advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভূস্বামী-প্রজার অসম সম্পর্ক নয়

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ
২১ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ মে ২০১৯ ০০:৪৭
advertisement

বাংলাদেশ যে একটি সম্পদশালী দেশ, এতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ যদি দরিদ্র হতো, তা হলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদেশিদের শ্যেনদৃষ্টি পড়বে কেন এ দেশটির ওপর? পূর্ব থেকে মগরা এলো, পশ্চিম থেকে এলো পাঠান, মোগল, এমনকি তুর্কিরা। ইউরোপের জলদস্যুদের, বিশেষ করে পর্তুগিজ-ওলন্দাজদের উপর্যুপরি হামলা কেন বাংলার মানুষকে সইতে হয়েছে? ফ্রান্স ও ব্রিটেনের কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যবহর বাংলার উপকূলে কেন ভিড় জমাত? বাংলাদেশ যদি দরিদ্রই হবে, তা হলে পাকিস্তানের শাসকরা কেন গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেও দখলদারিত্ব স্থায়ী করতে দৃঢ়সংকল্প হবে? কেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর শ্যেনদৃষ্টির অশুভ প্রভাবে চারদিক তছনছ হবে? কেন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো আমাদের সম্পদের ওপর এমন কড়া নজর রাখবে?

বাংলাদেশের মাটি বিশ্বের সবচেয়ে উর্বর এলাকাগুলোর অন্যতম। একটু পরিশ্রম করলেই এখানে মাটিতে তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব। মাটির নিচে গ্যাস ও কয়লার মতো খনিজসম্পদের প্রতি একদিকে প্রতিবেশীর দৃষ্টি যেমন প্রখর, অন্যদিকে বাইরের বিশ্বও তেমনি ক্ষুধার্ত। এখানকার আকাশ ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩০০ দিনই থাকে সূর্যকরোজ্জ্বল। যথার্থ প্রযুক্তির প্রয়োগে সূর্যকিরণকে এনার্জিতে রূপান্তর করার প্রকল্প একবার বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে শত সম্ভাবনার হাজারো বাতায়ন উন্মুক্ত হতে পারে। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় একেকটা স্বর্ণখনির মতো। সমুদ্রের উপকূলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সীমাহীন সম্পদ। সীমাহীন সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশের মাটির ওপর বসবাসকারী মানুষের দিকে তাকান, এ ক্ষেত্রেও দেখবেন একই চিত্র। অনেকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কথা বলে বেশি, কাজ করে কম। এ দেশের মানুষ মন্দ। বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। কিন্তু কেউ খোঁজখবরও নিতে চান না, এ দেশের জনসমষ্টির কোন স্তরের মানুষ তারা। মোট জনসংখ্যার কতজন তারা? বাংলাদেশ ব্যাংকে যে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিত হয়েছে, তা কাদের পরিশ্রমের ফল? পর্যালোচনা করুন, দেখতে পাবেন এই অর্জন এ দেশের ওইসব অভাজন, শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিতের শ্রমের ফসলÑ যাদের জন্য সমাজ কার্যত কিছুই করেনি। না শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছে তাদের জন্য, না এ দেশে তাদের জন্য ছোটখাটো কাজের সংস্থান করেছে। অতিকষ্টে, হাজারো ঘাট মাড়িয়ে, একান্তই নিজের উদ্যোগে, অশিক্ষার বোঝা মাথায় নিয়ে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে যা উপার্জন করেছেন, তারই ফল এই বৃহৎ রিজার্ভ। নিজের অভিজ্ঞতায় জেনেছি, বিদেশে বাংলাদেশের চিকিৎসক উত্তম। বাংলাদেশের প্রকৌশলী প্রথম শ্রেণির। বাংলাদেশের ছাত্র-শিক্ষকরা সবার সেরা। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় সব কটিতে নিজেদের উদ্যোগে তারা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছেন। তাদের মধ্যে কয়জন দুর্নীতিপরায়ণ? কয়জন রয়েছেন মন্দ কাজে লিপ্ত? রপ্তানি খাতের দিকে তাকালেও একই চিত্র। তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত রয়েছেন এ দেশেরই অশিক্ষিত, আধা শিক্ষিত, নিগৃহীত, বঞ্চিত মেয়েরা, মায়েরা। এখনো অল্প বেতনে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের মাধ্যমে তারাই প্রাণবন্ত করেছেন দেশের রপ্তানি খাতকে। সহায়তা করে চলেছেন শিল্প-কারখানার মালিকদের এবং দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নিজেরা বঞ্চিত মানবেতর জীবনযাপন করেও।

