advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সভ্যতার সঙ্কট

সজীব সরকার
২১ মে ২০১৯ ২৩:০৯ | আপডেট: ২২ মে ২০১৯ ১২:১৭
advertisement
advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও লেখক ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা (জন্ম : ১৯৫২) বিশ্বাস করতেন, ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে বারবারই এটি প্রমাণিত হয়েছে যে নৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে গণতন্ত্রই হলো অন্য সব ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার চেয়ে শ্রেয়তর। এ বিষয়ে তিনি প্রথম মত প্রকাশ করেন দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট জার্নালে ১৯৮৯ সালে লেখা ‘এন্ড অব হিস্ট্রি’ নামে একটি প্রবন্ধে।

ওই প্রবন্ধটিকে পরে তিনি আরও বিশদভাবে উপস্থাপন করেন যা ১৯৯২ সালে দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। বইটিতে ফুকোয়ামা বলেন, শীতল যুদ্ধের (কোল্ড ওয়ার) সমাপ্তি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরই আসলে ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে; এখানে ইতিহাসের সমাপ্তি বলতে তিনি বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা কিংবা সাধারণীকরণকে বুঝিয়েছেন। তার মতে, পুরো মানবজাতি কেবল একটি যুদ্ধ-পরবর্তী সময় পার করছে, তা নয়, এটিই আসলে এন্ড অব হিস্ট্রি বা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি; কেননা পশ্চিমা ধাঁচের উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই সাধারণীকরণের ফলে সেটিই গোটা বিশ্বের জন্যে সর্বশেষ বা চূড়ান্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফুকোয়ামার মতে, এই ব্যবস্থার কোনো বিকল্প দাঁড়াবে না আর বিকল্পের এই অনুপস্থিতিকেই তিনি এন্ড অব হিস্ট্রি বা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

দার্শনিক হেগেল ও মার্ক্স উভয়েই ইতিহাসকে এক কাল থেকে অন্য কালে সরলরৈখিক অগ্রগমন হিসেবে দেখেছেন। হেগেল ও মার্ক্স-এর ভাবধারায় প্রভাবিত তাত্ত্বিক ফুকোয়ামা তাই ইতিহাসকে একটি বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার প্রস্তাব করেছেন। ফুকোয়ামার মতে, ইতিহাসের শেষ প্রান্তেও ঘটনা সংঘটিত হবে। আর তিনি মনে করেন, ইতিহাস বা মানবসভ্যতা শেষ পর্যন্ত হতাশায় নিমজ্জিত হবে কেননা মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়।

দার্শনিক জ্যাঁক দেরিদা (১৯৩০-২০০৪) এবং অন্য অনেক তাত্ত্বিক অবশ্য ফুকোয়ামার দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ফুকোয়ামার এক সময়ের শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটন (১৯২৭-২০০৮) ফুকোয়ামার দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান বইটির জবাবে ১৯৯২ সালে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট-এ ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস শীর্ষক এক লেকচারে বলেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের যুদ্ধ হবে না; সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় হবে যুদ্ধের উৎস। হান্টিংটনের এই ভাষণ ১৯৯৩ সালে প্রথমে ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নালে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস?’ শীর্ষক প্রবন্ধ আকারে এবং পরে ১৯৯৬ সালে বর্ধিত কলেবরে দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার নামে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। বইটিতে হান্টিংটন সভ্যতাগুলোর মধ্যে অনিবার্য দ্বন্দ্বের ছয়টি ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেন। এসবের মধ্যে তিনি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্ম- এই বিষয়গুলোতে পার্থক্য; সভ্যতাগুলোর মধ্যে আত্মপরিচয় সংক্রান্ত চেতনা বা আত্মোপলব্ধি; অর্থনৈতিক আঞ্চলিকতাবাদের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য ইত্যাদি নানা কারণে সভ্যতাগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য বলে উল্লেখ করেন। হান্টিংটনের উপলব্ধিতে পশ্চিমের সঙ্গে সিনিক এবং ইসলামিক সংস্কৃতির সংঘাতও অনিবার্য। সার্বিকভাবে তার এই প্রস্তাব ফুকোয়ামার সার্বজনীন উদার গণতন্ত্র ব্যবস্থার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে।

তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষক টনি ব্ল্যাঙ্কলি (১৯৪৮-২০১২) ২০০৫ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য ওয়েস্টস লাস্ট চান্স : উইল উই উইন দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস?’ বইয়ে দেখিয়েছেন, ইউরোপে মৌলবাদী ইসলামের জয়জয়কার; তার দৃষ্টিতে এটি সভ্যতার জন্যে ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং এজন্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন একই পরিণতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে।

হান্টিংটনের বিশ্লেষণও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়; নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন (জন্ম : ১৯৩৩) মত দেন, ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য বিশ্বের বেশিরভাগ সংস্কৃতিরই বৈশিষ্ট্য; পশ্চিমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। আধুনিক পশ্চিমে যে গণতন্ত্রের বিজয় ঘটেছে, তা বিগত প্রায় এক শতকের অভিজ্ঞতার ফল। ইতিহাসের ধারায় বিবেচনা না করে প্রতিটি রাষ্ট্রকে মনোলিথিক বা বিচ্ছিন্ন ও একক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা এবং পশ্চিমের সঙ্গে এদের বৈসাদৃশ্যের তুলনা আদতে বিরাট ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সাহিত্যিক পল বারমান (জন্ম : ১৯৪৯) তার টেরর অ্যান্ড লিবারেলিজম (২০০৩) বইয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে পৃথক সাংস্কৃতিক সীমার অস্তিত্ব নেই। এখনকার সময়ে ‘ইসলামি সভ্যতা’ কিংবা ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ বলে আলাদা কিছু নেই; তাই সভ্যতাসমূহের মধ্যে অনিবার্য সংঘাতের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য কিংবা গ্রহণযোগ্য নয়।

হান্টিংটনের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ২০০১ সালে এডওয়ার্ড সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) দ্য ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স প্রবন্ধে বলেন, হান্টিংটন ‘সভ্যতা’কে যেভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন, তা বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যকার পরস্পরনির্ভরশীলতা ও আন্তঃক্রিয়াকে অস্বীকার করে। ভাষাতত্ত্ববিদ, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক নোম চমস্কি (জন্ম : ১৯২৮) সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংঘাতের এ ধারণাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছেমাফিক আগ্রাসনের বৈধতা হিসেবে সমালোচনা করেছেন।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি (জন্ম : ১৯৪৩) হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস’-এর ধারণার বিপরীতে ‘ডায়লগ এমং সিভিলাইজেশনস’ ধারণার প্রস্তাব করেন। অবশ্য অস্ট্রিয়ান দার্শনিক হান্স কশলা (জন্ম : ১৯৪৮) সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে ইউনেস্কোকে লেখা এক চিঠিতে প্রথম এই ধারণা (ডায়লগ বিটুইন ডিফরেন্ট সিভিলাইজেশনস) দেন। উভয়ের ধারণার মূল প্রতিপাদ্য হলো, সভ্যতা বা সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে ধারণার আদান-প্রদান নিশ্চিত করা গেলে সুসম্পর্ক তৈরি করা যেতে পারে যা ক্রমেই এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘাতের ঝুঁকি প্রশমন করবে।

আজকের দিনে সভ্যতার যে সঙ্কট, তার মূলে প্রোথিত রয়েছে রাষ্ট্র কিংবা সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্থাহীনতা কিংবা অবিশ্বাস, সন্দেহ, অশ্রদ্ধা আর জাত্যাভিমান। নিজেকে শ্রেয়তম ভাবা আর অন্যকে নিজের মতো করে বদলে দেয়ার নেশা বিবাদ উস্কে দিচ্ছে। সংস্কৃতি কিংবা সভ্যতাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ বাড়ানো আজকের দিনে খুব দরকার।

অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘হে মোর চিত্ত, পূণ্য তীর্থে’ কবিতায় বলেছিলেন, ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে’। আমাদের উচিত হবে নিজের ও অন্যের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া, শ্রদ্ধা করা ও পারস্পরিক ভাব-বিনিময় বাড়ানো। সুফি সাধক ও কবি জালালুদ্দিন রুমি তার এক কবিতায় লিখেছিলেন, আকাশে চাঁদ উঠলেই তোমার ঘর আলোকিত হবে না; তোমার ঘর কতোটা আলোকিত হবে, তা নির্ভর করে তোমার ঘরের জানালা তুমি কতোটা উন্মোচিত করেছো, তার ওপর।

আমাদের মনকে প্রসারিত করতে হবে। সংস্কৃতির মধ্যে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিভিন্নতাকে গ্রহণ করতে পারার মতো মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মনের দিগন্ত বিস্তৃত না হলে আমাদের দৃষ্টির সীমা সঙ্কুচিত থেকে যাবে; আর সঙ্কীর্ণ মানসিকতাই শেষতক সভ্যতার সঙ্কট ডেকে আনে।

জয় হোক উদারতার, জয় হোক বিশ্বমানবতার।

লেখক : সজীব সরকার, সহকারী অধ্যাপক; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। লেখক ও গবেষক। ই-মেইল : sajeeb_an@yahoo.com

advertisement