advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

যেসব কারণে মোদি এগিয়ে

শেখর গুপ্ত
২১ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ মে ২০১৯ ০১:২৪
advertisement

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর সঙ্গে শুক্রবারের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে একপ্রকার তাদের বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এই সংবাদ সম্মেলনে মোদি আরও দাবি করেন যে, এবার ভারতের রাজনীতিতে একটা বিরল ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, আর তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে ক্ষমতাসীন কোনো দলের পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করা।

বুথফেরত জরিপ থেকে কিছুটা আভাস পাওয়া যেতে পারে, তবে সেটা কতটা ঠিক তা জানতে ২৩ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের অর্থনীতির বেহাল দশা, বিপুল বেকারত্ব, কৃষিতে চরম দুর্দশা প্রভৃতি নানা কারণে মোদির বিরোধীদের মনে হতে পারে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জোরদার জনমতের প্রতিফলন ভোটে ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে সে রকম ঘটার লক্ষণ অতিসামান্য। রাজনৈতিক মেজাজের ধ্রুপদী, পুরনো ধাঁচের বিশ্লেষণী ছাঁচে মাপতে গেলে এই ব্যাপারটা হতবুদ্ধিকর মনে হতে পারে। কিন্তু সারাদেশ ঘুরে নির্বাচনী প্রচার অনুসরণ করতে করতে আমার কাছে মনে হয়েছে চারটি কারণ এই ঘটনার পিছনে কাজ করছে।

বিজেপি বা তার এনডিএ জোট শেষপর্যন্ত যত আসনই পাক না কেন, এই চারটি কারণ আসলে অর্থনৈতিক দুর্দশাজনিত ও ক্ষমতাসীনবিরোধী মনোভাবের ধার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। প্রথমত, বিজেপির একটি শক্তিশালী নতুন ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে। এই ভোটব্যাংক সর্বভারতীয় এবং বর্ণভিত্তিক। নানা উচ্চবর্ণের লোকজনে ভরা। ১৯৮৯ সাল থেকে এরা ক্রমশ বিজেপির দিকে ঝুঁঁকছে, তবে কিছুদিন আগে পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিভাজন থাকত। পুরনো সম্পর্কের টানে কিছু ব্রাহ্মণ কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া অব্যাহত রেখেছিল। কোনো কোনো ঠাকুর নেতা হিন্দি ভূখ-ে, বিশেষত উত্তরপ্রদেশে ভোটের হাওয়া এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে দিতে পারত।

জন সংঘ/বিজেপি বরাবর উচ্চবর্ণের লোকদের আকৃষ্ট করেছে। তবে একমাত্র বানিয়া বর্ণের লোকেরাই তাদের প্রতি প্রকৃতপ্রস্তাবে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। এজন্যই ইন্দিরা গান্ধী বরাবর এদের ‘বানিয়া দল’ বলে অভিহিত করতেন, কখনো ‘হিন্দু দল’ বলতেন না। এখন সব উচ্চবর্ণের লোকজন মোদির পেছনে জড়ো হয়েছে। মোদির বিজেপির মাঝে তারা কেবল হিন্দুত্বের শক্তিই দেখে না; তাদের কাছে বিজেপি ‘মেধা’র পক্ষশক্তিও বটে। তারা মনে করে, সংখ্যালঘু ও ‘কম মেধাবী’ নিম্নবর্গের হিন্দুরা সংখ্যাধিক্যের কারণে ভোটের ক্ষমতার জোরে ‘মেধা’র জায়গাগুলো দখল করে নিচ্ছে বলে তাদের যে আশঙ্কা তা থেকে পরিত্রাণ দেবে বিজেপি।

এই নতুন ভোটব্যাংকের ভেতরকার সংহতি অত্যন্ত দৃঢ়। গত তিন মাস ঘুরে ঘুরে বিজেপির পক্ষে নয় এমন উচ্চবর্ণের লোক পাইনি বললেই চলে। মুসলমান এবং অন্যান্য বর্ণের লোকেরা (যেমন যাদব) যারা সাধারণত একপক্ষেই ভোট দেয় তাদের বিপরীত ভোট এইভাবে জোগানো সহজ হয়। সর্বশেষ বর্ণশুমারি হয়েছিল ১৯৩১ সালে। তথাপি মোট জনসংখ্যার ২২-২৫ শতাংশের বেশি না হয়েও উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ভারতের সর্ববৃহৎ ভোটব্যাংক। মুসলমান, দলিত কিংবা যে কোনো একতাবদ্ধ ওবিসি গ্রুপের থেকেও এই ভোটব্যাংক বড়। দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির বিপর্যয়কে কার্যকর ব্যাষ্টিক অর্থনীতি দিয়ে ঢেকে দিতে পারা।