এ দেশের সহজ-সরল মানুষকে কোনো কোনো মহল মৌলবাদী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলেও চিহ্নিত করতে প্রয়াস পাচ্ছে। আর জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বিদেশি সহায়তার প্রবাহকে চিরস্থায়ী করে রাখতেÑ যদিও তারা জানেন, বিদেশি সহায়তার মাধ্যমে কোথাও কোনো সময় কোনো দেশ অগ্রগতির আশীর্বাদ লাভ করেনি। কথাগুলো বলছি এ কারণে যে, উল্লিখিত ধান্ধাবাজির মাধ্যমে বাংলাদেশকে কোনো কোনো মহল বেঁধে দিতে উদ্যত বিদেশি প্রভুদের আস্তাবলের খুঁটির সঙ্গেÑ যেন কোনোদিন বাংলাদেশের জনগণ আর মাথা উঁচু করতে সক্ষম না হয়। এ দেশে যে দুর্নীতিপরায়ণ নেই, তা নয়। কিন্তু তাদের সন্ধান মিলবে শাসন-প্রশাসনের গুরুদায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে নির্মিত হিমায়িত প্রকোষ্ঠে রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা পরগাছাদের মধ্যে, নীতিনির্ধারক চক্রের গোপন কুঠুরির আলো-ছায়ার আবডালেÑ সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়। এ দেশে একটি সম্পদশালী দেশ। এর মাটিতে সোনা ফলে। এর নদ-নদী, খাল-বিলে রাশি রাশি সম্পদ। প্রকৃতি প্রদত্ত উজ্জ্বল সূর্যকিরণ অন্তহীন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে সক্ষম। বাংলাদেশের কৃষক পরিশ্রমী ও কর্মঠ। শ্রমিকরা অতি অল্পে সন্তুষ্ট। প্রয়োজন শুধু মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবন্ধকতার পাহাড় সরিয়ে ফেলে কর্মের পথ সুগম করা, আমলাতান্ত্রিক হোক আর রাজনৈতিক হোক, সব বেড়াজাল নীরবে সরিয়ে ফেলা। আর প্রয়োজন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সুখ-স্বপ্নকে এসব কৃষক-শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষকে, বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্মের চোখে আলতোভাবে লাগিয়ে দেওয়া। কেননা তারাই পারেন, এখন যা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তাকে সম্ভব করে তুলতে। প্রয়োজন দেশপ্রেমের আগুনে আমাদের সন্তানদের অন্তঃকরণকে উত্তপ্ত করাÑ যেন দেশের সব সম্পদ নিজেদের সম্পদ মনে করে অতিসাবধানে পাহারা দিতে পারে। কেননা সব হীনমন্যতার ঊর্ধ্বে উঠে স্বাপ্নিক দেশপ্রেমিকরাই পারবেন দেশ ও দেশের মানুষকে সাফল্যের সিংহদরজায় পৌঁছে দিতে। বাংলাদেশে এ দুটি অসম্ভবকে সম্ভব করার সুখ-স্বপ্ন ও দেশপ্রেম দুর্লভ। আমাদের সন্তানদের হাতে এই রতœ দুটি তুলে দিতে পারলে আমাদের আর কোনো দুর্ভাবনা থাকে না।

যারা বলেন, আমাদের সন্তানরা ‘নষ্ট হয়ে গেছে, অকর্মণ্য হয়ে শেষ হয়ে গেছে’Ñ তারা ভুল বলেন। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। এখন পর্যন্ত তাদের আবিষ্কার করতেই আমরা পারিনি। সাফল্যের গোপন সূত্র, সক্ষমতা এবং তাদের জ্ঞানের গভীরতা তাদের অন্তরাত্মায় এখনো সংরক্ষিত। সে সম্পর্কে তারা সজ্ঞাত। তাদের সমগ্র সত্তায় তা বিরাজমান। শুধু নেই তার প্রকাশ। তাদের প্রকাশ ও বিকাশের জন্য শত বাতায়ন যদি উন্মুক্ত করে দিতে পারি, তা হলেই হলো।

