঠে নেমেছে। আসছে সপ্তাহেই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। মন্ত্রীর ঘোষণা নিয়ে বিভ্রান্তি বোরো সংগ্রহের সময়কাল গত বছরের তুলনায় এক মাস এগিয়ে আনা হয়েছে বলে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, আগে ২৫ মে বোরো কেনা শুরু হলেও আমরা এ বছর তা ১ মাস এগিয়ে এনে ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু করব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মন্ত্রী একমাস নয়, এক সপ্তাহ এগিয়ে এনেছেন। কারণ সরকারি তথ্য উপাত্ত বলছে, অতীতে কখনোই ২৫ মে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি, হয়েছে ২ মে থেকে। তবে এটা ঠিক যে, মিলার সিন্ডিকেটের কারণে সংগ্রহে গতি এসেছে মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে।

বর্তমান পরিস্থিতি এমনই যে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য মজুদ কার্যক্রম সম্পাদনে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। দাম কম থাকলেও সরকার জায়গার অভাবে খাদ্য মজুদ করতে পারছে না। এ কারণে বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে ধান-চাল কেনা প্রায় বন্ধ রয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই সরকারি হেফাজতে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকা দরকার। কিন্তু গুদামে জায়গার অভাবে সরকারি খাদ্যশস্য রাখার জায়গা নেই। এ পরিস্থিতিতে উভয় সংকটে পড়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।