বিজেপির সংবাদ সম্মেলনে অমিত শাহ দাবি করেছেন, তার দলের সরকার নানা কর্মপরিকল্পনা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর দৃষ্টি দিয়েছিল। তিনি ঠিক কথাই বলেছেন। পায়খানা, এলপি গ্যাস (উজালা), আবাসন (প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা), মুদ্রা, ও গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের মতো কর্মপরিকল্পনাগুলোর সুযোগ-সুবিধা মোটামুটিভাবে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে। তবে কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। অনেক সময় পায়খানায় পানি থাকে না, এলপি গ্যাসের বহু গ্রাহকের রিফিল করার সামর্থ্য থাকে না, আর মুদ্রা ঋণ অনেক সময় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি।

কিন্তু এসব স্কিম মানুষের কাছে পৌঁছার নজির দেশজুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। কৃষকের প্রত্যক্ষ ভর্তুকি সুবিধার প্রথম কিস্তিও তাদের কাছে পৌঁছে। সত্যিকারের গরিব ও দুস্থ লোকজনের কাছে এটা একটা বড় পরিবর্তন। প্রায় কোনো ঘুষ না দিয়েই তারা হাতেনাতে এই বাস্তব ও দৃশ্যমান সুবিধা পেয়েছে। পত্রিকায় সম্প্রতি ছাপা হয়েছে যে, মোট ২.৪ লাখ কোটি রুপি মুদ্রা ঋণ ৪.৮১ কোটি লোকের হাতে গেছে। দ্রুত সময়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে এসব স্কিম পৌঁছেছে যে, এসবের প্রভাব তাদের জীবনে পড়তে বাধ্য।

সেসব মানুষ জিডিপি বোঝে না; জিডিপি বাড়ল না কমল তাতে তাদের কিছু যায়-আসে না; সরকারের হিসাব বিশ্বাসযোগ্য নাকি বানোয়াট, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তারা এত গরিব যে, এখনো সংগঠিত শ্রমবাজারে ঢুকতে পারেনি। অল্প সময়ে একের পর এক কিছু জিনিস পাওয়া তাদের কাছে বড় ব্যাপার। তৃতীয়ত, কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট যেসব পরিকল্পনা করে পরে বাদ দিয়েছিল সেসবের বাস্তবায়ন। দৃঢ় অবকাঠামো, যেমন মহাসড়ক, বন্দর, মেট্রো, সেতু ও নানা নগরকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণে মোদি সরকারের রেকর্ড দ্বিতীয় মেয়াদের ইউপিএ সরকার থেকে ভালো। আর এই পার্থক্য খালি চোখেই ধরা পড়ে। কংগ্রেস ন্যায্যভাবেই দাবি করতে পারে যে, প্রথম ইউপিএ সরকারের সময়ে তারা ভালো কাজ করেছে, এমনকি এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর স্বপ্ন, পরিকল্পনা ও সূচনা তখনই হয়েছিল।

কিন্তু কেন কোনো না কোনো কারণে এগুলো মাঝপথে পরিত্যক্ত অথবা বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে তাদেরই আত্মানুসন্ধান করতে হবে। এক্ষেত্রে মুম্বাইয়ের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ঘটনা। নর্থ-সাউথ মেট্রো, ট্রান্স-হারভার লিঙ্ক, নবি মুম্বাই এয়ারপোর্ট এবং কোস্টাল রোড মতো সব প্রকল্পের পরিকল্পনা করে ইউপিএ সরকার। প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোনো একটি ছাড়পত্র না পাওয়ার দরুন কাজ আটকে যায়। দুঃখজনক ঘটনা হলো, দেশজুড়ে বিরাট ও উজ্জ্বল ল্যান্ডমার্ক সেতুগুলো নির্মাণের কাজ থেমে যাওয়া।

বিজেপি বাধাগুলো সরিয়ে, কাজের ভার নিজের হাতে তুলে নিয়ে ছুটে এগিয়ে গেল। এই ব্যাপারটাও মোদির পক্ষে গেছে। চতুর্থত, ২২ বছরের কম বয়সীদের নতুন ‘ভক্তি কাল্ট’। ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারীরা এবার প্রথমবাররে মতো লোকসভা নির্বাচনের ভোটার হয়েছে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে এদের সবাই ডিজিটাল জগতের বাসিন্দা (ডিজিটাল নেটিভ)। এরা শুধু একজন নেতার কথাই জেনেছে, একটি বার্তাই শুনেছে, গুগলপূর্ব সময়ের কোনো সূত্র তাদের কাছে নেই। সবেচেয়ে বড় কথা, এরা মূলত এখনো চাকরির বাজারে প্রবেশ করেনি।

এরা মোদির নজিরবিহীন সমর্থক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এরা মোদির বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব, আগ্রাসী মনোভাব, এবং বিদেশি নেতাদের আলিঙ্গনের দারুন ভক্ত। আর ‘মোদি চলে গেলে মহাবিপদ’ জাতীয় কথা এরা সহজে গেলে। তাদের মনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বংশানুক্রমিক এরা অভিজাতদের প্রাপ্ত সুবিধাদিকে ঘৃণা করে। ২০১৪ সালের মতো এখন আর এরা রাহুল গান্ধীর নাম শুনলেই মুখ টিপে হাসে না। তবে প্রশ্ন করে, রাহুল এতদিন কী করেছে, কী তার অভিজ্ঞতা। এবারের প্রচারে সবচেয়ে বেশি শোনা কথা : ‘রাহুলকে আরও কিছুদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। মোদি নিজেই নিজেকে তৈরি করেছেন এবং তিনি অভিজ্ঞ, তা হলে কেন বিকল্প খুঁজব?’ লেখক ও সম্পাদক হিসেবে, আমি মোদির অনুগতদের জন্য ‘ভক্ত’ এবং অন্যদের জন্য এই রকম কোনো তকমা ব্যবহার পরিহার করি।

তাই আমি সচেতনভাবে এই যুবকদের মোদির ‘ভক্তি কাল্ট’ হিসেবে বর্ণনা করছি, কারণ তাদের ভক্তি এতটাই শক্তিশালী, যা জাতি ও বংশের আনুগত্যের সীমারেখা অনেক সময়ই উতরে যায়। অবশ্য এটি উত্তরপ্রদেশের যাতাব, যাদব ও মুসলমানদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। সবশেষে একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতা। মনে রাখবেন, এখানে আমি বিজেপের পক্ষে গেছে এমন চারটি বিষয় তুলে ধরেছি, আর এগুলো বাদ দিলে বিজেপির অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নিদারুণ ব্যর্থতা ও নোটবন্দির মতো অদূরদর্শী কাজের জন্য নিশ্চয় ডুবতে হতো। এসবের কারণে মোদি কত আসন পাবেন তা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। যারা বুথফেরত জরিপ করেছে তারা বলতে পারবে।

আমি শুধু আগ বাড়িয়ে এটুকু বলতে পারি যে, এই চারটি বড় বিষয় কাজ না করলে তার পক্ষে ১৫০টি আসনের বেশি পাওয়াই কঠিন ছিল, আর সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় মেয়াদে তার ক্ষমতায় আসা ছিল অসম্ভব। এখানেই শেষ করব। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন দুনিয়াসেরা নির্বাচন-বিশারদদেরও নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে ভোটাররা। যুক্তরাষ্ট্র (২০১৬ সালে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়া), যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট প্রশ্নে, ইসরায়েলে এবং মাত্র কয়দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনেও তাই ঘটেছে। এর থেকে বেশি কিছু বলা আমার পক্ষে সমীচীন হবে না। দ্য প্রিন্ট থেকে অনূদিত অনুবাদ : মুহম্মদ হাবীব য় শেখর গুপ্ত : ভারতীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক; দ্য প্রিন্টের প্রধান সম্পাদক

advertisement