জাতীয় জীবনের এই ক্ষণে আমার মনে হয়েছে, দেশ ও দেশবাসী সম্পর্কে যারা চিন্তাভাবনা করেন, তাদের ঘরমুখো হওয়া প্রয়োজন। অন্যের কৃপা প্রার্থনা না করে, অন্যের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য হাত না বাড়িয়ে, ক্ষমতাধরদের সামনে জড়সড় হয়ে না দাঁড়িয়ে যদি নিজেদের যা আছে, তাকেই কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর হই, নিজেদের গড়া কুঁড়েঘরকে নিয়ে গর্ব অনুভব করতে থাকি আর আমাদের সন্তানদের পথের সব কাঁটা দূর করতে সংকল্পবদ্ধ হই, তা হলেই হলো।

আমাদের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অবহিত। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক হিসেবে আমাদের বয়স মাত্র ৪৮ বছর। অবশ্য সুসংবদ্ধ সমাজজীবনের ধারা এ জনপদে সূচিত হয়েছে সাড়ে চার, কী পাঁচ হাজার বছর আগে। এই দীর্ঘকাল আমরা শাসিত হয়েছি শুধু। নিজেদের শাসন করার জন্য এই দীর্ঘকালে আমরা শাসনদ- হাতে পাইনি। শুধু শাসিত হয়েছি। হয়েছি শোষিত, বঞ্চিত। অন্যের অবহেলা গ্রহণ করতে হয়েছে। আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে ভ-ামির অসত্যের, প্রবঞ্চনার। দাসত্বের সঙ্গে এসব মিলেমিশে একাকার হয়েই ছিল। এখন সময় এসেছে সেই মানসিকতা ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করার। মেরুদ- সোজা করে উঠে দাঁড়ানোর, প্রতিপক্ষের সামনে মানে সমানে নিজের কথা জোরেশোরে উচ্চারণের। আমাদের যা পাওনা, তা সুদে-মূলে আদায়ের। এ জন্য চাই আত্মশক্তির উদ্বোধন। চাই আত্মবিশ্বাসের জাগ্রত সুর। চাই আত্মমর্যাদাবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে বন্ধুর পথে দ্রুতগতিতে চলার শক্তি। আমাদের সন্তানদের মধ্যে মেধার স্বল্পতা নেই, ঘাটতি নেই সৎকর্ম সাধনের আকাক্সক্ষার। ঘাটতি নেই নিজেদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনার সংকল্পের। এই মেধা, আকাক্সক্ষা ও সংকল্প সুনির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত করতে পারলে সমাজে সৃষ্টি হবে নতুন এক বিপ্লব। সেই বিপ্লবে ভেসে যাবে ব্যর্থতার সব গ্লানি, অনগ্রসরতার সব অন্ধকার, পশ্চাৎপদতার সব প্রতীক। অন্যের দিকে তাকালে হীনমন্যতায় আক্রান্ত হতে পারি। আত্মনির্ভরশীলতার দিকে পা বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আমরা এগিয়ে যেতে চাই শুধু আমাদের জন্য নয়, আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া সবার কথা স্মরণ করে, সবার কাছে অগ্রবর্তী ভাবনার প্রতীক হিসেবে। বিশ্বের কারো সঙ্গে শত্রুতা নেই। আমাদের শত্রু আমাদের দুর্বলতা, অপরের ওপর নির্ভরশীলতা, কর্তাভজা মানসিকতা, পাছে কেউ আমাদের ওপর নাখোশ হয় এই হীনমন্যতা, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে অন্যের জন্য নিজের সদর দরজা উন্মুক্ত করা এবং নিজেদের সম্পদ অপরের হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হওয়ার নিম্নস্তরের অনুভূতি। আন্তর্জাতিকতার এই কালে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে চাই না। তাই বলে আমরা অন্যের সুবিধা সৃষ্টির জন্য আমাদের দক্ষিণ দুয়ারি ঘরটা অন্যের হাতে তুলে দেব, তা হয় না। মিলিত হতে চাই সমানে সমানে। ভূস্বামী-প্রজার অসম সম্পর্ক নয়, বরং বন্ধুত্বের সুষম সম্পর্কে। এসব ক্ষেত্রে সরকার কী করবে, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো আমরা কী ভাবছি, সরকারকে তা সজ্ঞাত করা। সরকারকে আমাদের চিন্তাভাবনা ধারণ করতে হবে। তাই সরকারের কার্যক্রম হতে হবে স্বচ্ছ। সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে আমাদের কাছে। আমাদের সন্তানদের চলার পথে সরকারের কাজ হলো সব বাধা অপসারণ করা। এর বেশি কিছু নয়। আমরা যা পারিনি, যা করতে ব্যর্থ হয়েছিÑ সেই অসক্ষমতা ও ব্যর্থতার গ্লানি আমাদের সন্তানরা মুছে দেবে।

য় ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement