advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতায় ছাড়

মাহফুজুর রহমান
২৩ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ০৯:২৯

দেশের শেয়ারবাজারের টানা পতন নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মিছিল-প্রতিবাদের মুখে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছে। একটি দেশের অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য অর্থবাজারের পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। এই বাজার থেকে সংগৃহীত কম খরচ সংবলিত মূলধন শিল্প-বাণিজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিক দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে।

কিন্তু দীর্ঘদিনেও বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দক্ষতা প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। চরমভাবে সংবেদনশীল এই খাতে বিনিয়োগ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিনিয়োগকারীদের সবদিক বুঝে-শুনে ও তথ্যাদি ভালোরূপে বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করতে হয়। বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনো অনেকটা গুজবেই চলে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কিছু গবেষণা করা হলেও এর ফল সবার কাছে উন্মুক্ত করা হয় না।

তা ছাড়া বিনিয়োগকারীদের বিনা খরচে প্রশিক্ষণ প্রদানের আয়োজন করেও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিশেষ সফলতা লাভ করতে পারছে না। শেয়ারবাজারে দক্ষতার সঙ্গে বিনিয়োগ করে থাকেন প্রধানত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এক সময় এ দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিদেশ থেকে যথেষ্ট তহবিল এসেছে। কিন্তু বিভিন্ন সময় শেয়ারবাজারের ব্যাপক উত্থান ও পরবর্তী সময়ে ধস নামার পর্যায়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে হাত গুটিয়ে নেন। তাদের এই বাজারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে বুঝিয়ে আগ্রহী করে তোলার কাজ সম্পন্ন করে যেসব ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এ দেশে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল, এর অনেকটিই বর্তমানে আর নেই।

পরে এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরের দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো আর টিকে থাকতে পারেনি অসম প্রতিযোগিতার জেরে। ব্যাংক বা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয় মার্চেন্ট ব্যাংকের লাইসেন্স। শেয়ারবাজারে এ প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন একটা অবদান রাখতে পারেনি। শেয়ারবাজারে গড়ে উঠেছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটগুলো বাজারকে কখনো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলে এবং হঠাৎ করেই ফেলে দেয়। তারা এক বা একাধিক কোম্পানির শেয়ার কিনে কিনে ওপরে ওঠায় এবং হঠাৎ করেই সেগুলো বিক্রি করে বেরিয়ে যান। ফলে এই শেয়ারের দাম পড়ে যায়। আর এগুলোর ভিত্তি নড়বড়ে বলে বাজারে এগুলো উঁচুদামে টিকে থাকতে পারে না। সিন্ডিকেট কর্তৃক প্রচারিত গুজব শুনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ার কেনেন এবং যথারীতি লোকসানের মুখোমুখি হন। দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রক্রিয়ার সুরাহা করা যাচ্ছে না বা হচ্ছে না।

দক্ষ পরিদর্শকের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো পরিদর্শন করিয়ে শেয়ারবাজারে ঘাপটি মেরে থাকা ওই দুষ্টচক্রগুলো বের করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে শেয়ারবাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রধান আকর্ষণ বলে বিবেচিত হতে পারত। শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী হচ্ছে ব্যাংক। ব্যাংক-কোম্পানি আইনের ২৬ (ক)-এর উপধারা (১)-এ কোনো ব্যাংক-কোম্পানি কর্তৃক অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারধারণের ক্ষেত্রে সামষ্টিক বা এককভাবে কোনো কোম্পানির শেয়ারধারণের সর্বোচ্চ সীমার বিষয়ে নির্দেশনা প্রদত্ত হয়েছে। এ ছাড়া শেয়ার/ডিবেঞ্চারের বিপরীতে ঋণ প্রদান সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে নির্দেশনা জারি করে থাকে। তা তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো অনুসরণ করতে বাধ্য।

২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন এক সার্কুলার দিয়ে উপরোক্ত বিনিয়োগসীমা পরিপালনে কড়াকড়ি আরোপ করে। যেসব ব্যাংকের একক ও সামষ্টিক বিনিয়োগ আইনে উল্লিখিত এই বিনিয়োগসীমার ঊর্ধ্বে রয়েছে, তা পরবর্তী ৩ বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। একই সার্কুলারে পুঁজিবাজারে কোনো ব্যাংক-কোম্পানির মোট বিনিয়োগের বাজারমূল্য সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে উল্লিখিত ওই ব্যাংক-কোম্পানির আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম হিসাবে রক্ষিত স্থিতি, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইলড আর্নিংসের মোট পরিমাণের এক-চতুর্থাংশের ভেতর সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

মোট বিনিয়োগ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে যে উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা হলো ক. ব্যাংকের ধারণকৃত সব শেয়ার, ডিবেঞ্চার, করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট এবং অন্যান্য পুঁজিবাজার নিদর্শনপত্রের বাজারমূল্য; খ. পুঁজিবাজার কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত ব্যাংকের নিজস্ব সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে প্রদত্ত ঋণের স্থিতি ও মঞ্জুরিকৃত ঋণসীমা; গ. পুঁজিবাজার কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত অন্য কোনো কোম্পানি কিংবা কোনো স্টক ডিলারকে প্রদত্ত ঋণের স্থিতি (তলবি ও মেয়াদি ঋণের বেলায়) ও মঞ্জুরিকৃত ঋণসীমা (চলমান ঋণের ক্ষেত্রে) এবং প্লেসমেন্ট অথবা অন্য কোনো নামে তাদের সঙ্গে রক্ষিত তহবিলের স্থিতি; ঘ. কেবল নিজের জন্য শেয়ার কেনে বা বেচে, এমন স্টক ডিলারকে শেয়ার কিংবা ডিবেঞ্চারের বিপরীতে প্রদানকৃত ঋণ। আবার ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিশেষ শর্তের বিপরীতে তাদের গ্রাহককে ঋণ প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করা যাবে এবং ঙ. পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠিত কোনো তহবিলে প্রদত্ত চাঁদা।

আবার পুঁজিবাজারে ব্যাংক-কোম্পানির মোট বিনিয়োগ নির্ধারণে যে উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত হবে না, তা হলো এক. সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ সংরক্ষণে ব্যবহার উপযোগী অনুমোদিত সম্পত্তি নিদর্শনপত্র; দুই. বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত এবং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয়, এরূপ পাবলিক সেক্টর এন্টারপ্রাইজের শেয়ার বা ডিবেঞ্চার; তিন. অন্যান্য তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত টায়ার-টু মূলধনে বিবেচনাযোগ্য এবং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয়, এরূপ সাব-ডেট ইনস্ট্রুমেন্টস এবং চার. সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি (বিডি) লি., স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর শেয়ার ইত্যাদি। শেয়ারবাজারের স্বার্থে কয়েকটি বিষয়ে ছাড় প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি বিভিন্ন মহলের অনুরোধ ছিল, এমনকি সাবেক অর্থমন্ত্রী এসব বিষয়ে নমনীয় হওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে দিকনির্দেশনামূলক পত্রও লিখেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে অনেকটা অনড় অবস্থান নিয়েছিল। বর্তমানে সরকারসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

১৬ মে ইস্যুকৃত সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এখন থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন সিকিউরিটিজে ব্যাংকের বিনিয়োগকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ হিসাবায়নে ধরা হবে না। তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোনো কোম্পানিতে মূলধন বিনিয়োগ করলে এখন থেকে তাও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বলে ধরা হবে না। এ ছাড়া অরূপান্তরযোগ্য ক্রমবর্ধমান প্রেফারেন্স শেয়ার, অরূপান্তরযোগ্য বন্ড, ডিবেঞ্চার ও বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বলে বিবেচনা করা হবে না। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন অনেক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাংকের বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ আছে।

এসবের ভেতর আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সিডিবিএলসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বিনিয়োগ আছে। পুঁজিবাজারে মোট বিনিয়োগের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং অরূপান্তরযোগ্য বন্ড, ডিবেঞ্চার ও বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকে ধরার ফলে এতদিন পুঁজিবাজারে অর্থায়নের ওপর ব্যাংকগুলো প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। তাদের এই কোণঠাসা অবস্থা পুঁজিবাজারকে অনেকটাই দুর্বল করে তুলেছিল বলেও অনেকের ধারণা। বন্ড, ডিবেঞ্চার ও বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড চালুকরণ, বাজার থেকে টাকা উত্তোলন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এই বন্ড ও ফান্ড মার্কেট সচল করা সম্ভব হলে পুঁজিবাজার আরও গতিশীল হবে এবং বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন। তবে এসব ইস্যু এবং পরিচালনার ক্ষেত্রেও দক্ষতর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকতে হবে। সর্বোপরি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে উদার মনোভাব নিয়ে যথাযথ নজরদারি বাড়াতে হবে।

প্রসঙ্গত, বাজার থেকে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল বিনিয়োগের মাধ্যমে কেনা শেয়ারের বাজারমূল্য বেড়ে গেলে এ বর্ধিত দামেই এর বিনিয়োগ দেখানোর নির্দেশনা অযৌক্তিক বলে মনে হয়। কারণ শেয়ারবাজারে শেয়ারের দাম বাড়লেও ব্যাংকের প্রকৃত বিনিয়োগ হচ্ছে তারা যত টাকা দিয়ে শেয়ারগুলো কিনেছে। শেয়ার কেনার পর দীর্ঘদিন ধরে রাখলে এই শেয়ারের দাম অনেকগুণ বেড়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।

এ ক্ষেত্রে বর্ধিত দামকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ধরা হলে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা আবার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তা একান্তই অযৌক্তিক বলে মনে হয়। এ বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এখন তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এলে পুঁজিবাজার তার আসল রূপে ফিরে যাবেÑ এটিই আমাদের প্রত্যাশা। শেয়ারবাজারের বর্তমান এই দৈন্যদশায় সরকার কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগও প্রশংসার দাবি রাখে। আসন্ন বাজেটেও শেয়ারবাজার উন্নয়নের পদক্ষেপ থাকবে বলে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। সব খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি এ খাতটি উঠে আসবেÑ এটিই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লিমিটেড ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক